চলতিরস

বাজেট ও লিপস্টিক

তিনি এখন জননেতা। বছর দুয়েক আগেও ছিলেন নিতান্তই একজন সাধারণ শিক্ষার্থী। এখন সভা–সেমিনারে যান, টক শো করেন, বিভিন্ন জায়গায় বক্তৃতা দেন, ফেসবুকে দেওয়া জ্বালাময়ী স্ট্যাটাস নিয়ে আলোচনাও হয়।

তিনিই পাঠিয়েছেন ছেলেটিকে।

এই মুহূর্তে সে আমার সামনে বসে আছে। মুখে উদ্বেগের ছাপ। হাতে একটা খাতা। আমার কাছে এসেছে বাজেট বুঝতে। কারণ, নেতাকে বক্তৃতা দিতে হবে। আর তার কাজ হচ্ছে সেই বক্তৃতা লিখে দেওয়া।

অর্থনীতির সবচেয়ে বড় সুবিধা হচ্ছে এর তিনটা হাত। বাম হাত, ডান হাত, আর অন দ্য আদার হ্যান্ড। ফলে আপনি চাইলে বাম দিকে যেতে পারেন, পছন্দ না হলে ডান দিকে যাবেন, তাতেও সুবিধা না হলে আরেকটা হাত তো আছেই। অর্থনীতিবিদেরা এ কারণে খুব কমই পুরোপুরি ভুল প্রমাণিত হন। তাঁরা আগে থেকেই সব দিক খোলা রেখে দেন।

আমি ছেলেটাকে বাজিয়ে দেখতে বললাম,

—নেতা তো বক্তৃতা দেবেন, বুঝলাম। কিন্তু লাইনটা কী? বাজেটের পক্ষে না বিপক্ষে?

সে একটু রহস্যময় হাসি দিল।

—বুঝেনই তো। সরকারে নাই। পক্ষে বললে কি হয়?

—তাহলে তো আরও সুবিধা। গরিব মারার বাজেট, জনবিরোধী বাজেট, আওয়াজসর্বস্ব প্রতারণার বাজেট, মধ্যবিত্ত মারার বাজেট—এসব বলে দেন।

দেখলাম কথাগুলো তার খুব একটা পছন্দ হলো না।

—সময় বদলে গেছে, ভাই। এগুলো তো পুরোনো কথা। নতুন কিছু বলেন। জেন-জিরা বুঝবে, এমন কিছু।

আমি বললাম,

—তাহলে শোনেন। লিপস্টিকের দাম কমবে। বাজেটে লিপস্টিকের কর কমানো হয়েছে। সুতরাং বাজেট ভালো হয়নি।

ছেলেটা এমনভাবে আমার দিকে তাকাল, যেন আমি হঠাৎ ঘোষণা করেছি জিডিপি এখন থেকে কেজি দরে বিক্রি হবে।

স্পষ্ট বোঝা গেল, সে বিভ্রান্ত।

তার নেতা একসময় নারীবিরোধী সমাবেশে যেতেন। ফলে লিপস্টিকের দাম কমার খবর তাঁর ভালো লাগার কথা নয়। কিন্তু আবার তাঁর নিজের ব্যক্তিগত জীবনে লিপস্টিক বিষয়ে আপত্তি নেই। বরং একটু বেশিই আগ্রহ আছে। ফলে বিষয়টি তাঁকে দ্বিধায় ফেলে দিল।

আমি বললাম,

—বিষয়টা বুঝেন নাই। অর্থনীতিতে একটা তত্ত্ব আছে, নাম লিপস্টিক ইফেক্ট।

সে সঙ্গে সঙ্গে খাতায় লিখে নিল। নতুন শব্দ পেলেই এরা লিখে নেয়। পরে বক্তৃতায় ব্যবহার করবে।

—জুলিয়েট শোর নামে একজন মার্কিন অর্থনীতিবিদ বলেছিলেন, অর্থনীতি খারাপ হলে মানুষ বড় বিলাসিতা বাদ দেয়, কিন্তু ছোট বিলাসিতা বাড়িয়ে দেয়। কারণ, দুঃখের মধ্যেও মানুষ একটু সুখ চায়। তাই অর্থনীতি খারাপ থাকলে লিপস্টিক বেশি বিক্রি হয়।

ছেলেটা এবার আগ্রহী।

আমি আরও বললাম,

—মহামন্দার সময় লিপস্টিক বেশি বিক্রি হয়েছে। ২০০১ সালে টুইন টাওয়ারে হামলার পরেও। কোভিডের সময়ও। কারণ, মানুষ তখন বিলাসিতার পেছনে গাড়ি কেনে না, ফ্ল্যাট কেনে না, কিন্তু একটা লিপস্টিক কিনে নিজেকে আয়নায় দেখে।

আমি এবার আরও উসকে দিলাম।

—দেখেন, অর্থমন্ত্রী নিজেই তো বলেছেন, প্রথম বছর পুনর্গঠনের। অর্থনীতি পুরোপুরি ঠিক হতে চার বছর লাগবে। অর্থাৎ সরকার নিজেই বলছে, সামনে কিছুদিন কষ্ট আছে।

—তাই এই কষ্টের সময়ে মানুষ যাতে অন্তত ছোটখাটো বিলাসিতা করতে পারে, সে জন্যই লিপস্টিকের কর কমানো হয়েছে।

ছেলেটা এবার পুরোপুরি বিশ্বাস করতে শুরু করেছে।

আমি বললাম,

—আপনি চাইলে বক্তৃতায় লিখতে পারেন, ‘সরকার স্বীকার করে নিয়েছে জনগণের হাতে এত টাকা থাকবে না, তাই তারা লিপস্টিক সস্তা করেছে।’

সে দ্রুত লিখে নিল।

আমি থামলাম না।

—আরও লিখতে পারেন, জিডিপি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বিনিয়োগ—এসবের জটিল হিসাবের আর প্রয়োজন হবে না। এখন নতুন সূচক হবে—ঢাকার নিউমার্কেট ও যমুনা ফিউচার পার্কে মাসে কত লিপস্টিক বিক্রি হলো।

ছেলেটা এতক্ষণে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। খাতার দুই পৃষ্ঠা ভরে গেছে। মাঝে মাঝে মাথা নাড়ছে। বাড়তি পাওয়ার আশায় বলল,

—আরও কিছু বলেন।

—তাহলে শোনেন। বাজেটে এই যে সৃজনশীল অর্থনীতির নামে গিটার, পিয়ানো আর ভায়োলিনের কর কমানো হয়েছে, এটাও কিন্তু ভালো লক্ষণ না।

ছেলেটা নতুন করে বিভ্রান্ত।

আমি ব্যাখ্যা করলাম।

—এটাকে বলে ট্রিটোনমিকস। অর্থনীতি যখন টালমাটাল থাকে, তখন মানুষ শুধু লিপস্টিক না; কনসার্ট, ভ্রমণ, ছোটখাটো আনন্দ, স্মরণীয় অভিজ্ঞতা—এসবের পেছনেও বেশি খরচ করে।

—মানে?

—মানে হলো, মানুষ যখন ফ্ল্যাট কিনতে পারে না, তখন কনসার্টের টিকিট কেনে। গাড়ি কিনতে পারে না, তখন কফি খায়। বিদেশে পড়তে যেতে পারে না, তখন বন্ধুদের ছোট ছোট বিষয়ে উৎসব করে।

ছেলেটা লিখে নিল।

—জেন-জেডরা একে বলে ‘লিটল ট্রিট কালচার’। অর্থনীতি সংকটে, চাকরি নাই, ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত—তাই নিজেকে শান্ত রাখতে ৮০০ টাকার কফি, ৩ হাজার টাকার কনসার্ট টিকিট আর ৫ হাজার টাকার হেডফোন কিনে ফেলে।

—ওহ্‌।

—এই জন্যই তো দেখেন, কোভিডের পর বিশ্বজুড়ে অর্থনীতি বিপদে, ইউক্রেন যুদ্ধ চলছে, মূল্যস্ফীতি বাড়ছে; কিন্তু টেলর সুইফটের কনসার্টে মানুষ এমন ভিড় করেছে, যেন সেখানে বিনা মূল্যে জিডিপি বিতরণ করা হচ্ছে।

ছেলেটা এবার মুগ্ধ।

আমি আরও বললাম,

—আরেকটা সূচক আছে। এটা লিখতে পারবেন কি না জানি না।

সে বুক ফুলিয়ে বলল,

—আমার নেতার কোনো রাখঢাক নেই। সবই বলতে পারে। আপনি বলেন।

আমি একটু গলা নামালাম।

—মেনস আন্ডারওয়্যার ইনডেক্স।

ছেলেটা কলম থামিয়ে তাকিয়ে রইল।

—কি ইনডেক্স? এটা আবার কি?

—ধারণাটা হলো, মন্দার সময় পুরুষেরা অন্তর্বাস কেনা পিছিয়ে দেয়। শার্ট পুরোনো হলে অফিসে লোকে দেখবে। জুতা ছিঁড়লে লোকে দেখবে। কিন্তু এটা তো অন্য কেউ দেখে না।

ছেলেটা মাথা নাড়ল।

—তাই অর্থনীতি খারাপ হলে মানুষ ভাবে, আরেক মাস চলুক। তারপর আরেক মাস। তারপর আরেক মাস।

—তারপর?

—তারপর যখন অর্থনীতি ভালো হয়, মানুষ নতুন করে কিনতে শুরু করে। ফলে বিক্রি বাড়ে।

ছেলেটা এবার এত জোরে লিখছে।

আমি বললাম,

—সুতরাং বাজেট ভালো না মন্দ, সেটা বুঝতে জিডিপি, রাজস্ব, প্রবৃদ্ধি—এসব দেখতেই হবে এমন কোনো কথা নেই।

আমি একটু থামলাম। তারপর বললাম,

—তবে একটা সুখবর আছে।

—কী?

—অর্থমন্ত্রী সাবানের কর বাড়াননি। সুতরাং হোক পুরোনো, ধুয়ে নিলেই তো হলো।

ছেলেটা খাতা বন্ধ করল।

মুখে তৃপ্তির হাসি।

বের হওয়ার সময় বলল,

—ভাই, একটা কথা?

—বলেন।

—এই লিপস্টিক ইফেক্ট আর যা যা বললেন, সব সত্যি তো?

আমি বললাম,

—অর্থনীতিতে সত্যি–মিথ্যা বলে কিছু নেই। বাম হাত আছে, ডান হাত আছে, আর আরেকটি হাত আছে। আপনার যেটা দরকার, সেটাই নেবেন।