আঁকা: সৌখিন
আঁকা: সৌখিন

টা ট কা র স

বেদনা বধিরজীবন

আমি কানে মাঝে মাঝে কিছুটা কম শুনি।

তাতে অবশ্য আমার বিশেষ কোনো অসুবিধা হয় না। অন্যদেরও অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। মফস্‌সল শহরের ঘিঞ্জি এলাকায় চিপা গলির চারতলা বাড়ির দোতলায় কোন অধম বাস করে, সে কানে শুনলেই কী, আর না শুনলেই–বা কী! 

দিনকাল বেশ ভালোই যাচ্ছিল। খালি বাসায় বাজার করে আনার পর আম্মুর রুদ্রমূর্তি দেখে আন্দাজ করতাম, জগতে এই একটি ব্যক্তিই আমার সমস্যা নিয়ে বড্ড চিন্তিত।

এই যেমন সেদিন আম্মু আমাকে আলু, লাউ, পটোল, ধনেপাতা, কাঁচামরিচ আনতে বললেন। সঙ্গে আনতে বললেন মাছ।

মাছের বাজার জায়গাটা আমি খুব ভয় পাই। ভূতে বিশ্বাস করিনি কোনো দিন, তবু ওই একটা জায়গায় গেলে আমার সব বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তাভাবনা লোপ পায়।

কে জানে, অতৃপ্ত মাছের আত্মা...

চারদিকে আঁশটে গন্ধ, অনেক মানুষের কথাবার্তা। কেউ মাছের গায়ে পানি ছিটাতে গিয়ে আমার গায়ে পানি দিয়ে দিল। কাস্টমার আকৃষ্ট করার এ কেমনতর কৌশল! মোটামুটি বিরক্তির ভঙ্গি নিয়ে তাকাতে গিয়ে মাছওয়ালার চেহারা দেখে নিজেই চমকে গেলাম। পান খাওয়া দাঁত, মুখে চওড়া হাসি, লাল চোখ নিয়ে মাছওয়ালা জিজ্ঞেস করল, 

‘কী মাছ নিবেন? রুই, কাতলা, চিংড়ি, দেশি কই...’

‘চিংড়ি কত করে?’

‘কেজি নয় শ। এক দাম।’

আমি আম্মুর পদ্ধতি কাজে লাগাতে চেষ্টা করলাম,

 ‘পাঁচ শ হলে বলেন...’

মাছওয়ালা এমনভাবে তাকাল যে মনে হলো পাঁচ শ টাকায় আমি তার একটি কিডনি নিয়ে নিতে চাইছি।

‘আপনে কি কানে কম শুনেন?’

থতমত খেয়ে গেলাম। মাছওয়ালা জানল কী করে?

‘নয় শ টাকার এক পয়সা কম হইব না।’

অগত্যা চিংড়ির আশা ছেড়ে দিলাম।

‘রুই?’

‘পাঁচ শ...’

আমি অন্য মাছের দিকে চোখ দিলাম। পাঁচ শ টাকায় রুই বেচতে পারলে একই দরে আণুবীক্ষণিক চিংড়ি বেচতে সমস্যা কী?

পাশেই জলজ্যান্ত শিং মাছগুলো একেবারে নৃত্য করতে শুরু করেছে। সাহস করে যদি নিয়ে যেতে পারি, আম্মু তাঁর সন্তানের প্রতি গর্বিত হতে বাধ্য...

মাছওয়ালা বলল, ‘আপনে কি সঙ্গে আদৌ টাকাপয়সা কিছু আনছেন? নাইলে খামখা আমারে খাটায়েন না...’

এত বড় অপমান! আমি আজ শিং মাছ নিয়েই বাড়ি যাব! বললাম, 

‘এক কেজি শিং মাছ দেন।’

‘আট শ পড়বো কিন্তু! বিলের শিং...’

‘বিলের শিং—গরুর শিং বুঝি না। আপনি মাছ দেন।’

মুখে চওড়া হাসি নিয়ে বাসায় রওনা দিলাম। আজ দারুণ বাজার করেছি। শিং মাছগুলো সামলাতে বেশ কষ্ট হচ্ছে, কিন্তু কষ্ট না করলে কেষ্ট মিলবে কী করে!

বাসায় ঢুকতেই আম্মুকে দেখে বিজয়ীর হাসি দিলাম। আম্মু নাক কুঁচকে বললেন, 

‘কী এনেছিস?’

আমি মাছসহ দুই হাত ওপরে তুলে বললাম, 

‘শিং মাছ! তুমি মাছ আনতে বলেছিলে, দেখো কী নিয়ে এসেছি!’

অমনি মাছগুলো পলিথিন থেকে কী করে যেন বাইরে বেরিয়ে এল, একটা পড়ল আমার মুখে, দুটো সোফায়, আর বাকিগুলো বিভিন্ন আসবাবের নিচে ঠিকানা খুঁজে নিল।

আম্মু বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে আছেন।

খানিক বাদে শুকনো গলায় বললেন,‘আমি তোকে একটা মাস্ক কিনতে বলেছিলাম। পুরো বাসা পরিষ্কার করছি, ধুলাবালি থেকে বাঁচার জন্য। এই রুমটা একটু আগেই পরিষ্কার করেছি। আর শিং মাছে আমার অ্যালার্জি...’

আমি চুপচাপ টেবিল-সোফার নিচে শিং মাছগুলো খুঁজতে শুরু করলাম। একেই বলে বেদনা বধিরজীবন!