‘সজল ভাই হাসলে চোখ ৬৯ পারসেন্ট বন্ধ হয়ে যায়।’
‘তাই নাকি? খেয়াল করি নাই তো।’
‘সমস্যা হলো, একই সঙ্গে ওনার অন্য চোখও ৩১ পারসেন্ট বন্ধ হয়ে যায়।’
‘বাহ! দুই চোখ মিলে ১০০ পারসেন্ট! সরকারি সিস্টেম—হিসাব বরাবর।’
নতুন বসের সঙ্গে প্রথম মিটিং। ওয়েট করতে করতে মিটিংরুম হয়ে গেছে ওয়েটিংরুম। আমাদের কোম্পানির নাম ‘স্মাইল ডেভেলপার অ্যান্ড হাউজিং’। অন্যের জমি, বিল্ডিং ইত্যাদি ডেভেলপ করি। শুধু নিজের ক্যারিয়ারের ডেভেলপ কমই হচ্ছে। আর বেশির ভাগ এমপ্লয়িই থাকি ভাড়া বাসায়।
‘ধুর! বসই যদি প্রথম দিন এত লেট করেন…।’ শারমিন কিছুটা বিরক্ত।
‘আপনি কাজ করেন সেলসে। ক্লায়েন্টের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে পারলে বসের জন্য পারবেন না?’ বলতে বলতে মেহবুব ভাই পুরো মিটিংরুমে চোখ বুলিয়ে নেন, ‘আইটির ভাইটিও তো এখনো আসেনি।’
‘আইটির ভাইটি’ হলেন সজল হাসান। আমাদের আইটি ইনচার্জ। নামে হাসান হলেও আমরা কখনো তাকে হাসতে দেখিনি।
গ্রাফিকস ডিজাইনার রিয়াদ বললেন, ‘আচ্ছা, সজল ভাইকে যদি এই অফিসের কেউ হাসতে না-ই দেখে, তাহলে হাসলে যে তার দুই চোখ ১০০ পারসেন্ট বন্ধ হয়ে যায়—এই তথ্য কোথায় পেলেন?’
রুহুল বললেন, ‘কেউ ভুল করে প্রেমে পড়ে, ভুল করে বসের ছবিতে হা হা রিঅ্যাক্ট দেয়। সজল ভাই ভুল করে একবার হেসে ফেলেছিলেন।’
‘একবারই? তা–ও ভুল করে?’ আমি কিছুটা অবাক।
‘ইতিহাস তা-ই বলে। বিয়ের দিন। ক্যামেরাম্যানের অনুরোধে…।’ এটুকু বলেই রুহুল থামলেন।
অ্যাকাউন্টস অফিসার রুহুল কুদ্দুস। এমন এক্সপ্রেশন দিলেন, যেন হিন্দি সিরিয়ালের নায়িকা পাঁচতলা থেকে নিচে পড়ছে। পড়ছে তো পড়ছেই…। মাঝপথে দুবার বিজ্ঞাপন, তিনবার সাইড ক্যারেক্টারগুলোর ক্লোজআপ শট, পাঁচবার ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক—ধ্রাম…ডুম…চিউস…ডুডুডু…ঢুডুস! নিচে দাঁড়িয়ে নায়ক কনফিউজড—পতনরত নায়িকাকে এখন ধরবে নাকি পরের এপিসোডে!
তখনই মিটিংরুমে ঢুকলেন সজল ভাই। যথাযথ গাম্ভীর্য বজায় রেখে চেয়ারে বসলেন। আমাদের সবার চোখ সিরিয়ালের ক্যামেরার মতো ডানে-বাঁয়ে ‘প্যান’ করে স্থির হলো সজল ভাইয়ের মুখে। তার চোখ সিলিংয়ে।
‘কিসের এত দুঃখ তোমার, সারাক্ষণ বসে বসে ভাবছ…?’ বলতে গিয়েও নিজেকে সামলে নিলাম, ‘আচ্ছা সজল ভাই, আপনি হাসেন না কেন?’
ধ্যানাবস্থা থেকে সজল ভাইয়ের চোখ ‘প্যানাবস্থায়’ রূপ নিল। আমার দিকে লুক দিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, ‘জনাব, দুই দিনের দুনিয়ায় হেসেখেলে পার করতে আসিনি।’
এইচআর বিভাগের কবির বললেন, ‘তাহলে কী করতে এসেছেন?’
‘মাসে একবার ইএমআই দিতে আর সপ্তাহে একবার বউয়ের ঝাড়ি খেতে!’
উত্তর শোনার পর রুমের তিনজন বিবাহিত মানুষ—আলমগীর, রাজু ও বাবলু—স্লো মোশনে মাথা নিচু করে হাসল।
বস এখনো আসেননি। এই ফাঁকে সজল ভাইকে নিয়ে লোকমুখে প্রচলিত কিছু তথ্য জানিয়ে রাখি।
জন্মের সময় নাকি তিনি কাঁদেননি। ডাক্তার বলেছিলেন, বাচ্চা ঠিকঠাক আছে। শুধু পৃথিবীকে সিরিয়াসলি নিয়েছে।
তিনি নাকি ব্রাশও করেন মুখ বন্ধ রেখে। টুথব্রাশই একমাত্র জিনিস—সজল ভাইয়ের সবগুলো দাঁত দেখার সৌভাগ্য হয়েছে।
পাসপোর্ট অফিস থেকে একবার সজল ভাইকে ফোন দিয়ে বলেছিল—স্যার, ছবিটা বদলানো দরকার। দেখে মনে হচ্ছে আপনাকে দেশছাড়া করা হচ্ছে।
সজল ভাই এতটাই সিরিয়াস যে, তার ফেসবুকে ‘Haha’ রিঅ্যাক্ট অপশনটাই কাজ করে না। চাপ দিলেই অটোমেটিক ‘Angry’ হয়ে যায়!
তার ফোনের Face Unlock করার সময় নাকি ভয়েস মেসেজ আসে—একটু হাসুন, তারপর আবার চেষ্টা করুন।
শোনা কথা, সজল ভাই নাকি স্ট্যান্ডআপ কমেডির রিলসও দেখেন মিউট করে।
যাহোক, আমি বললাম, ‘ভাই, অফিসে তো একটু হাসি-খুশি থাকা দরকার।’
‘কেন?’ সজল ভাই নীরস কণ্ঠে বললেন, ‘আমার জয়েনিং লেটারে তো এমন কোনো নিয়মের কথা উল্লেখ ছিল না।’
ঠিক তখনই পিয়ন এসে বলল, ‘বস আইতাছেন।’
হাসাহাসি মুহূর্তের ভাবভঙ্গি বাদ দিয়ে আমরা সিরিয়াস হলাম। বস মিটিংরুমে ঢুকলেন। তিনি চেয়ারম্যান স্যারের আপন শ্যালিকা। সুন্দরী ও ব্যাচেলর।
‘আমি মারিয়া জামান। আপনারা কেমন আছেন?’ বলেই একটু পজ নেন, ‘একি, সবাই এত সিরিয়াস মুডে কেন?’
কেউ কিছু বলার আগেই সজল ভাই হাসতে হাসতে বলেন, ‘না না ম্যাম, আমরা সবাই খুবই রসিক। আর আপনাকে বস হিসেবে পেয়ে আমরা ব্যাপক আনন্দিত…। হে হে হে…’
আমরা লেডি বসের বদলে সজল ভাইয়ের ফ্রেঞ্চকাট দাড়িযুক্ত মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। অবাক বিস্ময়ে আবিষ্কার করলাম, সজল ভাই হাসতে জানেন এবং তার দুই চোখ ১০০ পারসেন্ট বন্ধও হচ্ছে না। অফিসে প্রথমবার সজল ভাইয়ের দুর্লভ হাসি দেখে খুশিতে শারমিন হাততালি দিয়ে ফেলল।
লেডি বস বিব্রত! সেদিকে আমার খেয়াল নেই। সজল ভাইয়ের দাঁতগুলো দেখে বুঝলাম, তিনি কেন হিমু চরিত্রের ভক্ত। আর অন্য সময় তাঁর না হাসার পেছনে এটাও একটা কারণ হতে পারে।