
নিরাপদ চাকরি, করপোরেট দায়িত্ব আর স্থির আয়-সব ছেড়ে পুরোপুরি অভিনয়ে নাম লেখানোটা সহজ সিদ্ধান্ত নয়। কিন্তু রাশেদ সীমান্ত সেটাই করেছিলেন। এক বছরের বেশি সময় আগে চাকরি ছেড়ে পূর্ণকালীন অভিনয়ে মন দেওয়ার পর থেকেই আলোচনায় তিনি। আর এই পথচলার মাঝেই ২১ ফেব্রুয়ারি তাঁর জন্মদিন। এক বিশেষ দিন, যেদিন তিনি কেক কাটা বা আয়োজনের চেয়ে বেশি ভাবেন জীবনের হিসাব নিয়ে।
১৯৮৮ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি গুলশান আজাদ মসজিদের কোয়ার্টারে জন্ম তাঁর। জন্মদিন নিয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিও আলাদা। তিনি বলেন, ‘জন্মদিন মানেই আমার কাছে জীবন থেকে আরেকটি বছর কমে যাওয়া এবং মৃত্যুর দিকে আরও একটু এগিয়ে যাওয়া। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করি, আরও একটি বছর সুন্দরভাবে অতিক্রম করলাম।’ জাঁকজমক নয়, দিনটি তিনি কাটাতে চান পরিবারের সঙ্গে।
প্রিভিউ কমিটি থেকে ক্যামেরার সামনে
২০১৮ সালে ঈদুল ফিতরে প্রচারিত যে লাউ সেই কদু নাটকের মাধ্যমে অভিনয়জীবন শুরু। সহশিল্পী ছিলেন অহনা রহমান। শুরুটা ছিল নিছক কৌতূহল আর পর্যবেক্ষণের জায়গা থেকে। একটি টেলিভিশন চ্যানেলের মার্কেটিং বিভাগের প্রধান হিসেবে কাজ করতেন রাশেদ। পাশাপাশি ছিলেন প্রিভিউ কমিটির সদস্য; নাটক দেখে মন্তব্য দিতেন। তাঁর বিশ্লেষণী দক্ষতায় মুগ্ধ হয়ে কর্তৃপক্ষই তাঁকে অভিনয়ে নিয়ে আসে। প্রথম নাটকেই দর্শকসাড়া। এরপর অল্প সময়ের মধ্যে শতাধিক নাটকে অভিনয় করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন আঞ্চলিক অভিনয়ের স্বতন্ত্র ধারায়।
‘মধ্যরাতের গল্প’ ও ‘হাবুর স্কলারশিপ’
অভিনীত তৃতীয় নাটক মধ্যরাতের গল্প তাঁকে পৌঁছে দেয় ব্যাপক দর্শকপ্রিয়তায়। ভাড়ায় মোটরবাইকচালক চরিত্রে তাঁর অভিনয় এবং নাজিয়া হক অর্ষার সঙ্গে রসায়ন দর্শকের মন কাড়ে। সেখান থেকেই মূলধারার জনপ্রিয়তায় দৃঢ় অবস্থান তৈরি হয়।
এ প্রসঙ্গে হাবুর স্কলারশিপ নাটকটির কথা না বললেই নয়। বৈশাখী টিভিতে প্রচারিত আলোচিত ধারাবাহিক হাবুর স্কলারশিপ ইতিমধ্যে ৩০০ পর্বের বেশি প্রচারিত হয়েছে। এটি গত কয়েক বছর অন্যতম আলোচিত ধারাবাহিক হিসেবে দর্শকমহলে ব্যাপক সাড়া ফেলে। এই নাটকে ‘হাবু’ চরিত্রে অভিনয় করেন রাশেদ সীমান্ত। গল্পে উঠে এসেছে মেধা পাচার, দেশের উন্নয়ন ও গ্রামীণ পরিবর্তনের বিষয়। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে ফ্যাকাল্টি হওয়ার সুযোগ পেয়েও হাবু দেশে ফিরে আসে, কৃষি ও কর্মসংস্থানে নতুন মডেল তৈরি করে। অস্ট্রেলিয়ার কৃষি ফার্মের মডেলও দেখানো হয়েছে নাটকে। চমকপ্রদ বিষয়, এই ধারাবাহিকের গল্পও লিখেছেন রাশেদ নিজেই। তবে নিজের নামে নয়; তাঁর মেয়ে সুবাতা রাহিক জারিফার নামে।
আরটিভিতে বর্তমানে প্রচারিত হচ্ছে তাঁর অভিনীত ধারাবাহিক ঘুরিতেছে পাংখা। এখানে তিনি ‘পাংখা’ চরিত্রে অভিনয় করছেন। পাশাপাশি একক নাটক ও ঈদের বিশেষ নাটকের শুটিং নিয়েও ব্যস্ত সময় পার করছেন। আসন্ন ঈদে প্রায় ১৫টি নাটকে তাঁকে দেখা যাবে।
চাকরি ছাড়ার সিদ্ধান্ত ও বিশ্বাস
অফিস ও শুটিং একসঙ্গে সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছিল। মাসে ২০-২৫ দিন শুটিং থাকলে করপোরেট দায়িত্ব পালন করা সম্ভব হচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত চাকরি ছেড়ে দেন। অনিশ্চয়তা নিয়ে প্রশ্ন করলে তাঁর জবাব,
‘পরিশ্রম করলে রিজিক আল্লাহ নিজেই দিয়ে দেন । গত এক বছর খুব ভালো গেছে। আমি জীবনের সেরা সময় পার করছি।’ সহকর্মীদের ভাষ্য, তিনি সময়মতো শুটিং লোকেশনে পৌঁছান এবং রাত ৯-১০টার পর শুটিং করেন না। তাঁর যুক্তি, প্রডাকশনের কর্মীরা যেন গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করতে বাধ্য না হন। গল্প বাছাইয়েও সচেতন রাশেদ। পরিবার নিয়ে বসে দেখা যায়, এমন গল্পেই কাজ করতে চান তিনি। নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে, এমন অনেক প্রস্তাব তিনি ফিরিয়ে দিয়েছেন।
রাশেদ সীমান্তের কাছে জন্মদিন মানে নতুন চুক্তি—নিজের সঙ্গে, সময়ের সঙ্গে। আত্মসমালোচনা, কৃতজ্ঞতা আর মানবকল্যাণে কাজ করার প্রতিশ্রুতি। ২১ ফেব্রুয়ারির এই দিনে যখন তিনি আরেকটি বছর পেরোনোর হিসাব কষছেন, দর্শকও দেখছেন, চাকরি ছেড়ে ঝুঁকি নেওয়া মানুষটি অভিনয়ে কতটা দৃঢ় হয়ে উঠেছেন।
রাশেদের ভাষায়, ‘যত দিন বেঁচে আছি, সুস্থ থাকি, মানুষের জন্য কিছু করতে পারি, এটাই কামনা।’