বেশ কায়দা করে লেখাটা টাইপ করতে হচ্ছে। ল্যাপটপে লিখছি। পাশেই বীথি দাঁড়িয়ে আছে। হাতে সসপ্যান। সেটার হাতল ধরে রেখেছে বীথি, সসপ্যানটার তলা আমার কানে ঠেসে ধরা। মাথাটা একদিকে কাত করে রাখতে হয়েছে। সসপ্যানের পানি যেন পড়ে না যায়।
বীথি নাম হওয়ার কারণেই কি না, আমার পরিবেশবাদী স্ত্রী রিনিউয়েবল এনার্জি ব্যবহারের পক্ষে। তাই আমার কান গরম হলে এভাবেই পানি গরম করে। চা বানায়। খেয়াল করেছি, শীতকাল এলে বাসায় আমার অনেক গুরুত্ব বেড়ে যায়। ওই সময় যে গ্যাস থাকে না।
মাথা গরম থাকলে বীথি ভাতও রান্না করে ফেলে। বাসায় কোনো অতিথিকে রান্না করে খাওয়ানো হবে কি না, তা নির্ভর করে কোন দিন বসের প্রচণ্ড ঝাড়ি খাই, তার ওপর। আমার মাথা প্রচণ্ড গরম থাকলে, সেই গরমে মোটামুটি দুজন অতিথির রান্না সেরে নেওয়া যায়।
বউ মাঝেমধ্যেই অফিসে ফোন দিয়ে বলে, ‘আচ্ছা শোনো, বিদ্যুৎ ভাই আর শাহানা আপা তো আসতে চাচ্ছে। অফিসের কী অবস্থা? আমি কিন্তু মুরগি ম্যারিনেট করে রাখছি।’
বীথি আর তার অতিথিদের কপাল সব সময় ভালো থাকে না। এমন অনেক দিন বসের ঝাড়ি ছাড়াই বাড়িতে ফিরি, একরাশ লজ্জা নিয়ে। বউকে এই মুখ (কিংবা ঠান্ডা মাথা) আমি দেখাব কী করে!
প্রথম আলো আবার ফান ম্যাগাজিন বের করতে যাচ্ছে শোনার পর থেকে কান গরম হয়ে আছে। চায়ের পানি গরম করে ফেলার মতো উত্তপ্ত।
অন্যান্য দেশের ন্যাড়া বেলতলায় একবারই যায়। বাঙালির যেহেতু চিকন বুদ্ধি, বঙ্গদেশীয় ন্যাড়া বেলতলায় যায় দুবার। প্রথমবার পড়ার পর মাথার তালু ঘষতে ঘষতে বেরিয়ে আসে। ফেরার পথে ভাবে, পড়ছেই যখন, বেলটা না নিয়ে আসলে লস। দ্বিতীয়বার গিয়ে দুহাতে দুটি বেল নিয়ে ফেরে। ঠিক ধরেছেন, একটা বেলের লোভে দ্বিতীয়বার বেলতলায় গিয়ে তার মাথায় নিউটনীয় তত্ত্বের প্রয়োগ আরেকবার ঘটে। লোভেই লাভ, LOVE-এ লস।
নিউটন বাংলাদেশে জন্মালে জীবনেও মাধ্যাকর্ষণ থিওরি আবিষ্কার করতে পারত না। ওই সব দেশে মাথায় পড়ে আপেল, কমলা, আঙুর। বাংলাদেশে মাথায় এসে পড়ে বেল, নারকেল, নির্মাণাধীন ভবনের ইট কিংবা মেট্রোরেলের বিয়ারিং প্যাড। খোলা প্রান্তরে দাঁড়িয়ে থাকবেন? মাথায় এসে পড়বে ঠাডা!
সে যা–ই হোক, আমি লিখছিলাম প্রথম আলোর আবার ফান ম্যাগাজিন বের করা নিয়ে।
বঙ্গীয় পত্রিকা হয়েও প্রথম আলো সম্ভবত চতুর্থবার বেলতলায় যাচ্ছে। আলপিন, রস+আলো, কথা কম…। রসিক বাঙালি রসিকতা নিতে পারে না জানার পরও ফিরিয়ে আনছে রস+আলো।
আমি মনে করি না, দৈনিক পত্রিকার আলাদা ফান ম্যাগাজিন থাকা উচিত। কারণ, পত্রিকাজুড়েই তো ফান আর ফান।
যেমন আজকেই বাংলাদেশের চলচ্চিত্রজগতের এক নায়িকাকে নিয়ে অনলাইনে একটি ফটোকার্ড ঘুরছে। শিরোনামটি এমন: ‘চিনি বাবাকে ঠিকই চেনেন, আসল বাবাকে চেনেন না’।
বাংলাদেশের এক নায়িকার বাবা আর্থিক কেলেঙ্কারিতে জড়িয়েছেন। নায়িকার বিবৃতি, বাবার সাথে তাঁর কোনো লেনাদেনা নেই। সেই খবর নিয়েই এই শিরোনাম। নিজে এককালে ১৭ বছর দেশের প্রথম সারির দৈনিকে সাংবাদিকতা করেছি। তবু শিরোনামে ‘চিনি বাবা’ ব্যাপারটা বুঝতে সময় লাগল।
হে বঙ্গ, ভান্ডারে তব বিবিধ ফান।
আরেকটি শিরোনাম নজর কেড়েছে: ‘হরমুজ নেই, তবে তরমুজ আছে’।
আসলে বাংলাদেশে চারদিকে এত ফান এলিমেন্ট, এ কারণে দেখবেন, এখানে স্ট্যান্ডআপ কমেডি ঠিক জমে না। কেউ ‘ট্যাশ’ পায় না।
পত্রিকা তো সমাজের দর্পণ। সমাজে যদি এমন সিচুয়েশনাল কমেডি চলে, পত্রিকায়ও তার প্রতিফলন থাকবে।
আমার ফোনে দেশের দুটি পত্রিকার অনলাইন সংস্করণের একই দিনের সর্বাধিক পঠিত খবরের দুটি স্ক্রিনশট রাখা আছে। এটি বংশপরম্পরায় উত্তরসূরিদের দিয়ে যেতে চাই এবং চাই যে ১০০ বছর পর স্ক্রিনশটটি নিয়ে নৃতাত্ত্বিক গবেষণা হোক। আজি হতে শতবর্ষ পরে, কে তুমি দেখিছ বসি আমার স্ক্রিনশটখানি কৌতূহলভরে…।
কী আছে সেই স্ক্রিনশটে?
গত অন্তর্বর্তী সরকার সংবিধান সংস্কারের জন্য একটি কমিশন গঠন করে। এই কমিশন যেদিন রিপোর্ট দেয়, র্যানডমলি দুটি পত্রিকার অনলাইন ভার্সনে গিয়ে সর্বাধিক পঠিত খবরের তালিকা দেখেছিলাম। দেশের রাষ্ট্রকাঠামোয় এত বড় পরিবর্তনের প্রস্তাব আনা হয়েছে, দেখি কী অবস্থা।
আমার ফোনের স্ক্রিনশট থেকে কিছু খবরের শিরোনাম তুলে ধরছি: ‘পরিমনির নতুন প্রেম? প্রেমিক কে?’ ‘হাসতে হাসতে পরিমনি বললেন, “ও আমার ছোট ভাই”।’ ‘আজ প্রাক্তনকে ক্ষমা করা দিবস’। ‘মাংসের সাথে ঝোল না দেওয়ায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিয়ের দাওয়াতে মারামারি, আহত ৩০’।
বলেন, এরপরও আলাদা করে ফান ম্যাগাজিনের প্রয়োজনটা কী?
হ্যাঁ, একটা কাজ করা যায়। পত্রিকার মূল পাতা যেহেতু ফানি টপিকে ভরে যাচ্ছে, ফান ম্যাগাজিন ছাপতে পারে সিরিয়াস সব লেখা। যেমন, আমিই ‘উদ্ভটনী’ সংখ্যায় লিখতে চেয়েছিলাম ‘কোয়ান্টাম ফিজিকসের লেন্সে বাঙালির জনমনস্তত্ত্ব এবং আলু’।
এই লেখা পড়ে সম্ভাব্য লেখকতালিকা থেকে আমাকে বাদ দেওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। লেখা যদি ছাপা হয়, বুঝব বিভাগীয় সম্পাদক সাহসী। না ছাপা হলে বুঝব তিনি বি.স.ষজ্ঞ।
অলমিতি বিস্তারেণ।