সাত দিন ‘প্রক্সি’ দিয়ে সেরা অভিনেতা

মাসুম আজিজ
ছবি: ফেসবুক

শুরুতে নিজেকে গানের মানুষ বলেই পরিচয় দিতেন মাসুম আজিজ। কিশোর বয়স থেকেই গান গাওয়া ও বাদ্যযন্ত্র বাজানোর প্রতি ছিল তাঁর আগ্রহ। কিন্তু চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় একটি নাটকে অভিনয়ের সুযোগ তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। গানের জন্য নাটকে যুক্ত হয়েছিলেন, সেখান থেকেই ধীরে ধীরে অভিনয়ের প্রেমে পড়ে যান তিনি। পরে মঞ্চ, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্রে নিজের অভিনয় দিয়ে দর্শকের মনে জায়গা করে নেন এই শিল্পী। সেই দর্শকপ্রিয়তা পাওয়া শিল্পীর আজ চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী। তাঁর ক্যারিয়ার নিয়ে জেনে নিতে পারেন।

ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক করতে গিয়ে অভিনয়  
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় আন্তবিশ্ববিদ্যালয় হল নাটক প্রতিযোগিতায় একটি নাটকের ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক তৈরির দায়িত্ব পেয়েছিলেন মাসুম আজিজ। তখন নাটকের আবহ সংগীত তৈরিতে ক্যাসেট ব্যবহার করা হতো। নাটকের প্রধান চরিত্রে অভিনয় করার কথা ছিল শফিক কামাল নামের এক শিক্ষার্থীর। কিন্তু নিয়মিত মহড়ায় না আসায় হলের প্রভোস্ট মাসুম আজিজকে তাঁর জায়গায় অভিনয়ের জন্য বলেন।
এভাবেই প্রথম অভিনয়ের ‘প্রক্সি’ দিতে শুরু করেন তিনি। টানা সাত দিন অন্য অভিনেতার হয়ে মহড়ায় অংশ নেন। পরে শফিক কামাল নাটকটি করবেন না বলে জানিয়ে দিলে বিপাকে পড়ে হল কর্তৃপক্ষ। শেষ পর্যন্ত প্রভোস্ট শফিক হায়দার চৌধুরীর কথায় প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেন মাসুম আজিজ। নাটকটি প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে সেরা অভিনেতার পুরস্কার পায়। এই স্বীকৃতি তাঁর অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ বাড়িয়ে দেয়।

শৈশবে দুরন্ত ছিলেন মাসুম আজিজ

অভিনয় থেকে নির্দেশনায়
প্রথম নাটকে সাফল্যের পর চট্টগ্রামের থিয়েটারের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ে মাসুম আজিজের। পরের বছর আন্তহল নাটক প্রতিযোগিতায় নাটক নির্মাণের দায়িত্বও পান তিনি। ঋত্বিক কুমার ঘটকের ‘জ্বালা’ নাটকটি পরিচালনা করে প্রশংসা অর্জন করেন। এ নাটকের জন্যও আন্তবিশ্ববিদ্যালয় হলের সেরা নির্দেশক নির্বাচিত হন তিনি। পরপর অভিনয় ও নির্দেশনায় সাফল্য পাওয়ার পর তাঁর মনে হয় অভিনয়কে পেশা হিসেবে নেওয়া সম্ভব। তবে এ জন্য ঢাকায় আসতে হবে—এ কথাও বুঝতে পেরেছিলেন তিনি।

ঢাকায় এসে সংগ্রাম
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে ঢাকায় আসেন মাসুম আজিজ। শিক্ষক শফিকুল আমানের মাধ্যমে পরিচয় হয় নাট্যনির্দেশক নাসির উদ্দীন ইউসুফের সঙ্গে। তবে ঢাকা থিয়েটারে কাজের সুযোগ সহজে মেলেনি। বিভিন্ন সময়ে চাকরি করলেও অভিনয়ের টান তাঁকে স্থির থাকতে দেয়নি। জীবিকার জন্য প্রিন্টিং সরবরাহের ব্যবসা করতেন। পাশাপাশি বাসায় নিয়মিত হারমোনিয়াম নিয়ে রেওয়াজ করতেন। অভিনয়ের প্রতি ভালোবাসা থেকে একসময় চাকরির নিরাপত্তার চেয়ে মঞ্চকেই বেছে নেন তিনি।
পরে এস এম সোলায়মানের সঙ্গে পরিচয় হয় তাঁর। সোলায়মানের মাধ্যমে জামিল আহমেদের সঙ্গে পরিচিত হন। ‘ইন্সপেক্টর জেনারেল’ নাটকে ডিসি চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ তৈরি হলে মঞ্চে তাঁর পথচলা আরও দৃঢ় হয়। এরপর ঢাকা পদাতিকের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অভিনয় চালিয়ে যান।

মাসুম আজিজ

মঞ্চ থেকে টেলিভিশনে
দীর্ঘদিন মঞ্চে অভিনয়ের পর ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের নাটকে অভিনয় শুরু করেন মাসুম আজিজ। এরপর মঞ্চ ও টেলিভিশনের পাশাপাশি চলচ্চিত্রেও কাজ করেছেন। হুমায়ূন আহমেদের ‘উড়ে যায় বকপক্ষী’ ও সালাহউদ্দিন লাভলুর ‘তিন গ্যাদা’সহ নানা নাটকে অভিনয় করে পরিচিতি পান তিনি। ‘ঘানি’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য ২০০৬ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেতার স্বীকৃতি পান। অভিনয়ের পাশাপাশি চিত্রনাট্যকার ও নাট্যনির্মাতা হিসেবেও কাজ করেছেন। সরকারি অনুদানে নির্মিত ‘সনাতন গল্প’ চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেন তিনি। শিল্পকলায় অবদানের জন্য ২০২২ সালে তাঁকে একুশে পদক দেওয়া হয়।

গান দিয়ে শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত অভিনয়ই হয়ে ওঠে মাসুম আজিজের জীবনের প্রধান ভালোবাসা। এক সাক্ষাৎকারে মঞ্চের প্রতি তাঁর টান বোঝাতে বলেছিলেন, ‘আমি যদি মঞ্চে অভিনয় করতে করতেই মারা যেতাম, তাহলে আমি হতাম ভাগ্যবান ব্যক্তি।’

মাসুম আজিজের মৃত্যুর ৪ বছর  
তিনি দীর্ঘদিন ধরে ক্যানসার ও হৃদ্‌রোগে ভুগছিলেন। পরে ২০২২ সালের শুরুর দিকে তাঁর ফুসফুসে ক্যানসার ধরা পড়ে। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে মৃত্যুর চার দিন আগে তাঁকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে চার বছর আগে আজকের দিনে, ১৭ অক্টোবর ২টা ৪৫ মিনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৮ বছর।

মাসুম আজিজ