টা ট কা র স

এক পণ্ড হওয়া নাটকের গল্প

‘শিক্ষার বারোটা বাজিয়ে ছাড়বেন আপনারা! আমরা অলরেডি থানায় লিখিত দরখাস্ত দিয়ে এসেছি। এখনই যদি এই আসর বন্ধ না হয়, তবে এলাকার শান্তিতে আগুন জ্বলে উঠবে!’

শীতের এক পড়ন্ত বিকেল। পাড়ার ক্লাবের টিনের ঘরে দারুণ এক কাণ্ড ঘটানোর প্রস্তুতি চলছিল। তরুণরা মিলে ঠিক করেছিল, আগামী শুক্রবার বার্ষিক বনভোজনে একটা ছোটখাটো হাসির নাটক মঞ্চস্থ করা হবে। খাতার পাতায় স্ক্রিপ্ট লেখা শেষ, রিহার্সালও শুরু হয়ে গেছে। সংলাপ আর হারমোনিয়ামের টুংটাং শব্দে ক্লাবঘরটা তখন বেশ জমজমাট। নাটকে খলনায়কের সংলাপ চলছে, এমন সময় ক্লাবের দরজায় হাজির হলেন এলাকার স্বঘোষিত ‘নীতি ও সমাজ রক্ষা কমিটি’র প্রধান মকবুল ভাই ও তাঁর দুই বিশ্বস্ত সাগরেদ।

​মকবুল ভাইয়ের কপালে তখন চিন্তার সাতটি ভাঁজ। তিনি পকেট থেকে একটা খাতা বের করে গম্ভীর গলায় ঘোষণা করলেন, ‘থামুন! বন্ধ করুন এই বাদ্যযন্ত্র!’

​পরিচালক তেজি যুবা রোমেল অবাক হয়ে বলল, ‘কেন, মকবুল ভাই? আমরা তো নাটকের প্র্যাকটিস করছি!’

​মকবুল ভাই চোখ গোল গোল করে বললেন, ‘নাটকের নামে সমাজে যে মহাবিপদের বীজ বপন করা হচ্ছে, তা কি আপনারা বোঝেন? ঘরে-বাইরে এত হাসাহাসি আর সংলাপবাজি হলে সমাজের গাম্ভীর্য ধসে পড়বে না? আর সবচেয়ে মারাত্মক ব্যাপার হলো, মঞ্চে ছেলে আর মেয়েরা একসাথে অভিনয় করবে? ওরে বাবা! এতে তো এই শান্ত পাড়ার বাতাসে এমন সাইক্লোন বইবে যে এলাকার মুরুব্বিরা স্ট্রোক করবেন!’

​রোমেল আমতা আমতা করে বলল, ‘ভাই, এটা তো একটা শিক্ষণীয় কমেডি নাটক...’

​রফিক দাঁত বের করে বলল, ‘ব্যানারে বড় বড় অক্ষরে লিখতে হবে—‘এখানে কোনো নাটক বা বিনোদন হচ্ছে না; এটি মূলত মানসিক চাপ কমানোর একটি বিশেষ সাইলেন্ট সাউন্ড থেরাপি চলছে!’ আর ব্যাডমিন্টন বা ফুটবল খেলার সময় পাড়া কাঁপিয়ে শট না মেরে, তুলোর বল দিয়ে নিঃশব্দে খেলতে হবে, যেন বাতাসের একটা পরমাণুও কেঁপে না ওঠে!’

​কথা শেষ করতে দিলেন না মকবুল ভাই। তিনি দুই হাত নেড়ে বললেন, ‘শিক্ষার বারোটা বাজিয়ে ছাড়বেন আপনারা! আমরা অলরেডি থানায় লিখিত দরখাস্ত দিয়ে এসেছি। এখনই যদি এই আসর বন্ধ না হয়, তবে এলাকার শান্তিতে আগুন জ্বলে উঠবে!’

​থানার কথা শুনতেই রোমেল ও তার দলের উৎসাহ একনিমেষেই কর্পূরের মতো উড়ে গেল। এর আগেই তো পাড়ার মাঠে মেয়েদের একটা প্রীতি ফুটবল টুর্নামেন্ট এই একই কায়দায় পণ্ড হয়ে গেছে। মাঠে বল গড়ানোর আগেই মকবুল ভাইয়ের দল ফতোয়া দিয়েছিল—মেয়েরা শর্টস পরে দৌড়ালে নাকি নীতি-নৈতিকতার গোলপোস্ট চিরতরে উড়ে যাবে! সেই ভয়ে সেই খেলাও মাঠে মারা গিয়েছিল।

​ঝামেলা এড়াতে রোমেলদের আর উপায় রইল না। হারমোনিয়ামের বাক্সের মুখ বন্ধ হলো, নাটকের স্ক্রিপ্টগুলো বস্তাবন্দী হয়ে আলমারির অন্ধকার কোণে আশ্রয় নিল। রোমেলসহ সবাই মন খারাপ করে যার যার বাড়িতে ফিরে গেল।

​পরদিন সকালে পাড়ার চায়ের দোকানে বসে সবাই এ নিয়ে চরম রসিকতা শুরু করল। রফিক চায়ে চুমুক দিয়ে মুচকি হেসে বলল, ‘ভাই, যেভাবে একের পর এক আনন্দ-ফুর্তি বন্ধ হচ্ছে, তাতে ভবিষ্যতে নাটক করতে গেলে মনে হয় দরজায় একটা বিশাল ব্যানার টানাতে হবে।’

​সবাই সমস্বরে জিজ্ঞেস করল, ‘কী ব্যানার?’

​রফিক দাঁত বের করে বলল, ‘ব্যানারে বড় বড় অক্ষরে লিখতে হবে—‘এখানে কোনো নাটক বা বিনোদন হচ্ছে না; এটি মূলত মানসিক চাপ কমানোর একটি বিশেষ সাইলেন্ট সাউন্ড থেরাপি চলছে!’ আর ব্যাডমিন্টন বা ফুটবল খেলার সময় পাড়া কাঁপিয়ে শট না মেরে, তুলোর বল দিয়ে নিঃশব্দে খেলতে হবে, যেন বাতাসের একটা পরমাণুও কেঁপে না ওঠে!’

​সবার হাসির রোল উঠল ঠিকই, কিন্তু সেই হাসির নিচে লুকিয়ে রইল একরাশ চাপা দীর্ঘশ্বাস। সব সহজ-সরল আনন্দের মধ্যেই যদি এভাবে ‘অশ্লীলতা’ আর ‘বিশৃঙ্খলা’র কাল্পনিক ভূত খোঁজা চলতে থাকে, তাহলে অদূর ভবিষ্যতে পাড়ার মোড়ে মোড়ে সবাই মিলে স্ট্যাচুর মতো থ মেরে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া আনন্দ করার আর কোন পথই বা খোলা থাকবে!

Also read:Breaking Good