রস‍+আলো

‘এভ্রিথিং ইজ সেটাপ’

এলাকার টং দোকানে চিনি ছাড়া চায়ে চুমুক দিয়ে মুরাদ ভাই সবজান্তার মতো বললেন, ‘জানিস, এই পৃথিবীর সবকিছুই আগে থেকে সেটআপ করা।’

রাতুল ভালো মানুষের মতো বলল, ‘তা তো জানিই। জন্ম, মৃত্যু, বিয়ে সব আগে থেকেই ঠিক করা। মানুষ চাইলেও ভাগ্য বদলাতে পারে না।’

মুরাদ ভাই রাগ করে বললেন, ‘ধুর, এখানে হইতেছে পলিটিকসের কথা। এর মধ্যে তুই নিয়ে আসছিস আধ্যাত্মিক অ্যাঙ্গেল।’

সবুজ হাসিমুখে বলল, ‘ঠিক মেসির গোলের মতো। কখন কোন অ্যাঙ্গেলে শট করবে কেউ জানে না।’

মুরাদ ভাই কট্টর ব্রাজিল সমর্থক। মেসির নাম শুনলেই তার মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। বদহজম শুরু হয়। তিনি চায়ের কাপ রেখে বিকৃত মুখ করে বললেন, ‘রাখ তোর মেসি। মেসির চাইতে ভালো আমি নিজেই খেলতাম বয়সকালে। জীবনে একটাও পেনাল্টিতে গোল দিইনি।’

আমি বলব না বলব না করেও বলে ফেললাম, ‘ভাই, আপনি তো গোলকিপার ছিলেন। আপনাকে পেনাল্টি মারতে কে দেবে।’

মুরাদ ভাই অনেক কষ্টে রাগ কন্ট্রোল করে বললেন, ‘শোন তাহলে। আমি যে বললাম পৃথিবীর সবকিছু আগে থেকে সাজানো, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হলো তোদের আর্জেন্টিনা আর মেসি। টাকা দিয়ে মেসি বিশ্বকাপ অলরেডি কিনে ফেলেছে। ফিফার অফিসে এখন যে বিশ্বকাপ ট্রফি আছে, সেটা নকল। আসলটা মেসির বাসায়। মেসির বউ ট্রফি দিয়ে মশারি টাঙানোর জন্য দেয়ালে পেরেক পোঁতে।’

‘এত দামি একটা জিনিস দিয়ে পেরেক পুঁতবে তাই বলে!’

‘হ্যাঁ, কেনা জিনিস তো, মায়া নাই। খেলে অর্জন করলে ঠিকই মায়া থাকত।’

‘যদি বিশ্বকাপ ট্রফি ভেঙে যায়?’

‘গেলে যাবে। আরেকটা কিনে নেবে। মেসির কি টাকার অভাব আছে নাকি!’

মুরাদ ভাই শুধু বলে তা-ই না, মনেপ্রাণে বিশ্বাসও করে যে পৃথিবীর সব ঘটনার পেছনে গভীর ষড়যন্ত্র বিদ্যমান। সেটা বিশ্বকাপ ফুটবল হোক কিংবা ওনার বউয়ের মেকআপই হোক না কেন। সবকিছুর পেছনে মেসির হাত আছে বলেও ওনার ধারণা।

মুরাদ ভাইয়ের বউ নীলা ভাবি সেদিন ৩ হাজার টাকা দিয়ে একটা লিপস্টিক কেনার পর তিনি ৩ ঘণ্টা হিসাব করে বের করেছেন কীভাবে এই লিপস্টিকের বড় একটা অর্থ মেসির পকেটে যাচ্ছে। ভাবিকে এই কথা বোঝানোর পর ভাবি আরও একটা লিপস্টিক অর্ডার করেছে। কারণ, ভাবি আর্জেন্টিনার ফ্যান। উনি চান মেসি তার মাধ্যমে কিছু টাকা আয় করুক। এই দুঃখে মুরাদ ভাইয়ের তিন দিন বদহজম হয়েছে। তারপরও উনি গ্যাসের ওষুধ খাননি। কারণ, মানুষের পেটে গ্যাস বলে কিছু নাই। এটা ডাক্তারদের এক গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ। তা ছাড়া গ্যাসের ওষুধ কিনলে টাকার একটা অংশ যাবে মেসির অ্যাকাউন্টে। লাভ কী!

সেদিন অফিস শেষ করে সরাসরি আমার বাসায় চলে এসেছেন মুরাদ ভাই। উত্তেজিত কণ্ঠে বললেন, ‘ঘটনা জানিস কিছু?’

‘না তো। কী ঘটনা?’

‘জানার কথাও না। আমেরিকার হোয়াইট হাউসে টপ সিক্রেট একটা মিটিং হইছে। মিটিংয়ে উপস্থিত ছিল ডোনাল্ড ট্রাম্প, ফিফা প্রেসিডেন্ট, লিওনেল মেসি আর ইলুমিনাতির সভাপতি। সেই মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হইছে, এবার বিশ্বকাপ আর্জেন্টিনাকে দেওয়া হবে। কড়া নিরাপত্তার সঙ্গে এই মিটিং করা হয়েছে। যাতে পৃথিবীর কেউ কোনোভাবেই টের না পায়।’

‘এত টপ সিক্রেট ঘটনা আপনি কীভাবে জানলেন?’

মুরাদ ভাই আমতা-আমতা করে বললেন, ‘আমাকে অফিসের নাইটগার্ড রমিজ বলল, তাকে নাকি এক রিকশাওয়ালা বলেছে।’

মুরাদ ভাই আরেক দিন খবর নিয়ে এলেন মেসি ইলুমিনাতিতে যোগ দিয়েছে। ইলুমিনাতি মেসিকে কথা দিয়েছে ম্যাচ জেতানোর দায়িত্ব তাদের।

আরেক দিন জানালেন, মেসিই আসলে ইলুমিনাতির প্রেসিডেন্ট। পুরো বিশ্ব নিয়ন্ত্রণ করে মেসি। মেসির কত টাকা আছে, সেটা সে নিজেও জানে না। ফিফা চলেই মেসির টাকায়। মেসিকে বিশ্বকাপ না দিয়ে উপায় আছে?

তবে সবচেয়ে বড় খবর নিয়ে এসেছেন গতকাল। বিশ্বকাপ ফুটবল নাকি আমরা যা দেখছি, সব ভুল। পুরো খেলা লাইভ হচ্ছে না, এটা হলিউডের একটা স্টুডিওতে আগে থেকে শুটিং করে পরে চালানো হচ্ছে। স্ক্রিপ্ট লিখছে হলিউডের বড় বড় রাইটাররা। শুটিংয়ের পুরো টাকা দিচ্ছে মেসি।

ভাই প্রতিদিন নানা তথ্য আনছে আর ওদিকে নীলা ভাবি বিশ্বকাপ কেনার জন্য মেসির বিকাশে টাকা পাঠাচ্ছে। এখন পর্যন্ত নাকি ১১ হাজার টাকা পাঠাইছে। আরও লাগলে আরও পাঠাবে। তবে বিশ্বকাপ মেসিকে কিনতেই হবে।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘টাকা পাঠানোর জন্য মেসির নম্বর কই পাইলেন?’

নীলা ভাবি বললেন, ‘মেসির নম্বর পাইনি। মেসির খালাশাশুড়ির ছেলে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। তার বাসা নওগাঁ। তার নম্বরে টাকা দিয়েছি। সে মেসিকে পাঠানোর ব্যবস্থা করবে।’

গত ম্যাচে নরওয়ের সঙ্গে ব্রাজিল বাদ পড়ে যাওয়ার পর মুরাদ ভাই খুব কষ্ট পেয়েছেন। মন খারাপ করে বললেন, ‘আজকে ব্রাজিলেরই জেতার কথা ছিল। স্ক্রিপ্টেও সেটাই লেখা ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে টাকা ঢেলে মেসি স্ক্রিপ্ট চেঞ্জ করে ফেলেছে। এসব বিশ্বকাপ দেখার চাইতে নাকি টিভিতে বাচ্চাদের কার্টুন দেখাও ভালো।’

পরদিন থেকে মুরাদ ভাই সত্যি সত্যিই বিশ্বকাপ দেখা বাদ দিয়ে দিলেন। খেলা শুরু হলে ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে ঘুমিয়ে যান। বিশ্বকাপ নিয়ে কোনো কথা বলেন না, আড্ডা দেন না, তর্ক করেন না। কেউ কিছু বলতে গেলেই বলেন, ‘সাজানো বিশ্বকাপ নিয়ে আমার কোনো আগ্রহ নাই। সব স্ক্রিপ্টেড।’

তবে আমাদের সবাইকে অবাক করে দিয়ে আর্জেন্টিনা-মিসর ম্যাচের সময় মুরাদ ভাই টিভির সামনে এসে বসলেন।

রাতুল জিজ্ঞেস করল, ‘ভাই আপনি নাকি আর খেলা দেখবেন না। কারণ, সবকিছু স্ক্রিপ্টেড।’

মুরাদ ভাই মুচকি হেসে বলল, ‘তা তো অবশ্যই। তবে গোপন খবরে জেনেছি আজকের ম্যাচের স্ক্রিপ্ট লিখেছে ক্রিস্টোফার নোলান। সে জন্য দেখতে এসেছি। নোলানের সিনেমা আমার খুবই প্রিয়। ইন্টারস্টেলার আমি তিনবার দেখেছি।’