আফসানা মিমি
আফসানা মিমি

পোড়া দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে মিমির দীর্ঘ নিশ্বাস

দুই বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে বুধবার সকালে অভিনয়শিল্পী ও পরিচালক আফসানা মিমি আসেন প্রদর্শনী দেখতে। চারতলা ভবনের প্রতিটি ফ্লোর হেঁটে হেঁটে দেখেন। কোথাও গিয়ে অনেকক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে থাকেন। পোড়া কম্পিউটার, ভাঙা যন্ত্রাংশ, ছাই হয়ে যাওয়া বইপত্র—সবকিছুই যেন তাঁকে অবাক করে দেয়। মন খারাপ হয় তাঁর।

সংঘবদ্ধ উগ্রবাদীদের হামলায় পুড়ে যাওয়া এই ভবনই এখন এক শিল্প–স্থাপনা। ধ্বংসাবশেষকে সরিয়ে না রেখে, বরং সেই ভস্ম আর ভাঙাচোরা উপকরণ দিয়েই তৈরি হয়েছে ‘আলো’—একটি প্রতিবাদী, স্মারকধর্মী প্রদর্শনী।

আফসানা মিমি

প্রথম আলো ভবনে এর আগেও এসেছেন আফসানা মিমি। চারতলায় চরকি কার্যালয়ে অভিনয়–সংশ্লিষ্ট কাজে বসেছিলেন। ঝকঝকে অফিস, ব্যস্ততা, আলোঝলমলে করিডর—সব মনে আছে তাঁর। আজ সেই জায়গায় গিয়ে খুঁজে খুঁজে দেখলেন—কোথায় বসেছিলেন? কোন টেবিলে কথা হয়েছিল? কোন পাশে দাঁড়িয়ে চা পান করেছিলেন? খুঁজে পেয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইলেন। মনে হচ্ছিল—এই জায়গাটা কি সত্যিই সেই জায়গা? ঝাঁ চকচকে অফিসের স্মৃতি আর পোড়া দেয়ালের বর্তমান—দুটি দৃশ্য পাশাপাশি দাঁড়িয়ে যেন প্রশ্ন তুলছিল।

শিল্পী মাহ্‌বুবুর রহমানের তৈরি ‘আলো’ প্রদর্শনী শুরু হয়েছে ১৮ ফেব্রুয়ারি। প্রতিদিন বেলা ১১টা থেকে ১টা এবং ৩টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত এটি সবার জন্য উন্মুক্ত। চলবে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। এখানে কোনো আলংকারিক সাজসজ্জা নেই। আছে পোড়া দেয়াল, গলে যাওয়া প্লাস্টিক, ছাইয়ের গন্ধ, ভাঙা আসবাব। কিন্তু সেই ধ্বংসের ভেতরেই শিল্পী দেখাতে চেয়েছেন—অন্ধকারের মধ্যেও আলো থাকে। আগুন সবকিছু পুড়িয়ে দিতে পারে, কিন্তু সত্য, স্মৃতি আর প্রতিবাদকে মুছে ফেলতে পারে না।

প্রদর্শনী ঘুরে বের হওয়ার সময়ও আফসানা মিমির চোখ ভেজা। তবু তাঁর কণ্ঠে ছিল দৃঢ়তা। ‘সকল আঘাতের বিপরীতে শিল্পীরা এভাবেই দাঁড়ান সৃজন ও আলো দিয়ে।’ বললেন আফসানা মিমি।

একজন শিল্পীর চোখে ধ্বংস শুধু ধ্বংস নয়—এটি সময়ের সাক্ষ্য। একটি পোড়া ভবনও হয়ে উঠতে পারে বিবেকের আয়না। প্রথম আলোর সেই পুড়ে যাওয়া ভবনে দাঁড়িয়ে আফসানা মিমি যেন শুধু অতীতের ক্ষত দেখেননি—তিনি দেখেছেন মানুষের ভেতরের আলো নিভে যায়নি। ছাইয়ের ভেতরেও যে অঙ্গার থাকে—সেই বিশ্বাস নিয়েই হয়তো তিনি দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে বেরিয়ে এলেন।

সংঘবদ্ধ উগ্রবাদীদের হামলার শিকার প্রথম আলোর ভবন নিয়ে আয়োজিত শিল্পী মাহ্‌বুবুর রহমানের তৈরি করা ‘আলো’ শীর্ষক প্রদর্শনী দেখতে এর আগে এসেছিলেন বর্তমান সরকারের প্রতিমন্ত্রী, খ্যাতিমান চিত্রশিল্পী, কূটনীতিক, অভিনয়শিল্পীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষেরা।