‘ল্যান্ড অব সিন’–এর দৃশ্য। ছবি: নেটফ্লিক্স
‘ল্যান্ড অব সিন’–এর দৃশ্য। ছবি: নেটফ্লিক্স

রিভিউ

‘আপনি এটা জানতে চাইছেন পুলিশ হিসেবে না একজন মা হিসেবে?’

নর্ডিক নোয়া সিরিজ মানেই অন্ধকারে ডুবে থাকা সব চরিত্র। অতীতের ক্ষত বয়ে বেড়ানো তদন্তকারী, ছোট শহরের ভেতরে জমে থাকা দুর্নীতি, নিগৃহীত কিশোর-কিশোরী, নদী কিংবা ফিয়র্ডে ভেসে ওঠা মৃতদেহ। এখানে অভিনয় সংযত, দৃশ্য ধূসর; কখনো তুষারাবৃত অঞ্চল, কখনো আবার বাদামি আবহ। ধীরে ধীরে জটিলতার দিকে মোড় নেয় কাহিনি। নতুন বছরের শুরুতে নেটফ্লিক্সে সেই পরিচিত আবহেই হাজির হয়েছে পাঁচ পর্বের সুইডিশ ক্রাইম ড্রামা ‘ল্যান্ড অব সিন’ নিয়ে। বেশ জনপ্রিয়ও হয়েছে। টানা কয়েক সপ্তাহ ধরে বৈশ্বিক টপ চার্টের শীর্ষ দশে জায়াগা ধরে রেখেছিল। তবে তলিয়ে দেখলে সিরিজটি আদতে গড়পড়তা; নর্ডিক নোয়া ভক্তদের জন্য এতে নতুনত্ব খুব কম।

একনজরেসিরিজ: ‘ল্যান্ড অব সিন’ভাষা: সুইডিশধরন: ক্রাইম ড্রামাপরিচালক: পিটার গ্রোনলুন্ডঅভিনয়: ক্রিস্টা কোসোনেন, মোহাম্মাদ নূর ওকলাহ, পিটার গ্যান্টম্যানস্ট্রিমিং: নেটফ্লিক্সপর্বসংখ্যা: ৫

সিরিজের নির্মাতা পিটার গ্রোনলুন্ড আগে ‘গোলায়াত’ ও ‘বিয়ারটাউন’-এর মতো অপরাধকাহিনি বানিয়ে হাত পাকিয়েছেন। নতুন গল্পের পটভূমি সুইডেনের স্কানিয়া অঞ্চলের এক ছোট কৃষিপ্রধান জনপদ। সেখানে এক টিনএজারের নিখোঁজ হওয়া থেকে শুরু হয় রহস্য। তদন্তে নামেন দানি (ক্রিস্টা কোসোনেন); শারীরিক ও মানসিকভাবে বিধ্বস্ত এক পুলিশ কর্মকর্তা, নিজের ছেলের সঙ্গেই যাঁর সম্পর্ক নেই। তাঁকে কুরে কুরে খায় এই দূরত্ব। আবার যে শহরকে ঘিরে তদন্ত, তার সঙ্গেও জড়িয়ে আছে দানির তিক্ত অতীত। তারপরও শিক্ষানবিশ সহকারী মালিককে (মোহাম্মাদ নূর ওকলাহ) নিয়ে এ শহরেই দানিকে ফিরে আসতে হয়। সেখানে ফিরে দানির মনে হয়, এটা শুধু তদন্ত নয়; বরং পুরোনো ক্ষত উসকে দেওয়া।

দ্রুতই নিখোঁজ রহস্য হত্যা তদন্তে রূপ নেয়। দানিকে লড়তে হয় একদিকে নিজের অতীতের দানবদের সঙ্গে, অন্যদিকে এমন এক জনপদের মানুষের সঙ্গে, যারা বাইরের পুলিশ, বিশেষ করে দানির মতো বিতর্কিত অতীতের কাউকে একেবারেই পছন্দ করে না।

তদন্ত যত এগোতে থাকে, ততই তাঁর মনে হয়, এই হত্যারহস্যের সঙ্গে তাঁর ছেলের কোনো সম্পর্ক আছে। এই আশঙ্কা তাঁকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খায়। তদন্তকারী আর মায়ের ভূমিকা একসময় ভয়ংকরভাবে এক হয়ে যায়। একপর্যায়ে একজন যখন প্রশ্ন করেন, ‘আপনি এটা জানতে চাইছেন একজন পুলিশ হিসেবে না একজন মা হিসেবে?’ দানি উত্তর দেন, ‘দুটোই।’ এ কথাই যেন সিরিজের সারকথা। ‘ল্যান্ড অব সিন’ আসলে সেই বাবা-মায়েদের গল্প, যাঁরা কোনো এক সময় বুঝতে পারেন, তাঁরা নিজেদের সন্তানের পাশে ঠিকমতো দাঁড়াতে পারেননি।

‘ল্যান্ড অব সিন’–এর দৃশ্য। ছবি: নেটফ্লিক্স

সিরিজের আবহ দর্শকের কাছে একেবারেই অপরিচিত নয়। ‘ব্রডচার্চ’, ‘মেয়ার অব ইস্টটাউন’, ট্রু ডিটেকটিভ’, এমনকি স্ক্যান্ডিনেভীয় অন্যান্য সিরিজ দেখা থাকলে ল্যান্ড অব সিন দেখতে গিয়ে চমকে ওঠার সুযোগ কম। নিষ্প্রাণ চোখ, এলোমেলো চুল, ভঙ্গুর অথচ কঠিন ব্যক্তিত্ব—দানি চরিত্রটি মনে করিয়ে দেয় কেট উইন্সলেটের সেই একরোখা গোয়েন্দা কর্মকর্তাকে। অভিনেত্রী ক্রিস্টা কোসোনেন চরিত্রে যথাযথ ক্লান্তি আর হতাশা এনে দেন ঠিকই, কিন্তু চিত্রনাট্য তাঁকে নৈরাশ্য আর যন্ত্রণার বাইরে খুব বেশি কিছু করার সুযোগ দেয় না। অন্যদিকে মালিক যেন রুটিন চরিত্র; কেবল রাখার জন্যই রাখা।

‘ল্যান্ড অব সিন’–এর দৃশ্য। ছবি: নেটফ্লিক্স

এই সিরিজে সত্যিকার অর্থে নজর কাড়েন পিটার গ্যান্টম্যান অভিনীত এলিস চরিত্রটি—পরিবারের এক কর্তৃত্বপরায়ণ পুরুষ। প্রথম দিকে দানির বিরোধী মনে হলেও ধীরে ধীরে তিনি বদলে যান। নিজের পারিবারিক নৈতিকতা থেকেই তিনি ন্যায়বিচার খুঁজতে চান। তাঁর ক্লান্ত মুখ, একটানা গম্ভীর কণ্ঠ আর ভাঙাচোরা শরীর সিরিজের দমবন্ধ করা আবহকে খানিকটা হলেও গভীরতা দেয়।

নামের মতোই ‘ল্যান্ড অব সিন’ বিষণ্নতার ভারে ভারী। ব্যাঞ্জোর সুরে ভর করা সংগীত শুধু খুনিদের নয়, শহরের শত্রুভাবাপন্ন মানুষদের থেকেও আসন্ন বিপদের আভাস দেয়। মাদক পাচার, চরম দারিদ্র্য, প্রজন্মগত ট্রমা, জমি নিয়ে বিবাদ—সব উপাদানই আছে। কিন্তু এত কিছু একসঙ্গে দেখাতে গিয়ে গল্পটা ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ে। নির্মাতার উদ্দেশ্য ছিল জটিলতা তৈরি কিন্তু সেটা না হয়ে একটি উপাদান বরং অন্যটিকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়।

পাঁচ পর্বের হলেও সিরিজটি টানা দেখাটা বেশ কঠিন; কারণটা দৈর্ঘ্য নয়, চিত্রনাট্যের একঘেয়েমি। এমনিতে সিরিজটি সাড়ে তিন ঘণ্টার মতো, তবু এমন গল্প আরও সময়ের দাবি করে।

শেষ পর্যন্ত যখন ক্লান্তিকর এক সমাপ্তিতে পৌঁছায় ‘ল্যান্ড অব সিন’, তখন মনে হয়, একই ঘরানার আরও বহু শক্তিশালী কাজ যেখানে আছে, তখন এটা কেন দেখব?