রাজপরিবারের ভেতরেই যখন কোন্দল, তখন সেই রাজত্ব শক্তভাবে টিকে থাকতে পারে না

‘হাউস অব ড্রাগন’-এর একটি দৃশ্য
ছবি : আইএমডিবি

রূপকথার যে প্রাণীর মুখ দিয়ে স্ফুলিঙ্গ বেরোয়, সেটিই টারগ্যারিয়েনদের বাহন। যুদ্ধক্ষেত্রে এর চেয়ে বড় অস্ত্র আর কী হতে পারে? জলজ্যান্ত ড্রাগনের সারথি যারা, তাদের আধিপত্য সবখানে। কিন্তু রাজপরিবারের ভেতরেই যখন কোন্দল, তখন সেই রাজত্ব শক্তভাবে টিকে থাকতে পারে না?


ওয়েস্টেরোসের অন্যতম শক্তিশালী পরিবার তারা। তাদের ধূলিসাৎ করার ক্ষমতা সপ্তরাজ্যে কারোরই নেই। টারগ্যারিয়েনদের হারানোর শক্তি আছে কেবল তাদের নিজেদেরই। নিজেদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের পর হয়েছেও ঠিক তা-ই। শুরু হয় ড্রাগননৃত্য বা ডান্স অব দ্য ড্রাগনস। আকাশে ড্রাগনদের লড়াইয়েই সবকিছু খোয়াতে বসেছিল তারা। তারপর?

মার্কিন ঔপন্যাসিক জর্জ আর আর মার্টিনের লেখা ‘ফায়ার অ্যান্ড ব্লাড’ অবলম্বনে নির্মিত হয় এইচবিওর ‘হাউস অব দ্য ড্রাগন’ সিরিজটি। ‘গেম অব থ্রোনস’-এর ঘটনাবলিরও দুই শতাব্দী আগে টারগ্যারিয়েনদের কতটা দাপট ছিল, ঘটনাক্রমে কীভাবে তার খোলনলচে পাল্টে গেল, সেটি নিয়েই বানানো এ সিরিজ।

‘হাউস অব ড্রাগন’-এ ম্যাট স্মিথ

পাঠক নিশ্চয়ই ‘গেম অব থ্রোনস’-এর কথা ভুলে যাননি। মার্টিনের ‘অ্যা সং অব আইস অ্যান্ড ফায়ার’-এর ওপর নির্মিত সিরিজটি যখন শুরু হয়েছিল, তখন সেখানে টারগ্যারিয়েন সাম্রাজ্যের তেমন কিছুই অবশিষ্ট নেই। কেবল ড্যানেইরিস টারগ্যারিয়েনের হাত ধরে ক্ষমতার লড়াইয়ের জন্য তারা আবার ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়ে ওঠেছিল।

২০১১-এর সেই সাড়া জাগানো সিরিজেরই প্রিকুয়েল ‘হাউস অব দ্য ড্রাগন’। সিরিজের নির্মাণকাজে বইটির লেখক সক্রিয়ভাবে যুক্ত আছেন। তার মতে, ওয়েস্টেরোসের একজন আর্চমেয়স্টারের লেখা ইতিহাসপঞ্জির ওপর নির্মিত নতুন এই সিরিজ।

‘হাউস অব ড্রাগন’-এর একটি দৃশ্য

শুরুটা ড্যানেইরিসের জন্মের মোটামুটি ১৭২ বছর আগে, রাজা ভিসেইরিস টারগ্যারিয়েনের শাসনামল থেকে। রাজা-রানি পুত্রসন্তানের আশায় আছেন। দম্পতির রেনেইরা নামের মেয়েসন্তান থাকলেও উত্তরাধিকার হিসেবে ছেলেই চাই। কারণ, সাম্রাজ্যের মানুষ কোনো মেয়েকে শাসক হিসেবে মেনে নেবে না। ছেলেসন্তানের জন্য চেষ্টা করে তারা বেশ কয়েকবার ব্যর্থও। ভিসেইরিসের ছোট ভাই ডেমনও রাজকার্য পালনের যোগ্য নন। ছেলেসন্তান না থাকায় রাজা হয়তো তাকেই উত্তরাধিকার ঘোষণা করে দেবেন, এমন গুঞ্জন লোকমুখে। রাজার ডান হাত হিসেবে থাকা অটো হাইটাওয়ারেরও আছে আলাদা পরিকল্পনা। অর্থাৎ চারদিক থেকেই সারাক্ষণ কূটচাল চলছে।


ছেলেসন্তান জন্ম দিতে গিয়েই রানি মারা যান। রানি আর ছেলেসন্তানের মধ্যে কাকে বাঁচানো হবে, এই প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে ভিসেইরিস সন্তানকে বেছে নিলেও জন্মের পরই সন্তানও মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। নিজের মেয়ে রেনেইরাকেই রাজা তার উত্তরাধিকার হিসেবে ঘোষণা করেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সভাসদ এবং অন্যরা তার কতটুকু তোয়াক্কা করবে, তার নিশ্চয়তা নেই।


পূর্ববর্তী রাজা জেহেরিসও ভরা মজলিশে নিজের দৌহিত্র ভিসেইরিস এবং দৌহিত্রীর রেইনিসের মধ্যে ভিসেইরিসকেই উত্তরাধিকার হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। নিজের খুড়তুতো বোন রেইনিসকে টপকে রাজা হয়েছেন, মেয়ের ক্ষেত্রেও একই সমস্যার সূত্রপাত হতে পারে, এ রকম আশঙ্কা তার থেকেই যায়।


চারপাশ থেকে দ্বিতীয় বিয়ে করার চাপ আসতে থাকায় শেষতক ভিসেইরিস বিয়ে করতে বাধ্য হন। সাম্রাজ্যের আরেক গুরুত্বপূর্ণ ভ্যালেরিয়ান পরিবার থেকে প্রস্তাব এলেও তিনি অটো হাইটাওয়ারের মেয়ে অ্যালিসেন্টকে বিয়ে করেন। অ্যালিসেন্টের সঙ্গে একসময় রেনেইরারও বেশ ভালো বন্ধুত্ব থাকলেও রাজাকে বিয়ে করায় দুজনের বন্ধুত্বে কাটা পড়ে। সময় যত গড়িয়েছে, বিভিন্ন ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুজনের মধ্যে শত্রুতাও বেড়েছে।

‘হাউস অব ড্রাগন’-এর একটি দৃশ্য

শান্তি-সমৃদ্ধির সময়েই নাকি যুদ্ধের বীজ উপ্ত হয়। টারগ্যারিয়েন পরিবারের ভেতরও সম্ভাব্য বিভিন্ন উত্তরাধিকারের মধ্যে কার সিংহাসনে আরোহণ করার অধিকার কতটা ন্যায্য, তা নিয়ে একসময় লড়াই বাধে। ড্রাগনে ড্রাগনে যুদ্ধের শুরু এভাবেই।


যথেষ্ট জনপ্রিয়তার কারণে প্রিমিয়ারের পাঁচ দিনের মাথায়ই সিরিজটি ২য় মৌসুমের জন্য সবুজ সংকেত পেয়েছে। তুমুল জনপ্রিয় ‘গেম অব থ্রোনস’-এর প্রিকুয়েল হওয়ায় দর্শকের প্রত্যাশার পারদও উঁচু৷ ‘গেম অব থ্রোনস’ যেভাবে দর্শককে মোহাবিষ্ট করেছিল, একদম ভিন্ন একটি জগতের সঙ্গে তাদের পরিচয় ঘটিয়েছিল, ‘হাউস অব দ্য ড্রাগন’ এখনো হয়তো সেই উচ্চতায় নিজেকে নিয়ে যেতে পারেনি। সিরিজ দুটিকে পাশাপাশি রাখলে দর্শকেরা সম্ভবত এখনো ‘গেম অব থ্রোনস’কেই এগিয়ে রাখবেন। কিন্তু এ তো সবে শুরু।


আবার ‘গেম অব থ্রোনস’-এর শেষ মৌসুম নিয়ে অনেকের মধ্যেই অসন্তোষ ছিল। এত চমৎকারভাবে একটি সিরিজ নির্মাণ করে শেষে তাড়াহুড়ো করে ইতি টানায় দর্শকমহলে তা ক্ষোভের জন্মও দিয়েছিল। মূলত বই শেষ হওয়ার আগেই সিরিজ শেষের দিকে চলে আসায়, নির্মাতারাই এর গল্প লিখেছিলেন। সেটি দর্শকের মন জোগাতে পারেনি। এ জন্য নতুন সিরিজটি নিয়ে দর্শকদের মধ্যে আগ্রহের কোনো কমতি নেই। ২০১৮ সালেই গল্প লেখা হয়ে গেছে। নির্মাতাদের নতুন করে গল্প লেখার কোনো চাপ নেই। বরং পর্দায় কীভাবে আরও সুন্দর করে তা তুলে ধরা যায়, সেদিকেই তারা মনোযোগ দিতে পারবেন। ‘গেম অব থ্রোনস’-এর শেষ মৌসুমে হতাশ দর্শকেরা এটা ভেবেও স্বস্তি পেতে পারেন।


ধূসর চরিত্র নির্মাণে পটুতা দেখিয়ে ‘হাউস অব দ্য ড্রাগন’ তার পূর্বসূরিকে যথাযথভাবে অনুসরণ করছে। এখানে এমন কোনো চরিত্র পাবেন না যে সর্বোতভাবে ভালো বা খারাপ। বরং দোষে-গুণে মিলিয়ে এখানের প্রত্যেকে।

‘হাউস অব দ্য ড্রাগন’–এর একটি দৃশ্য

সেট ডিজাইনে নৈপুণ্যের কারণে রেডকিপের রাজকীয় হলঘর বা ড্রিফটমার্কের সৈকত-পাহাড়-টিলার নয়নাভিরাম সৌন্দর্য যেন ক্ষণিকেই দর্শককে ওয়েস্টোরোসের ফ্যান্টাসি জগতে নিয়ে যায়। সমসাময়িক আরেকটি ফ্যান্টাসিধর্মী সিরিজ অ্যামাজন প্রাইমের ‘দ্য লর্ড অব দ্য রিংস: রিংস অব পাওয়ার’ও সুন্দর সেট তৈরি করছে। তবে জনপ্রিয়তায় তা হাউস অব দ্য ড্রাগনের সঙ্গে পেরে ওঠছে না।


গল্পে সরাসরি প্রয়োজন নেই, এমন অনেক কিছুরও দেখা মিলেছিল ‘গেম অব থ্রোনস’-এ। যত নগণ্য চরিত্রই হোক না কেন, তারও একটি পেছনকার গল্প থাকত সেখানে। চরিত্রগুলোকে আকর্ষণীয় এবং প্রাসঙ্গিক করে তুলতে পারাই হয়তো এর সবচেয়ে শক্তিশালী দিক ছিল।


অন্যদিকে, এখন পর্যন্ত বর্তমান সিরিজটির অন্যতম সমস্যা এর সীমাবদ্ধ গণ্ডি। কয়েকটি নির্দিষ্ট চরিত্রকেই বারবার দেখে তাদের কথোপকথন দর্শকের কাছে একপর্যায়ে হয়ে ওঠছিল একঘেয়ে। অবশ্য গৃহযুদ্ধের ন্যারেটিভকে সামনে রেখে এগোনোর কারণে ‘হাউস অব দ্য ড্রাগন’-এ মূল গল্পের বাইরে বেশি কিছু আসার সুযোগ পাচ্ছিল না।

‘হাউস অব ড্রাগন’-এর একটি দৃশ্য

তবে ‘ইতিহাস’কে ভালোমতো প্রতিষ্ঠিত করে ফেলতে পারলে, এর চরিত্ররাও দর্শকের মধ্যে নিজেদের আরও সুন্দরভাবে মেলে ধরার সুযোগ পাবেন। সুসংবাদটি হলো, সিরিজের প্রতিটি পর্বই যেন তার আগেরটিকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। কাহিনির মোড় ঘোরানো পর্ব আট ইতিমধ্যেই মৌসুম সেরা। প্রচণ্ড শারীরিক এবং মানসিক পীড়ার পরও রাজা ভিসেইরিস শেষবারের মতো নিজেকে দৃঢ়ভাবে মেলে ধরলেন, ভাই ডেমনের সঙ্গে তার সম্পর্কের একটি নতুন বাঁকেরও দেখা মিলল। আর পর্দায় ভিসেইরিসকে নিটোলভাবে তুলে আনায় প্যাডি কনসিডিন ভক্তদের মধ্যেও জায়গা করে নিলেন। অন্যান্য কলাকুশলীও দিনকে দিন সিরিজটির চিত্রনাট্য, চরিত্রদের মধ্যকার রসায়ন, দৃশ্যসজ্জা, আবহ সংগীতকে চমৎকারভাবে শাণিত করে চলছেন।


প্যাডি ছাড়াও এতে অভিনয় করছেন এমা ডার্সি, ম্যাট স্মিথ, অলিভিয়া কুক, রিস ইফানস, ফ্যাবিয়েন ফ্র‍্যাংকেল প্রমুখ। কৈশোরের রেনেইরা চরিত্রে মিলি অ্যালকক ও অ্যালিসেন্টের ভূমিকায় এমিলি ক্যারিও স্বল্প সময়ের মধ্যেই দর্শকদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন।


‘গেম অব থ্রোনস’-এ টারগ্যারিয়েনরা ছিল রহস্যময়, তাদের আদ্যোপান্ত কিছুই জানা যায়নি সেখানে। সেটির বড্ড প্রয়োজন ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, সামনের পর্বে টারগ্যারিয়েন গৃহযুদ্ধের ঘটনায় চলে যাবে সিরিজটি। সেখানে তারা নতুন কী চমক উপহার দেয়, সেই অপেক্ষায় রইলাম। সঙ্গে ড্রাগন তো আছেই!