
গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে নির্মিত তথ্যচিত্র ‘নাজা’ পেয়েছে বিশেষ জুরি পুরস্কার। পুরস্কার নেওয়ার সময় নির্মাতা ইউভাল আব্রাহাম বললেন, ‘বাস্তবতার দিকে না তাকানোর জন্য অনেক কিছুই করা হচ্ছে।’
ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে এবার সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দেওয়া ছবিগুলোর একটি ‘নাজা’। গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান, বেসামরিক মানুষ হত্যার অভিযোগ এবং সেই প্রক্রিয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের নানা দিক নিয়ে নির্মিত তথ্যচিত্রটি শেষ পর্যন্ত পেয়েছে উৎসবের বিশেষ জুরি পুরস্কার। ইসরায়েলি নির্মাতা ইউভাল আব্রাহাম ও র্যাচেল সোরের ছবিটি পুরস্কার পাওয়ার পাশাপাশি ভেনিসে গড়েছে অভ্যর্থনার নতুন রেকর্ড।
১০ সেপ্টেম্বর ভেনিসে ‘নাজা’র প্রিমিয়ারের পর দর্শকেরা প্রায় ২৫ মিনিট দাঁড়িয়ে করতালি দেন। এটিই ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের ইতিহাসে দীর্ঘতম রেকর্ড করা স্ট্যান্ডিং ওভেশন। এর আগে এই রেকর্ড ছিল গত বছর ভেনিসে প্রদর্শিত ‘দ্য ভয়েস অব হিন্দ রজব’-এর দখলে। গাজায় পাঁচ বছর বয়সী ফিলিস্তিনি শিশু হিন্দ রাজাবের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে নির্মিত ছবিটি পেয়েছিল প্রায় ২৩ মিনিটের স্ট্যান্ডিং ওভেশন।
‘নাজা’র প্রিমিয়ারে নির্মাতা আব্রাহাম ও র্যাচেল সোরকে ঘিরে দর্শকদের উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি অনেকের হাতে ছিল ফিলিস্তিনি পতাকা। ছবিটির নির্বাহী প্রযোজক, অস্কারজয়ী নির্মাতা জোনাথন গ্লেজারও প্রদর্শনীতে উপস্থিত ছিলেন। তিনি দুই নির্মাতাকে আলিঙ্গন করেন।
পুরস্কার পাওয়ার পর যা বললেন নির্মাতা
ভেনিসের সমাপনী অনুষ্ঠানে বিশেষ জুরি পুরস্কার হাতে নিয়ে আব্রাহামের কণ্ঠে ছিল আবেগ ও ক্ষোভ। তিনি বলেন, ছবিটি নিয়ে ইসরায়েলের রাজনীতিক ও সাংবাদিকদের আক্রমণ এবং ছবিটি না দেখেই সেটিকে অস্বীকার করার বিষয়টি তাঁর জন্য সহজ নয়।
‘বাস্তবতার দিকে না তাকানোর জন্য অনেক কিছুই করা হচ্ছে’-পুরস্কার গ্রহণের সময় এমন মন্তব্য করেন আব্রাহাম।
আব্রাহাম ও র্যাচেল সোরের দাবি, ছবিটিতে যে অভিযোগ ও সাক্ষ্য তুলে ধরা হয়েছে, সেগুলো এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। ‘নাজা’ মুক্তির পরদিন ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ছবিতে উত্থাপিত অভিযোগগুলো ‘সম্পূর্ণভাবে’ অস্বীকার করেছে।
পুরস্কার নিতে মঞ্চে উঠে ইউভাল আব্রাহাম বলেন, ‘এখানে দাঁড়িয়ে এই পুরস্কার নেওয়া সত্যিই সহজ নয়। কারণ, আমি ভাবছি, ইসরায়েলের রাজনীতিক ও দেশের সাংবাদিকদের কথা, যাঁরা ছবিটি না দেখেই এখন এর বিরুদ্ধে আক্রমণ করছেন, ছবিটির বক্তব্য অস্বীকার করছেন।’
এরপর আরও তীব্র হয়ে ওঠে তাঁর বক্তব্য। আব্রাহাম বলেন, ‘বাস্তবতার দিকে না তাকানোর জন্য অনেক কিছুই করা হচ্ছে। এই উৎসব শুরুর পর মাত্র ১০ দিনের মধ্যেই গাজায় ইসরায়েলের হামলায় অন্তত ছয় ফিলিস্তিনি শিশু নিহত হয়েছে। বোমা হামলার শিকার একটি স্কুলে মারা গেছে তিন বছরের এক শিশু, বাবার সঙ্গে গাড়িতে থাকা অবস্থায় নিহত হয়েছে সাত বছরের আরেক শিশু, আর দুই বোন মারা গেছে নিজেদের ঘরে ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায়।’
ছবিটির জন্য যেসব ইসরায়েলি গোয়েন্দা কর্মকর্তার সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে, তাঁদের বক্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে আব্রাহাম বলেন, গাজায় ব্যাপক হত্যাকাণ্ড কোনো দুর্ঘটনা নয়; বরং এটি একটি পরিকল্পিত ও পদ্ধতিগত প্রক্রিয়ার অংশ। তাঁর ভাষায়, ফিলিস্তিনিদের ‘সম্পূর্ণ অমানবিক’ হিসেবে দেখার মানসিকতা থেকেই এসব কর্মকাণ্ড ও হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হচ্ছে বলে ওই কর্মকর্তারা তাঁদের জানিয়েছেন।
আব্রাহাম আরও বলেন, ‘একটি বিষয় আমি পরিষ্কার করে বলতে চাই, এই সত্যের প্রমাণ শুরু থেকেই নথিবদ্ধ হয়েছে। ফিলিস্তিনি সাংবাদিকেরা তা বিশ্বকে জানিয়েছেন। গাজায় ইসরায়েলি হামলায় দুই শর বেশি সাংবাদিক নিহত হয়েছেন; তাঁদের কণ্ঠ স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছে, তাঁদের বক্তব্য অস্বীকার করা হয়েছে।’
আব্রাহামের মতে, কোনো অপরাধ অস্বীকার করাই সেই অপরাধকে টিকে থাকার সুযোগ করে দেয়। সে কারণেই তিনি চান ইসরায়েলিরা ‘নাজা’ দেখুন। একই সঙ্গে ইতালির দর্শকদেরও ছবিটি দেখার আহ্বান জানান তিনি। আব্রাহামের অভিযোগ, ইতালি ও জার্মানির সরকার ইসরায়েলের ওপর এমন চাপ তৈরির পথে বাধা দিচ্ছে, যা এই পরিস্থিতির অবসান ঘটাতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের দর্শকদেরও ছবিটি দেখার আহ্বান জানান তিনি। কারণ তাঁর দাবি, গাজায় চলমান হত্যাকাণ্ডের বড় একটি অংশের অর্থায়ন করছে যুক্তরাষ্ট্র। বক্তব্যের শেষে ছবিটির প্রযোজকদের ধন্যবাদ জানান আব্রাহাম।
২৪ ইসরায়েলি সেনা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তার সাক্ষ্য
প্রায় তিন বছর ধরে অনুসন্ধান করে তৈরি হয়েছে ৮০ মিনিটের ‘নাজা’। ছবিতে সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী ও গোয়েন্দা বিভাগের ২৪ জন সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তা, সেনা এবং অভ্যন্তরীণ সূত্রের। নিরাপত্তার কারণে তাঁদের পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে। তেল আবিবের বিভিন্ন ছাদে রাতের আঁধারে তাঁদের সাক্ষাৎকার ধারণ করা হয়। পরে তাঁদের মুখ ও কণ্ঠ ডিজিটালি পরিবর্তন করা হয়েছে।
ছবির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এআই-সহায়িত লক্ষ্য নির্ধারণ ব্যবস্থা। ‘নাজা’–তে ল্যাভেন্ডার নামে একটি এআইনির্ভর ব্যবস্থার কথা উঠে এসেছে, যা গাজার টেলিযোগাযোগ ও নজরদারি থেকে সংগৃহীত তথ্য ব্যবহার করে সম্ভাব্য লক্ষ্য শনাক্ত করতে পারে বলে সাক্ষাৎকারদাতারা দাবি করেছেন।
নির্মাতারা দেখাতে চেয়েছেন, প্রযুক্তির মাধ্যমে কীভাবে বিপুলসংখ্যক লক্ষ্য দ্রুত শনাক্ত ও হামলার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। ছবিতে এক সাক্ষাৎকারদাতা এই প্রক্রিয়াকে ‘কারখানার মতো’ বলে বর্ণনা করেছেন। আরেকজন বলেছেন, দূর থেকে লক্ষ্য নির্ধারণের পুরো বিষয়টি অনেকটা ‘ভিডিও গেমের মতো’ মনে হতো।
‘নাজা’ নামের অর্থ কী?
ছবির নামটিও এসেছে ইসরায়েলি সামরিক ও গোয়েন্দা ব্যবস্থায় ব্যবহৃত একটি শব্দ থেকে। ‘নাজা’ এমন একটি সংক্ষিপ্ত রূপ, যার মাধ্যমে কোনো বিমান হামলায় সম্ভাব্য বেসামরিক প্রাণহানির সংখ্যা বোঝানো হয় বলে ছবিতে দাবি করা হয়েছে।
অর্থাৎ যেসব মানুষ হামলার সরাসরি লক্ষ্য নন, কিন্তু হামলায় মারা যেতে পারেন; তাঁদের সম্ভাব্য সংখ্যা আগেই হিসাবের মধ্যে রাখার একটি ধারণার সঙ্গে শব্দটি যুক্ত।
এই ধারণাকেই ছবির নির্মাতারা তাঁদের অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, গাজায় বেসামরিক মানুষের প্রাণহানিকে কেবল অনিচ্ছাকৃত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখলে পুরো ব্যবস্থাটিকে বোঝা যাবে না; বরং কীভাবে লক্ষ্য নির্ধারণ ও হামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, সেটিই খতিয়ে দেখা জরুরি।
‘নো আদার ল্যান্ড’-এর পর আবার গাজা
ইউভাল আব্রাহাম ও র্যাচেল সোরের নাম আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র অঙ্গনে আগে থেকেই পরিচিত। তাঁরা ২০২৫ সালে অস্কারজয়ী তথ্যচিত্র ‘নো আদার ল্যান্ড’-এর সহনির্মাতা। বাসেল আদরা ও হামদান বাল্লালের সঙ্গে তৈরি সেই ছবিতে পশ্চিম তীরের মাসাফের ইয়াত্তায় ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর উচ্ছেদ ও ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা তুলে ধরা হয়েছিল।
‘নাজা’ সেই কাজেরই যেন আরও বিস্তৃত ও অনুসন্ধানী পর্ব। তবে এবার ক্যামেরা শুধু ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দিকে তাকায়নি; বরং যুদ্ধ পরিচালনার ব্যবস্থার ভেতরের মানুষদেরও কথা বলিয়েছে।
ছবিটি প্রযোজনা করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান। প্রযোজক জেমস উইলসন এবং নির্বাহী প্রযোজক হিসেবে আছেন ‘জোনাথন গ্লেজার-দ্য জোন অব ইন্টারেস্ট’-এর অস্কারজয়ী নির্মাতা।
পুরস্কারের আগে থেকেই আলোচনার কেন্দ্রে
ভেনিসে ‘নাজা’র গুরুত্ব অবশ্য শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রদর্শনীর পর সমালোচকদের প্রতিক্রিয়াও ছিল তীব্র। প্রায় ২৫ মিনিটের রেকর্ড অভ্যর্থনা ছবিটিকে উৎসবের অন্যতম আলোচিত চলচ্চিত্রে পরিণত করে। একপর্যায়ে এমন আলোচনাও শুরু হয়েছিল, ছবিটি ভেনিসের সর্বোচ্চ পুরস্কার গোল্ডেন লায়ন জিততে পারে কি না। শেষ পর্যন্ত সেই পুরস্কার যায় মে এল-তুখির ‘ওম্যান আননোন’-এর হাতে। ‘পসিবল লাভ’ পায় গ্র্যান্ড জুরি পুরস্কার, আর ‘নাজা’র হাতে ওঠে বিশেষ জুরি পুরস্কার।
‘নাজা’র পরবর্তী প্রদর্শনী হবে স্পেনের সান সেবাস্তিয়ান চলচ্চিত্র উৎসবে, ২৩ সেপ্টেম্বর এবং নিউইয়র্ক চলচ্চিত্র উৎসবে, ২৬ সেপ্টেম্বর। ছবিটির আন্তর্জাতিক বিক্রয়স্বত্ব দেখছে ফরাসি প্রতিষ্ঠান এমকে২ ফিল্মস।
এএফপি, দ্য টেলিগ্রাফ ও দ্য গার্ডিয়ান অবলম্বনে