প্রস্থানের এক দশক

হুমায়ুন ফরীদি
ছবি: সংগৃহীত

সময়ের হিসাবে আজ তাঁর প্রয়াণের এক দশক। প্রকৃতি যখন ফাগুন উৎসবে মেতে উঠছিল, ঠিক তখনই দেশের বিনোদন অঙ্গনে ছড়িয়ে পড়ে সেই শোকের খবর। সবাই জেনে যান, গুণী অভিনয়শিল্পী হুমায়ুন ফরীদি পাড়ি জমিয়েছেন না ফেরার দেশে। কাল আবারও আসছে বসন্ত, ফাগুনের আগুন লাগা রঙে সাজবে প্রকৃতি। আর ভক্তরা প্রয়াণের দশক পূর্তিতে স্মরণ করবেন তাঁদের প্রিয় হুমায়ুন ফরীদিকে।

১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনে দেশ যখন উত্তাল, তখনই পৃথিবীতে আলোর মুখ দেখেছিলেন হুমায়ুন ফরীদি। ২৯ মে ঢাকার নারিন্দায় জন্ম নেওয়া ফরীদির অভিনয়জীবনের শুরু ছাত্রজীবনে। মঞ্চে কাজ করতেন তিনি। টিভি নাটকে প্রথম অভিনয় করেন আতিকুল হক চৌধুরীর প্রযোজনায় ‘নিখোঁজ সংবাদ’-এ। জন্মের পর থেকেই ছিলেন ডানপিটে স্বভাবের। মঞ্চ, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র তিন মাধ্যমেই সমানতালে কাটিয়ে গেছেন তিন দশক। অভিনয় দিয়ে আমৃত্যু ছড়িয়েছেন আলো। আর ব্যক্তিজীবনটা ছিল সাদামাটা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র অবস্থায় নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন তাঁকে থিয়েটারে যোগ দেওয়ার পরামর্শ দেন। দেশের অন্যতম নাট্য সংগঠন ঢাকা থিয়েটারে শুরু হয় হুমায়ুন ফরীদির থিয়েটারচর্চা। মঞ্চে অভিনয় করেন ‘কীত্তনখোলা’, ‘মুনতাসির ফ্যান্টাসি’, ‘কেরামত মঙ্গল’, ‘ধূর্ত উই’ প্রভৃতি নাটকে। ‘কেরামত মঙ্গল’ নাটকে কেরামত চরিত্রে হুমায়ুন ফরীদির অভিনয় এখনো আলোচিত ঢাকার মঞ্চে।

হুমায়ুন ফরীদি

টিভি নাটকে হুমায়ুন ফরীদি আলোচনায় আসেন শহীদুল্লা কায়সারের উপন্যাস অবলম্বনে আবদুল্লাহ আল মামুন নির্মিত ‘সংশপ্তক’ ধারাবাহিকে অভিনয় করে। ‘কানকাটা রমজান’ চরিত্রে অভিনয় করে দারুণ প্রশংসা অর্জন করেন ফরীদি। এরপর দীর্ঘ সময় তিনি ছোট পর্দায় সাফল্যের সঙ্গে অভিনয় করেছেন। হুমায়ুন ফরীদি চলচ্চিত্রে অভিনয় শুরু করেন নব্বইয়ের দশকে।

হুমায়ুন ফরীদি ১৯৬৪ সালে প্রথম মঞ্চনাটকে অভিনয় করেন। প্রথম নির্দেশনা দেন স্কুলজীবনে, নাটকের নাম ‘ভূত’। টিভি নাটক বা মঞ্চে সেলিম আল দীন এবং নাসির উদ্দীন ইউসুফের বাইরে হুমায়ুন ফরীদি সর্বাধিক কাজ করেছিলেন হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে। হুমায়ুন ফরীদি স্মরণে নাসির উদ্দীন ইউসুফ বলেন, ‘একজন চৌকস ও মেধাবী অভিনেতা হিসেবে তার সব গুণ ছিল। তবে সিনেমায় গিয়ে অভিনয়ের অনেক কিছুই অনুসরণ করত না সে। আমাদেরই ব্যর্থতা যে আমরা তাকে মঞ্চে ধরে রাখতে পারিনি। তারপরও একজন অভিনেতা হিসেবে সে যে উচ্চতায় পৌঁছে গিয়েছিল, তা সত্যিই অনুকরণীয়। আগামী দিনগুলোতে নতুন প্রজন্মের কাছে তার কর্মগুলো তুলে ধরাই আমাদের দায়িত্ব মনে করি।’

হুমায়ুন ফরীদি

প্রখ্যাত অভিনয়শিল্পী হুমায়ূন ফরীদির ভালো বন্ধু ছিলেন আফজাল হোসেন। মূলত বন্ধু আফজাল হোসেনের সাহস ও উৎসাহে টিভি নাটকে যুক্ত হন ফরীদি। আফজাল হোসেন বলেন, ‘হুমায়ুন ফরীদি আমার কতটা ভালো বন্ধু ছিলেন, কতটা প্রিয় বন্ধু ছিলেন তা অল্প কথায় বলা যাবে না। এটুকু বলতে পারি যে আমার অসম্ভব ভালো বন্ধু ছিলেন তিনি। ভীষণ প্রিয় বন্ধু ছিলেন। এমন বন্ধুর অভাব কোনো দিনও পূরণ হবে না। কত স্মৃতি আমাদের, কত গল্প! আর কিছু না করে শুধু অভিনয়কে ভালোবেসে সময় কাটিয়েছি আমরা। সদ্য ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা শেয়ার করছি। একুশে পদকের তালিকায় আমার নামটি জানার পর চারদিক থেকে ফোন পাচ্ছিলাম। প্রথমেই বাবা-মার কথা মনে পড়েছে। সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়েছে ফরীদির কথা। আমার এই প্রিয় বন্ধু বেঁচে থাকলে এই খবরে কী রকম আনন্দ করতেন, কী কী করতেন সেটাই মনে হচ্ছে। ফরীদি ছিলেন এমনই একজন বন্ধু, যাকে মনে না করে থাকা যায় না। যেকোনো আয়োজনে ফরীদিকে মনে পড়ে, তাঁকে মিস করি। ভালো কোনো চরিত্র পেলে তাঁর কথা প্রথম স্মরণ করি। এই হচ্ছেন ফরীদি।’

হুমায়ূন ফরীদি

ফরীদির প্রথম চলচ্চিত্র তানভীর মোকাম্মেলের ‘হুলিয়া’। প্রথম বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র শহীদুল ইসলাম খোকন পরিচালিত ‘সন্ত্রাস’। এ ছাড়া উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ছবি হচ্ছে ‘ভণ্ড’, ‘ব্যাচেলর’, ‘জয়যাত্রা’, ‘শ্যামল ছায়া’, ‘একাত্তরের যীশু’, ‘মায়ের মর্যাদা’, ‘বিশ্বপ্রেমিক’, ‘পালাবি কোথায়’, ‘মেহেরজান’। বাংলাদেশি সিনেমার খল চরিত্রে তিনি যোগ করেছিলেন এক নতুন মাত্রা। ‘সন্ত্রাস’ ছবির মাধ্যমে খলনায়ক হিসেবে অভিষেক হয় তাঁর। তিনি ‘মাতৃত্ব’ ছবির জন্য সেরা অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন ২০০৪ সালে। হুমায়ুন ফরীদি অভিনীত সর্বশেষ ছবি ‘এক জবানের জমিদার, হেরে গেলেন এবার’, ২০১৬ সালের ২৬ আগস্ট মুক্তি পায় ছবিটি।

ব্যক্তিজীবনে বেলি ফুলের মালা দিয়ে ফরিদপুরের মেয়ে মিনুকে বিয়ে করেন হুমায়ুন ফরীদি। এ বিয়ে তখন সারা দেশে আলোড়ন তোলে। সেই সংসারে তাদের কন্যাসন্তানের নাম দেবযানী। পরে তিনি ঘর বাঁধেন প্রখ্যাত অভিনয়শিল্পী সুবর্ণা মুস্তাফার সঙ্গে, ২০০৮ সালে তাঁদের বিচ্ছেদ হয়ে যায়। তবে ব্যক্তিজীবন ছাপিয়ে হুমায়ুন ফরীদি সবার প্রিয় অভিনেতা হিসেবে এখনো আবিষ্ট করে রেখেছেন অগুনতি দর্শক-সমালোচককে।