মারা গেছেন বাংলাদেশ টেলিভিশনের স্বর্ণযুগের চিত্রগ্রাহক সমীর কুশারী। করোনা–পরবর্তী জটিলতায় আজ রোববার সকাল পৌনে সাতটায় ঢাকার একটি হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭১ বছর। প্রথম আলোকে মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত করেছেন তাঁর স্ত্রী জয়া কুশারী।

গত শতকের আশি–নব্বই দশকে বাংলাদেশ টেলিভিশনে যাঁরাই দেখেছেন, তাঁদের কাছেই অতি পরিচিত একটি নাম সমীর কুশারী। ‘সংশপ্তক’, ‘বহুব্রীহি’, ‘অয়োময়’, ‘এইসব দিনরাত্রি’, ‘পাথর সময়’, ‘সাত সমুদ্দুর’, ‘আমার দেশের লাগি’, ‘বাঁচা’সহ বহু কালজয়ী নাটকেরই তিনি চিত্রগ্রাহক বা আলোক নির্দেশক। সত্তরের দশকের শেষ দিকে বিটিভিতে চিত্রগ্রাহক হিসেবে যোগ দেওয়া এই মানুষটি ২০০৯ সালে ডিরেক্টর অব ফটোগ্রাফি হিসেবে অবসর নেন। এরপর একই পদে আমৃত্যু দেশ টিভিতে কাজ করেন।
জয়া কুশারী জানালেন, সমীর কুশারী গত মাসের শুরুতে করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। করোনা সেরে গেলেও করোনা–পরবর্তী জটিলতায় আবার তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় আজ রোববার সকাল পৌনে সাতটায় তিনি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন। তিনি স্ত্রী, এক ছেলে, এক মেয়ে রেখে গেছেন। ছেলে–মেয়ে দুজনেই কানাডায় থাকেন।
জয়া কুশারী জানান, সমীর কুশারীর মরদেহ তাঁর দীর্ঘদিনের কর্মস্থল বাংলাদেশ টেলিভিশনের রামপুরা কার্যালয়ে নেওয়া হয়। সেখানকার আনুষ্ঠানিকতা শেষে সর্বশেষ কর্মস্থল দেশ টিভি প্রাঙ্গণেও নেওয়া হয়। যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে রাজারবাগে কালীমন্দিরে তাঁর শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হবে বলে জানালেন স্ত্রী।
সমীর কুশারী ১৯৫১ সালে ঢাকার আরমানিটোলায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা রেডিও ব্যক্তিত্ব রনেন কুশারী। বাবার মতো অভিনয় কিংবা বেতারের কাজে নিজেকে জড়াননি। তবে অভিনয়কে ফ্রেমবন্দী করে গেছেন। চিত্রগ্রহণের কাজকেই পেশা হিসেবেই বেছে নেন।
১৯৬৯ সালে চিত্রগ্রাহক সাধন রায়ের সহকারী হিসেবে ‘জলছবি’ চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন সমীর কুশারী। ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে যোগ দেন। ১৯৭৩–এ ঋত্বিক ঘটকের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ চলচ্চিত্রে সহকারী চিত্রগ্রাহক হিসেবে কাজ করেন। এরপর ১৯৭৭ সাল থেকে টানা ৩২ বছর বাংলাদেশ টেলিভিশনে কর্মরত ছিলেন। বাংলাদেশ টেলিভিশনের অসাধারণ ও কালজয়ী সব নাটকের চিত্রগ্রাহক হিসেবে কাজ করার পাশাপাশি টেলিভিশনের অন্য দুটি ইতিহাসের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে সমীর কুশারীর নাম।
২০০১ সালে রমনা বটমূলে নৃশংস বোমা হামলার ঘটনা হয়তো অনেকের মনে আছে। টেলিভিশনের পর্দায় সেই ঘটনার যে দৃশ্য আমরা দেখি সেটি ধারণ করেছিলেন সমীর কুশারী। বিস্ফোরণ সত্ত্বেও তাঁর ক্যামেরা থামেনি। বাংলাদেশ টেলিভিশনের স্বর্ণযুগে তিনিই প্রথম ৪৫ মিনিট দীর্ঘ একটি নাটক এক ক্যামেরায় ও এক শটে ধারণ করেছিলেন। ১৯৮৪ সালে বেলজিয়াম সরকারের বৃত্তি নিয়ে কালার ফটোগ্রাফি ও লাইটিং বিষয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণ নেন। ১৯৮৫ সালে ইউএনডিপির হয়ে মালয়েশিয়ায় প্রশিক্ষণ নিয়ে এশিয়ান ব্রডকাস্টিং ইউনিটে যোগ দেন। নাটক ছাড়াও বিটিভির স্মরণীয় তথ্যচিত্র, জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানের তিনি চিত্রগ্রাহক।