স্পেনের কবি ও নাট্যকার ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকাকে ঘিরে নির্মিত কুইয়ার মহাকাব্যিক সিনেমা ‘দ্য ব্ল্যাক বল’ কান উৎসবে ইতিহাস গড়ল। পরিচালক জুটি হাভিয়ের অ্যামব্রাসি ও হাভিয়েল কালভোর নতুন সিনেমাটি কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শনের পর টানা ১৬ মিনিট দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানিয়েছেন দর্শক।
সিনেমাটির অন্যতম বড় আকর্ষণ ছিলেন অস্কারজয়ী অভিনেত্রী পেনেলোপে ক্রুজ। তাঁর উপস্থিতি যেন পুরো প্রিমিয়ারকে আরও আবেগঘন করে তোলে। কান উৎসবের প্রতিযোগিতা বিভাগে এটি ছিল এই পরিচালকদ্বয়ের প্রথম সিনেমা, আর প্রথম উপস্থিতিতেই তাঁরা সবচেয়ে দীর্ঘ স্ট্যান্ডিং ওভেশনগুলোর একটি পেয়ে আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছেন।
‘দ্য ব্ল্যাক বল’ কেবল একটি সিনেমা নয়; এটি স্পেনের দীর্ঘ সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের মধ্য দিয়ে সমকামী মানুষের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের গল্প। সিনেমাটি নির্মিত হয়েছে ১৯৩২, ১৯৩৭ ও ২০১৭—এই তিনটি সময়কে ঘিরে।
চিত্রনাট্যের অনুপ্রেরণা এসেছে লোরকার অসমাপ্ত একটি লেখার অংশ থেকে। লোরকা ১৯৩৬ সালে স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধের সময় ফ্যাসিস্ট বাহিনীর হাতে নিহত হন। দীর্ঘদিন ধরেই ধারণা করা হয়, তাঁর সমকামী পরিচয়ও হত্যার অন্যতম কারণ ছিল।
সিনেমার নাম ‘দ্য ব্ল্যাক বল’-এর মধ্যেও রয়েছে প্রতীকী অর্থ। অতীতে স্পেনের কিছু ক্লাবে গোপন ভোটের মাধ্যমে কাউকে প্রত্যাখ্যান করতে কালো বল ব্যবহার করা হতো। সেই সামাজিক বর্জনের প্রতীকই সিনেমার শিরোনাম।
প্রদর্শনী শেষে দর্শকদের করতালি থামছিল না। আবেগাপ্লুত পরিচালকদ্বয় মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলেন, ‘৯০ বছর আগে ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকাকে হত্যা করা হয়েছিল শুধু তিনি সমকামী ছিলেন বলে। যাঁরা মনে করেন এভাবে অধিকারকে পিছিয়ে দেওয়া যাবে, তাঁদের জন্য আমাদের উত্তর—আমরা এখানেই থাকব।’
সিনেমাটিতে পেনেলোপের উপস্থিতি তুলনামূলক ছোট হলেও প্রভাবশালী। তাঁর অভিনয়কে অনেক সমালোচকই ‘দারুণ আবেগপূর্ণ উপস্থিতি’ বলে উল্লেখ করেছেন।
১৩ মিনিট অভিবাদন
কানের গ্র্যান্ড থিয়েটার লুমিয়েরে ‘কাওয়ার্ড’-এর প্রিমিয়ার শেষে দর্শকের করতালি থামতেই চাইছিল না। টানা ১৩ মিনিট দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানানো হয় ছবিটিকে। উৎসবের এবারের প্রতিযোগিতা বিভাগে এটি সবচেয়ে উষ্ণ প্রতিক্রিয়াগুলোর একটি বলে মনে করা হচ্ছে।
ছবির প্রদর্শনী শেষে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন পরিচালক লুকাস দন্ত। দর্শকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘ভালোবাসা ছড়িয়ে দিন, যুদ্ধ নয়।’ সংক্ষিপ্ত এ বক্তব্যেই যেন ছবির মূল দর্শন উঠে আসে।
সিনেমার গল্প আবর্তিত হয়েছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কার দুই তরুণকে ঘিরে। নতুন সৈনিক পিয়েরে যুদ্ধক্ষেত্রে এসে নিজেকে প্রমাণ করতে চায়। অন্যদিকে ফ্রান্সিস যুদ্ধের বিভীষিকার মধ্যে সহযোদ্ধাদের মানসিকভাবে বাঁচিয়ে রাখতে একটি থিয়েটার শো আয়োজনের চেষ্টা করে।
যুদ্ধ, মৃত্যু আর ধ্বংসের মধ্যেও এই দুই তরুণ ধীরে ধীরে একে অপরের কাছে আসে। ভয়ংকর বাস্তবতার ভেতরে ভালোবাসা ও মানবিকতার ক্ষুদ্র আশ্রয় খুঁজে পাওয়ার গল্পই জীবন্ত হয়ে ওঠে সিনেমাটিতে।
ছবিতে অভিনয় করেছেন ইমানুয়েল মাক্কিয়া ও ভ্যালোঁতাঁ কাম্পানি। তাঁদের অভিনয় নিয়ে কানে ব্যাপক প্রশংসা শোনা গেছে।
দন্ত জানিয়েছেন, চার বছর আগে পাওয়া একটি সাদা-কালো ছবিই তাঁকে এই সিনেমা নির্মাণে অনুপ্রাণিত করে। ছবিতে দেখা যায়, যুদ্ধের পেছনের সারিতে এক তরুণ সৈনিক বালুর বস্তা দিয়ে তৈরি স্কার্ট পরে অন্য সৈন্যদের সামনে অভিনয় করছেন।
এটি কানে পরিচালক লুকাস দন্তর তৃতীয় উপস্থিতি। তাঁর প্রথম ছবি ‘গার্ল’ ২০১৮ সালে আঁ সার্তে রিগা বিভাগে পুরস্কার জিতেছিল। এরপর ২০২২ সালে ‘ক্লোজ’ কানের প্রতিযোগিতা বিভাগে আলোড়ন তোলে।
আন্তর্জাতিক সমালোচকদের বড় একটি অংশ ইতিমধ্যে ছবিটিকে এ বছরের সম্ভাব্য পুরস্কারজয়ী হিসেবে বিবেচনা করতে শুরু করেছে।
চমকে দিলেন ডেমি
গত বৃহস্পতিবার কান উৎসবে স্প্যানিশ নির্মাতা ‘দ্য ব্ল্যাক বল’-এর প্রিমিয়ারে অংশ নেন ডেমি মুর। সেখানে তাঁর উপস্থিতির চেয়ে বেশি আলোচনায় আসে তাঁর বদলে যাওয়া লুক। বহু বছর ধরে একই ধরনের লম্বা চুলে দেখা গেলেও এবার তিনি বেছে নেন কাঁধছোঁয়া ছোট চুলের স্টাইল। সাইড পার্ট করা ঢেউখেলানো কার্লি লব কাট চুলের সঙ্গে তাঁর পুরো লুককে অনেক বেশি আধুনিক ও গ্ল্যামারাস দেখাচ্ছিল।
এটি অবশ্য চলতি বছরে ডেমি মুরের প্রথম বড় ‘হেয়ার ট্রান্সফরমেশন’ নয়। এর আগে ফেব্রুয়ারিতে মিলান ফ্যাশন উইকেও তিনি চমকে দিয়েছিলেন ভক্তদের। তখন তাঁকে দেখা যায় ‘ওয়েট লুক’ বব কাটে। স্টাইলিস্টের ভাষ্য অনুযায়ী, নতুন প্রজন্মের ফ্যাশনধারার সঙ্গে মিল রেখে ডেমি মুরকে আরও সাহসী ও আধুনিকভাবে উপস্থাপন করতেই এ পরিবর্তন আনা হয়েছিল। আর কান উৎসবে তাঁর নতুন কার্লি লব যেন সেই রূপান্তরকেই আরও এক ধাপ এগিয়ে নিল।
ভ্যারাইটি অবলম্বনে