মঙ্গলবার সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি আমার ঘরে একচল্লিশজন মানুষ।
সবাই চুপ। সবাই ফোন হাতে। কেউ আমার দিকে তাকাচ্ছে না।
আমি প্রথমে ভাবলাম ডাকাত। ডাকাত এত চুপ থাকবে কেন? বসে বসে ফেসবুকিং করবে কেন? তারপর একজনকে চিনলাম। আমাদের প্লাম্বার।
সে গত সপ্তাহে বলেছিল, ভাই কাল আসমু।
আমি বলেছিলাম, কয়টায়? সে সিন করেছিল।
তারপর সবাইকে চিনলাম আস্তে আস্তে।
আমার বস, যাকে আমি ছুটির দরখাস্ত পাঠিয়েছিলাম, সিন।
আমার প্রাক্তন, যাকে আমি ‘মনে কি পড়ে?’ লিখেছিলাম দুই হাজার তেইশে, সিন।
ইলেকট্রিশিয়ান। ডেলিভারি ম্যান। কলেজের বন্ধু, যে আমার পাঁচ শ টাকা নিয়েছিল আর ‘দিতেছি দোস্ত’ লিখে পরের সব মেসেজ সিন।
চাচাতো ভাই, যে আমেরিকায় থাকে, আমিও মাস্টার্স করতে যেতে চাই বলে সাহায্য চেয়েছি, সিন।
একটা সুন্দরী মেয়ে যাকে আমি চিনি না, পরে বুঝলাম কিছুদিন আগে ফেসবুকে স্টোরি দেখে ‘ভেরি গরজিয়াস!’ লিখে মেসেজ দিয়েছিলাম। সে সিন করেছিল, এইটাও গোনায় ধরা হয়েছে।
নিয়মটা আস্তে আস্তে বুঝতে পারলাম। যে যাকে সিন করে রিপ্লাই দেয়নি, সে তার ঘরে এসে বসে আছে। রিপ্লাই দিলে চলে যেতে পারবে।
কেউ রিপ্লাই দিচ্ছে না।
আমি প্লাম্বারকে বললাম, ভাই, আপনি তো এইখানেই, ট্যাপটা ঠিক করে দেন।
সে বলল, আজকে টুলস আনি নাই, কাল আসমু।
আমি বললাম, আপনি তো আসছেনই। টুল আনবেন না?
সে বলল, এইটা আসা না, এইটা সিন।
আমার বস আমার বিছানায় বসে ল্যাপটপে কাজ করছেন মহাব্যস্ত চেহারায়। আমি বললাম, স্যার, ছুটিটা?
উনি বললেন, দেখতেছি। উনি এক মাস ধরে দেখতেছেন। এখন আমার বিছানায় বসেও দেখতেছেন।
এক্স প্রেমিকা বারান্দায়। আমি গেলাম। বললাম, তুমি খালি একটা ‘গেট লস্ট’ লিখে চলে যেতে পারো।
ও বলল,
’তোমাকে ‘গেট লস্ট’ লেখা মানে তুমি আবার রচনা লিখবা। তার থেকে এইখানে চুপ করে বসে থাকা ভালো।’
পাঁচ শ টাকা মেরে দেওয়া বন্ধু বলল,
’টাকাটা দিলে যাইতে পারি, কিন্তু আমার কাছে মানিব্যাগটা নাই, সিন করলে মানিব্যাগ সাথে আসে না দোস্ত।’
পরের দিন বুঝলাম এইটা খালি আমার ঘরে না। পুরা ঢাকায়।
পাশের ফ্ল্যাটে ছাব্বিশজন। নিচতলায় দারোয়ানের ছোট্ট ঘরে বাড়িওয়ালা বসা, কারণ দারোয়ান বেতনের কথা বলে সিন হয়েছিল।
মিরপুরে এক মহিলার ঘরে তার নিজের ছেলে, কানাডা থেকে এসে বসে আছে, কারণ মা লিখেছিল ‘খাইছস?’
আর ছেলে দুই সপ্তাহ ধরে সিন।
শহরটা চুপ হয়ে গেছে। রাস্তা ফাঁকা। সবাই অন্য কারও ঘরে বসে আছে, ফোন হাতে, রিপ্লাই না দিয়ে। কারণ, রিপ্লাই দিলে কথা হবে, আর কথা হলে একটা কিছু করতে হবে, আর কিছু করার চেয়ে অন্যের ঘরে চুপ করে বসে থাকা সহজ।
তৃতীয় দিনে বোঝা গেল, সিন শুধু মেসেঞ্জারের না। যে আবেদন, অভিযোগ, হুমকি মানুষ দেখে ফেলে রেখে দিয়েছে, সবই সিন।
সবচেয়ে বেকায়দায় পড়ল চাঁদাবাজরা।
যারা হোয়াটসঅ্যাপে বিদেশি নম্বর থেকে লিখেছিল, ‘দশ লাখ না দিলে আজকেই গুলি কইরা দিমু’, আর ব্যবসায়ীরা ভয়ে ভয়ে সিন করে রেখেছিল, তারা এখন ওই ব্যবসায়ীর ড্রয়িংরুমে বসা। এক ডাক্তারের চেম্বারে তিনজন চাঁদাবাজ রোগীর চেয়ারে। ডাক্তার ওদের প্রেশার মাপলেন, সবারই হাই, প্রেসক্রিপশন লিখে দিলেন।
ঢাকায় পুলিশের তালিকায় বারো শ আশিজন চিহ্নিত চাঁদাবাজ। থানা এখন খালি। কারণ, যারা চাঁদা দাবি করেছে তারা ব্যবসায়ীর ঘরে, আর যারা ‘চাঁদাবিডি ডটকমে’ বেনামে অভিযোগ দিয়েছিল, তাদের ঘরে পুলিশ, কারণ অভিযোগগুলা থানায় ‘সিন’ ছিল।
একজন ওসি একটা মুদি দোকানদারের বাসায় বসে আছেন সাত দিন, বলছেন, ‘ভাই, আপনার অভিযোগটা আমরা গুরুত্বের সাথে দেখতেছি।’ দোকানদার বলছে,
’স্যার, আপনি আমার সোফায় বইসা দেখতেছেন, আর যে হুমকি দিছে সে আমার বেডরুমে।’
সিটি করপোরেশনে যত অভিযোগ গেছে ‘স্যার, আমাদের এলাকায় ডেঙ্গুর প্রকোপ’, সব সিন, আর এখন প্রতিটা অভিযোগকারীর ঘরে একজন করে ওয়ার্ড কাউন্সিলর, ফগার মেশিন কোলে।
সরকারি অফিস আর রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় ধস।
সরকারি অফিস সব খালি। কারণ, কর্মকর্তারা সবাই বিভিন্ন গ্রামের বাড়িতে বসা, যেখানে যেখানে মানুষ দরখাস্ত পাঠিয়েছিল। একজন কর্মকর্তা ভোলার মনপুরায় এক কৃষকের উঠানে বসে আছেন, খালি গায়ে, কারণ কৃষক বারো বছর আগে লিখেছিল,
‘স্যার, নদী আমার তিন বিঘার দুই বিঘা নিয়া গেছে, বাকি এক বিঘায় ধান হইলে আমার মেয়ের বিয়া হয়, একটু বাঁধের ব্যবস্থা করলে বাকিটাও যাইব না।’
আর ফাইলটা ‘সিন’, বারো বছর। মেয়ের বিয়ে হয়েছে, নদী বাকি বিঘাটাও নিয়েছে, কৃষক এখন অন্যের জমিতে কাজ করে। কর্মকর্তা ওই উঠানে বসে আছেন, যেটা এখন নদীর পাড়। কৃষক ওনাকে আখ খেতে দিয়েছে। বলেছে, ‘স্যার, বাঁধ লাগব না আর। জমিই নাই। আপনে খালি বইসা বইসা আউখ খান।’
এক মন্ত্রী, যিনি নির্বাচনের আগে বলেছিলেন ‘জনগণের সাথেই আছি!’
উনি একসঙ্গে চার লাখ ঘরে। কীভাবে, বিজ্ঞান জানে না। প্রতিটা ঘরে ওনার একটা কপি, সোফায়, চা খাচ্ছে।
ওনার দলের লোকজন বলছে, এইটা ষড়যন্ত্র।
বিরোধী দল বলছে, আমরা আগেই বলছিলাম, উনি সব জায়গায় আছেন খালি মন্ত্রণালয়ে নাই।
বিরোধী দলের নেতার ঘরে অবশ্য প্রচুর রিকশাওয়ালা, কারণ রিকশাওয়ালাদের মেসেজ দিয়েছিলেন ‘এবার একবার আমাদের ভোট দিয়েই দেখেন না!’
আর একটা জিনিস। দেশ চলছে। আগের চেয়ে ভালো। কারণ, যাদের ডেস্কে বসার কথা, তারা কেউ ডেস্কে নাই, যাদের সিন করার অভ্যাস নাই তারা দ্রুত ফাইল প্রসেস করে কাজ সেরে ফেলছেন। কোথাও কিছু আটকাচ্ছে না।
চতুর্থ দিন সকালে আমি আমার বাসার একচল্লিশজনকে চা খাওয়ালাম। বাসার নিচের বায়দুলের দোকান থেকে আনতে হয়েছে ফ্লাস্ক ভর্তি করে। বায়দুল নাকি কাউকে মেসেজ দেয় না। কোনো দরকারে সরাসরি কল দেয়। তাই তার কোথাও যাওয়া লাগে নাই। সে চা ডেলিভারি দিয়ে যাওয়ার সময় বলে, ‘ভাই, আমি সারা জীবন কইছি, কথা কইতে হয় মুখে। কেউ শোনে নাই। এখন সবাই অন্যের সোফায়।’ পঞ্চম দিনে আমি নিজেই উধাও হয়ে গেলাম। চোখ খুলে দেখি বাড়িওয়ালার ড্রয়িংরুম। আমার সাথে আরও তেত্রিশজন। বাড়িওয়ালা সোফায়, ফোন হাতে।
আমার মনে পড়ল, ভাড়ার কথা লিখেছিলেন, আমি সিন করেছি। তেরো দিন।
উনি বললেন, ‘ভাড়া দিবেন না আপনারা?’
আমি বললাম, ‘জি অবশ্যই। মানিব্যাগ আসে নাই সাথে।’
উনি হতাশ হয়ে মাথা নাড়ালেন।
আমরা তেত্রিশজন ওনার ড্রয়িংরুমে বসে আছি। ঢাকা শহরে বেশির ভাগ মানুষই এখন নিজের ঘরে নাই।
আমার ঘরে একচল্লিশজন। আমি নাই। ওরা জানেও না।
ফোনটা বের করে দেখি প্লাম্বার লিখছে,
‘ভাই, আপনি কই?’
সিন করে রাখলাম।