টা ট কা র স

ভিজিটিং কার্ড

আর দশজন যে উদ্দেশ্যে ঢাকায় আসে, শিপনও সে উদ্দেশ্যেই এসেছে। কিন্তু এলেই কি আর হয়? মামা, খালু না থাকলে চাকরি হয়? এটা যেমন সে জেনেই এ শহরে এন্ট্রি নিয়েছে, তেমনি এটাও শুনে এসেছে, ঢাকা একটা আজব শহর। এ শহরে কার, কখন, কীভাবে কপাল খুলে যাবে, কেউ জানে না।

কপাল খোলার জায়গায় জুতার তলি খুলে যাচ্ছে, কাজ হচ্ছে না। কপাল খোলা তো দূরের কথা, কোনো অফিসের গেটই খোলে না।

হাঁটতে হাঁটতেই চোখে পড়ল ব্যাপারটা। কয়েকটা কার্ড পড়ে আছে ফুটপাতে। ছোট স্কয়ার সাইজের হলুদ রঙের কার্ড। কার্ডগুলোর দিকে তাকিয়ে শিপনের ‘যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখো তাই’ সূত্রের কথা মনে হলো। কয়েকটা কার্ড কুড়িয়ে নিল চট করে।

সাধারণত ভিজিটিং কার্ডে পুরো নাম, যে পোস্টে চাকরি করছে সেই পজিশন, শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকে। আরও থাকে প্রতিষ্ঠানের নাম, ধরন, ঠিকানা, লোগো। এই কার্ডে এর অনেক কিছুই নেই। কটকটা হলুদ রঙের কার্ডে বাংলায় লাল কালিতে লেখা ‘ইমন ভাই’। নামের নিচে বড় করে দেওয়া আছে মোবাইল নম্বর। তার নিচে লেখা আবাসিক হোটেল।

কার্ড উল্টেপাল্টে ভালো করে দেখল। দুই পাশে একই লেখা। ইমন ভাইয়ের কোনো ডেজিগনেশন নেই।

আলাদিন কুড়িয়ে পেয়েছিল জাদুর চেরাগ, শিপন কুড়িয়ে পেল অদ্ভুত ভিজিটিং কার্ড। আর দেরি না করে সেই মোবাইল নম্বরে রিং দিল।

ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে আসে এক কর্কশ গলা।

—কেডা?

এমন প্রশ্নে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায় শিপন। একটু কেশে বলে, আমি শিপন। ইমন স্যারের ভিজিটিং কার্ড পেয়ে ফোন করেছি। ওনাকে দেওয়া যাবে?

—হুম, বুজছি তো। লাগব?

—জি, লাগবে। আমার খুব প্রয়োজন। সে জন্যই ঢাকায় এসেছি।

—এক কাজ করেন, যে ঠিকানা কমু অক্ষন আয়া পড়েন। আমি দাঁড়াইয়া থাকুম। আমার গায়ে লাল গেঞ্জি। রাস্তায় আর কাউরে ঠিকানা জিগায়েন না। বুঝেন না? টপ সিক্রেট।

‘কী বুঝবে?’ জিজ্ঞাসা করার আগেই ফোন কেটে গেল। কী আজব রে বাবা, একবার জিজ্ঞাসাও করল না, কোন পোস্টে চাকরি চায়, শিক্ষাগত যোগ্যতা কী? ইমন ভাইয়ের নিশ্চয়ই ফাইভ স্টার হোটেল। বড় বড় হোটেলের ব্যাপারস্যাপারই আলাদা। খুশিতে লাফাতে লাফাতে ঠিকানামতো এসে পৌঁছায় শিপন। এই বিল্ডিংয়ের সামনে দাঁড়িয়ে ফোন দিতে বলেছে লোকটা।

ডানে, বাঁয়ে, ওপরে, নিচে তাকায় শিপন। কই? কোনো আবাসিক হোটেলের সাইনবোর্ড তো দেখা যাচ্ছে না! বরং বিল্ডিংয়ের সামনে দেখা যাচ্ছে একটা পুলিশ পিকআপ। একটু পরেই পিকআপে লাইন দিয়ে ওঠানো হলো কয়েকজন যুবক–যুবতীকে। তার মতো আরও অনেকেই মহা উৎসাহ নিয়ে তাকিয়ে আছে, কেউ কেউ আবার ভিডিও করছে সেই দৃশ্য।

হঠাৎ শিপনের মনে পড়ে, দৃশ্য দেখার চেয়েও অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ আছে তার। পকেট থেকে ফোন বের করে ইমন ভাইয়ের নম্বরে ফোন দেয়। কল দেওয়ার সাথে সাথেই পিকআপে বসা লাল টি–শার্ট পরা একজন পকেট থেকে ফোন বের করে বলে, ‘আইছেন? বিল্ডিংয়ের সামনে একটা পুলিশের গাড়ি দেখতাছেন?’

এত দূর থেকেও সেই লোকের কথা স্পষ্ট শুনতে পায় শিপন। মোবাইলটা তার কানেই ধরা যে।

বিদ্যুৎ–বেগে উল্টো দিকে ঘুরতে গিয়ে বিদ্যুতের খুঁটিতে বাড়ি খেয়ে বিড়বিড় করে ওঠে শিপন। ঢাকা একটা আজব শহর। এ শহরে কার, কখন, কীভাবে কপাল ফুলে যাবে, কেউ জানে না।