
অভিনেত্রী হবেন, সেটা ঠিক করেছিলেন ছোটবেলাতেই। ইচ্ছাটা ছিল এমন—এমন কিছু করবেন, যা তাঁকে প্রেরণা জোগাবে আবার সৃজনশীলতার মধ্যেও রাখবে। ইচ্ছাটা যে ভালোভাবেই পূরণ হয়েছিল, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তিন দশকের বেশি সময়ের ক্যারিয়ারের পেনেলোপে ক্রুজ বিশ্ব চলচ্চিত্রের দর্শকের কাছে সমীহজাগানিয়া এক নাম। নব্বইয়ের দশকে এই স্প্যানিশ অভিনেত্রীর সৌন্দর্যে বুঁদ হয়েছেন দর্শক, পরের সময়টাতে নানা বৈচিত্র্যময় চরিত্রে অভিনয় করে নিজের দক্ষতার সীমারেখা যেন নিজেই ভেঙেছেন। অভিনয় যেন তাঁর কাছে হয়ে উঠেছিল আজ্ঞাবহ এক পুতুল, যাকে নিজের বশে রেখে ইচ্ছেমতো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। সেই পেনেলোপে ক্রুজেরও ৫২ হয়ে গেল! আজ নন্দিত এই স্প্যানিশ অভিনেত্রীর ৫৩তম জন্মদিন।
আজ ৫৩-তে পা দিলেন পেনেলোপে। তবে বয়স বাড়া উপভোগ করছেন অভিনত্রী। দুই বছর আগে এক অনুষ্ঠানে ৫০ বছরের মাইলফলক পূর্ণ করা নিয়ে কথা বলেন তিনি। অভিনেত্রী বলেন, ‘জীবনের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু করব, এটা ভেবে আমি খুব রোমাঞ্চিত। এই নতুন ইনিংসেও আমি অনেক কিছু শিখতে চাই। কারণ, অভিনয় এমনই একটি পেশা, যেখানে সব সময়ই শেখার মধ্যে থাকতে হয়।’
স্বপ্নের শুরু
১৯৭৪ সালে স্পেনের আলকোবেন্দাস শহরে জন্ম পেনেলোপের। তাঁর বাবা ছিলেন গাড়ি মেকানিক, মা ছিলেন হেয়ারড্রেসার। একেবারে মধ্যবিত্ত পরিবারে বেড়ে ওঠা এই মেয়েটির জীবনের প্রথম স্বপ্ন কিন্তু অভিনয় নয়, নাচ। ছোটবেলায় তিনি ক্ল্যাসিক্যাল ব্যালেতে প্রশিক্ষণ নেন প্রায় ৯ বছর। স্পেনের জাতীয় কনজারভেটরিতেও পড়াশোনা করেন। কিন্তু একটি সিনেমা তাঁর জীবন বদলে দেয়—‘টাই মি আপ! টাই মি ডাউন!’ পেদ্রো আলমোদোভার এই কাজ দেখে পেনেলোপে বুঝতে পারেন, তাঁর আসল জায়গা ক্যামেরার সামনে। তখন থেকেই শুরু অভিনয়ের স্বপ্ন দেখা।
প্রথম লড়াই: ছোট পর্দা থেকে বড় পর্দা
১৫ বছর বয়সে একটি ট্যালেন্ট এজেন্সিতে যোগ দেন পেনেলোপে। শত শত প্রতিযোগীর ভিড়ে জায়গা করে নেওয়া সহজ ছিল না। তবে তাঁর দৃঢ়তা তাঁকে এগিয়ে নেয়। প্রথম দিকে তিনি মিউজিক ভিডিও ও টিভি শোতে কাজ করেন।
নব্বইয়ের দশকের ‘হামন হামন’, ‘ওপেন ইয়োর আইজ’, ‘দ্য গার্ল অব ইয়োর ড্রিমস’-এর মতো সিনেমা যেমন করেছেন, পরে আবার সেই পেনেলোপেকেই দেখা গেছে উডি অ্যালেনের ‘ভিকি ক্রিস্টি বার্সেলোনা’ করতে; ছবিটির জন্য সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রীর অস্কারও জিতেছিলেন তিনি। পরে ‘ভ্যানিলা স্কাই’, ‘ব্লো’, ‘পাইরেটস অব দ্য ক্যারিবিয়ান’-এর মতো সিনেমাও করেছেন।
পেনেলোপের সিনেমার আলাপ উঠলে অতি অবশ্যই আসবে পেদ্রো আলমোদোভারের নাম। এই স্প্যানিশ নির্মাতার সঙ্গে পেনেলোপের রসায়ন বিশ্ব সিনেমার দর্শকের কাছে অজানা নয়। এই স্প্যানিশ অভিনেত্রী-পরিচালক জুটি একসঙ্গে উপহার দিয়েছেন ‘লাইভ ফ্লেশ’, ‘অল অ্যাবাউট মাই মাদার’, ‘ভলবার’, ‘ব্রোকেন এমব্রাসেস’, ‘পেইন অ্যান্ড গ্লোরি’, ‘প্যারালাল মাদার্স’-এর মতো নন্দিত চলচ্চিত্র।
হলিউডে সংগ্রাম: ভাষা ও পরিচয়ের বাধা
নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে পেনেলোপে পা রাখেন হলিউডে। কিন্তু এখানেই শুরু হয় আসল চ্যালেঞ্জ। ইংরেজি ভাষায় তিনি তখন সাবলীল ছিলেন না। অডিশনে সংলাপ মুখস্থ করে বলতে হতো, অনেক সময় বুঝেও উঠতে পারতেন না পুরো স্ক্রিপ্ট।
পেনেলোপের প্রথম ইংরেজি ছবিগুলোর মধ্যে ছিল ‘অল দ্য প্রিটি হর্সেস’ ও ‘ভ্যানিলা স্কাই’। তিনি কাজ করেন টম ক্রুজের সঙ্গে। যদিও এই সময় তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও মিডিয়ায় বেশ আলোচনা হয়, কিন্তু পেনেলোপে ধীরে ধীরে নিজের জায়গা তৈরি করতে থাকেন।
এ পর্যায়ে পেনেলোপে বুঝেছিলেন, শুধু গ্ল্যামার দিয়ে নয়, অভিনয়দক্ষতা দিয়েই টিকে থাকতে হবে। তাই তিনি বারবার ফিরে যান নিজের শিকড়ে—স্প্যানিশ সিনেমায়, বিশেষ করে পেদ্রো আলমোদোভারের সঙ্গে কাজ করতে। পেনেলোপের সিনেমার আলাপ উঠলে অতি অবশ্যই আসবে পেদ্রো আলমোদোভারের নাম। এই স্প্যানিশ নির্মাতার সঙ্গে পেনেলোপের রসায়ন বিশ্ব সিনেমার দর্শকের কাছে অজানা নয়। এই স্প্যানিশ অভিনেত্রী-পরিচালক জুটি একসঙ্গে উপহার দিয়েছেন ‘লাইভ ফ্লেশ’, ‘অল অ্যাবাউট মাই মাদার’, ‘ভলবার’, ‘ব্রোকেন এমব্রাসেস’, ‘পেইন অ্যান্ড গ্লোরি’, ‘প্যারালাল মাদার্স’-এর মতো নন্দিত চলচ্চিত্র।
সম্প্রতি স্মার্টলেস পডকাস্টে হাজির হয়ে আলমোদোভারের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলেছেন পেনেলোপে। ‘তার সঙ্গে আমার একটা আলাদা যোগসূত্র আছে, সে আমার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের একজন,’ প্রিয় পরিচালক সম্পর্কে এভাবেই বলেন পেনেলোপে। ১৯৯৭ সালে ‘লাইভ ফ্লেশ’ দিয়ে শুরু, এরপর গত ২৭ বছরে পেনেলোপে ও আলমোদোভার জুটিকে পাওয়া গেছে সাতটি সিনেমায়।
আলমোদোভারের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব নিয়ে পেনেলোপে বলেন, ‘আমাদের সম্পর্কটা অদ্ভুত, ব্যক্তি হিসেবে আমরা আলাদা ধরনের; তবু আমরা একসঙ্গে কাজ করলে একটা কিছু তৈরি হয়। আমি তাকে ভালোবাসি, শতভাগ বিশ্বাস করি। একই সঙ্গে তার সঙ্গে কাজ করতে গেলে একটু ভয়েও থাকি। বারবারই মনে হয়, আমার প্রতি তার যে আস্থা, সেটার প্রতিদান দিতে পারব তো!’
পর্দার বাইরে দুজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু হলেও সেটে কাজের ব্যাপারে ব্যক্তিগত সম্পর্ক বাইরে রাখেন বলেও জানান অভিনেত্রী। পেনেলোপে জানান, তাঁরা সেটে চরিত্র, চিত্রনাট্য থেকে শুরু করে খুঁটিনাটি সব বিষয় নিয়ে কথা বলেন; তর্কবিতর্কও হয়।
২০০৬ সালে আসে পেনেলোপের ক্যারিয়ারের মোড় ঘোরানো ছবি ‘ভলবার’। এই ছবিতে তাঁর অভিনয় তাঁকে এনে দেয় অস্কার মনোনয়ন। এরপর ২০০৮ সালে উডি অ্যালেনের ‘ভিকি ক্রিস্টিনা বার্সেলোনা’ ছবির জন্য তিনি জিতে নেন অস্কার। তিনি প্রথম স্প্যানিশ অভিনেত্রী হিসেবে এই সম্মান অর্জন করেন।
বাস্তবতা ও আবেগের মিশেল
পেনেলোপে ক্রুজের অভিনয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তাঁর স্বাভাবিকতা। তিনি চরিত্রের মধ্যে ঢুকে যান, সেটিতে নিজের মতো করে বাঁচেন। তাঁর চোখের ভাষা, সংলাপের ছন্দ—সবকিছুতেই থাকে একধরনের সত্যতা।
বিশেষ করে পেদ্রো আলমোদোভারের ছবিগুলোতে পেনেলোপে নারী চরিত্রের জটিলতা অসাধারণভাবে তুলে ধরেছেন। তাঁর অভিনয় কখনো অতিনাটকীয় নয়, আবার কখনো নিস্তেজও নয়; বরং মাঝামাঝি এক সূক্ষ্ম ভারসাম্য। পর্দায় মায়ের চরিত্রে অভিনয়ের জন্য আলাদা প্রশংসা পান পেনেলোপে। প্রখ্যাত স্প্যানিশ পরিচালক পেদ্রো আলমোদোভারের সঙ্গে সাতটি সিনেমা করেছেন পেনেলোপে ক্রুজ, যার মধ্যে পাঁচটিতেই করেছেন মায়ের চরিত্র।
ব্যক্তিগত জীবন: আলো-ছায়ার গল্প
পেনেলোপের ব্যক্তিগত জীবনও কম আলোচিত নয়। একসময় টম ক্রুজের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল। তবে পরে তিনি বিয়ে করেন স্প্যানিশ অভিনেতা হাভিয়ের বারদেমকে। এই দম্পতি হলিউডের অন্যতম শক্তিশালী জুটি হিসেবে পরিচিত। পেনেলোপে ক্রুজের দাম্পত্য সঙ্গী হাভিয়ের বারদেম স্প্যানিশ অভিনেতা, এই দম্পতির ১০ ও ১২ বছর বয়সী দুই সন্তান আছে। ব্যক্তিগত জীবন বরাবরই আড়ালে রাখতে চান তিনি। সন্তানদের টিভি, ইন্টারনেট তো বটেই, যতটা সম্ভব তাঁদের জনপ্রিয়তার বলয়ের বাইরে রাখতে চান। এ প্রসঙ্গে ফরাসি সাময়িকী এলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অভিনেত্রী জানান, যত দিন পারেন, এভাবেই তিনি সন্তানদের আগলে রাখবেন। বড় হওয়ার পর তারা যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার নেবে।
অভিনয়ের পাশাপাশি নিজের প্রযোজনা সংস্থাও খুলেছেন পেনেলোপে। জানান, ভবিষ্যতে দর্শকদের ভিন্ন স্বাদের বিভিন্ন সিনেমা, তথ্যচিত্র উপহার দিতে চান তিনি। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে পেনেলোপে ক্রুজ শুধু শিল্পী হিসেবেই নন, আর্থিক দিক থেকেও সফল। বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৭৫ মিলিয়ন ডলার (প্রায় ৮০০ কোটি টাকা)।
৫০ পেরিয়ে
আজ ৫৩-তে পা দিলেন পেনেলোপে। তবে বয়স বাড়া উপভোগ করছেন অভিনত্রী। দুই বছর আগে এক অনুষ্ঠানে ৫০ বছরের মাইলফলক পূর্ণ করা নিয়ে কথা বলেন তিনি। অভিনেত্রী বলেন, ‘জীবনের দ্বিতীয় পর্যায় শুরু করব, এটা ভেবে আমি খুব রোমাঞ্চিত। এই নতুন ইনিংসেও আমি অনেক কিছু শিখতে চাই। কারণ, অভিনয় এমনই একটি পেশা, যেখানে সব সময়ই শেখার মধ্যে থাকতে হয়।’
একই অনুষ্ঠানে পেনেলোপেকে জিজ্ঞেস করা হয় অভিনয়ে আসার কারণ। উত্তর দিতে গিয়ে ছেলেবেলায় ফিরে যান তিনি। নিজের দীর্ঘ ক্যারিয়ার নিয়ে পেনেলোপে বলেন, ‘অভিনেত্রী হব, বরাবরই এমন স্বপ্ন দেখে বড় হয়েছি। তবে এটা আমাকে সংশয়েও ফেলেছে। কারণ, আমি এমন একটি চাকরি চেয়েছিলাম, যা আপনাকে প্রেরণা জোগাবে আর সৃজনশীলতার মধ্যে রাখবে। সব সময়ই এমন কাজের জন্য প্রার্থনা করেছি। শেষ পর্যন্ত এমন একটি পেশায় এসেছি, যা আমার স্বপ্নকেও ছাড়িয়ে গেছে। এই যে স্বপ্ন পূরণ হওয়ার অনুভূতি, এটা হারাতে চাই না।’
পিপল ডটকম, ভোগ, রয়টার্স অবলম্বনে