
নিরো ছিলেন পঞ্চম রোমান সম্রাট। তাঁর মৃত্যুর পর দুই হাজার বছর কেটে গেলেও এখনো তাঁর নাম শুনলে এক কিংবদন্তির কথা মনে পড়ে—তাঁর রাজধানী রোম আগুনে পুড়ছে আর তিনি বাঁশি বাজাচ্ছেন। এই কিংবদন্তির সত্যতা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ আছে ঠিকই, তবে সত্যিকার অর্থে তিনি ছিলেন এক পাগলাটে স্বভাবের সম্রাট।
নিরোর জন্ম ৩৭ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ ডিসেম্বর রোম সাম্রাজের অ্যান্টিয়ামে। তাঁর বয়স যখন দুই বছর, তখন তাঁর বাবা মারা যান। নিরোর মা এগ্রিপিনা ছিলেন রোমান সাম্রাজ্যের প্রথম সম্রাট অগাস্টাসের বংশধর। তৃতীয় রোমান সম্রাট ক্যালিগুলা ছিলেন এগ্রিপিনার ভাই। ক্যালিগুলা তাঁর পিতামহ টিবেরিয়াসকে হত্যা করে ক্ষমতায় আসেন। ক্যালিগুলাকে উৎখাতের ষড়যন্ত্রের অভিযোগে তিনি এগ্রিপিনার সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে তাঁকে একটি দ্বীপে নির্বাসন দেন। ৪১ খ্রিষ্টাব্দে ক্যালিগুলা নিহত হলে প্রভাবশালী প্রিটোরিয়ান বাহিনী সম্রাট হিসেবে এগ্রিপিনার সৎ চাচা ক্লডিয়াসকে সম্রাট হিসেবে ঘোষণা করে। সম্রাট ক্লডিয়াস ছিলেন উদার ও দয়ালু।
তিনি এগ্রিপিনাকে নির্বাসন থেকে ফিরিয়ে আনেন। এগ্রিপিনা সম্রাট ক্লডিয়াসের রাজসভার এক উপদেষ্টাকে বিয়ে করেন। পরে কৌশলে তাঁকে হত্যা করে তাঁর সব সম্পত্তির মালিক হন। এরপর তিনি সম্রাট ক্লডিয়াসের সঙ্গে প্রণয়ের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। ৪৮ খ্রিষ্টাব্দে ক্লডিয়াস তাঁর স্ত্রীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর এগ্রিপিনাকে বিয়ে করেন। বিয়ের পর এগ্রিপিনার পরামর্শে সম্রাট ক্লডিয়াস নিরোকে দত্তক নেন এবং তাঁর একমাত্র কন্যা ক্লডিয়া অক্টাভিয়ার সঙ্গে নিরোর বিয়ে দেন। ক্লডিয়াস তাঁর পুত্র ব্রিটানিকাসের পাশাপাশি নিরোকেও সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারী হিসেবে ঘোষণা করেন।
৫৪ খ্রিষ্টাব্দে ক্লডিয়াস হঠাৎ করেই মারা যান। ধারণা করা হয়, খাবারে বিষ মিশিয়ে তাঁকে হত্যা করেন এগ্রিপিনা। ক্লডিয়াসের পুত্র ব্রিটানিকাসের পরিবর্তে নিরোকে সম্রাট হিসেবে ঘোষণা করতে তিনি প্রিটোরিয়ান বাহিনীকে রাজি করান। মায়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী ১৭ বছরের তরুণ নিরো রোমান সাম্রাজ্যের সিংহাসনে বসেন। সম্রাট নিরোর প্রধান উপদেষ্টা হন এগ্রিপিনা। মূলত ছেলের মাধ্যমে এগ্রিপিনা নিজেই সাম্রাজ্য শাসন করতে চেয়েছিলেন।
৫৯ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত নিরো উদারতা ও ক্ষমাশীলতার সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে সাম্রাজ্য শাসন করেন। এ সময় তিনি উপদেষ্টা পরিষদের স্বাধীনতা বৃদ্ধি, রক্তক্ষয়ী গ্ল্যাডিয়েটর লড়াই বন্ধ, মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে আনা, কর হ্রাস করাসহ প্রভুদের বিরুদ্ধে ক্রীতদাসদের অভিযোগ করার অনুমতি দেন। এমনকি যাঁরা তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছিলেন, তাঁদেরও ক্ষমা করেন তিনি। খেলাধুলা ও বিনোদনভিত্তিক অনুষ্ঠান আয়োজনসহ নানা কারণে রোমানদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন তিনি। রোমে পাঁচ বছর পরপর ক্রীড়ানুষ্ঠান আয়োজনের নির্দেশও দেন নিরো।
পপেয়া সাবিনা নামের এক পরস্ত্রীর প্রতি অনুরক্ত হওয়া এবং তাঁকে বিয়ে করতে চাওয়ার ঘটনায় মায়ের বিরোধিতার মুখোমুখি হন নিরো। পরবর্তী সময়ে দার্শনিক সেনেকার পরামর্শে মায়ের ছায়া থেকে বেরিয়ে আসেন নিরো। সেনেকা নিরোকে স্বাধীনভাবে সাম্রাজ্য পরিচালনা করতে উৎসাহিত করেন।
ছেলেকে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে দেখে এগ্রিপিনা নিরোকে হত্যার ষড়যন্ত্র শুরু করেন। নিরো মায়ের ষড়যন্ত্র বুঝতে পেরে তাঁকে প্রথমে জাহাজ ডুবিয়ে হত্যা করার পরিকল্পনা করেন। কিন্তু সে যাত্রায় বেঁচে গেলে তিনি সরাসরি তাঁর বাহিনীকে মাতৃহত্যার আদেশ দেন। ৫৯ খ্রিষ্টাব্দে এগ্রিপিনা নিরোর অনুগত বাহিনীর হাতে নিহত হন।
৬৪ খ্রিষ্টাব্দে রোম নগরে আগুন লাগে। এক সপ্তাহ ধরে চলা অগ্নিকাণ্ডে নগরের ৭০ শতাংশ এলাকা ধ্বংস হয় এবং অর্ধেক জনসংখ্যা গৃহহীন হয়ে পড়ে। নিরো তখন রোম থেকে ৫৬ কিলোমিটার দূরে অ্যান্টিয়ামে ছিলেন। ইতিহাসবিদদের মতে, আগুন লাগার খবরকে নিরো গুজব বলে এড়িয়ে যান। তখন তিনি সম্ভবত কোনো বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছিলেন।
এই অগ্নিকাণ্ডের জন্য নিরো রোমের খ্রিষ্টানদের দায়ী করেন। খ্রিষ্টধর্ম তখন মূলত অস্পষ্ট ধর্মীয় সম্প্রদায় ছিল এবং এই ধর্মের অনুসারীদের সংখ্যাও ছিল কম। রোমের অগ্নিকাণ্ডের পর খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের ওপর নেমে আসে ভয়ংকর অত্যাচার। নিরোর আদেশে আগুনে পুড়িয়ে, ক্রুশবিদ্ধ করে ও বন্য প্রাণী লেলিয়ে দিয়ে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয় অনেক খ্রিষ্টানকে। খ্রিষ্টানদের শাস্তি দেওয়ার সময় ঘটা করে উৎসব উদ্যাপনও করেন তিনি।
অগ্নিকাণ্ডের পর কোষাগারের পাশাপাশি নিজের তহবিল থেকে ত্রাণ দিয়েছিলেন নিরো। এরপর তিনি রোম নগরকে গ্রিক শৈলীতে পুনর্গঠন করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। দুই পাহাড়ের মাঝে ‘গোল্ডেন হাউস’ নামের একটি সুবিশাল প্রাসাদ এবং এই প্রাসাদের মাঝখানে স্থাপনের জন্য নিজের ১০০ ফুট উচ্চতার একটি মূর্তি তৈরির কাজ শুরু করেন। এসব কাজ করতে গিয়ে সাম্রাজ্যের কোষাগার নিঃশেষ করে ফেলেন নিরো। ফলে তাঁর স্বপ্নের প্রাসাদ তৈরির কাজ শেষ করতে ব্যর্থ হন। নিরোর উপদেষ্টারাও প্রাসাদ নির্মাণ এবং রোম নগরের ব্যাপক পুনর্গঠনের বিরুদ্ধে ছিলেন। কোনো কোনো ইতিহাসবিদের মতে, রোম নগরের অগ্নিকাণ্ডের ক্ষেত্রে সম্রাট নিরোর হাত ছিল। তাঁদের মতে, নিরো রোম নগরটি নিজের পছন্দমতো তৈরি করার জন্য আগুন লাগিয়েছিলেন।
রোম নগরকে নিজের পছন্দমতো গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়ে নিরো রাজকার্য ছেড়ে দিয়ে অভিনয় ও গানবাজনা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এ সময় তিনি রোমের সিংহাসন পরিত্যাগ করার চিন্তা করেছিলেন বলে জানা যায়। ৬৬ খ্রিষ্টাব্দের শেষের দিকে নিরো গ্রিসে একটি দীর্ঘ সফরে বের হন। ১৫ মাসের এই সফরে তিনি সাধুবেশে খালি পায়ে গ্রিসের রাস্তায় রাস্তায় হেঁটে বেড়ান। গ্রিক সংস্কৃতির প্রতি উৎসাহের কারণে তিনি বেশ কয়েকটি গ্রিক নগর তাঁর সাম্রাজ্য থেকে মুক্ত করেন। ৬৮ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে তিনি রোমে ফিরে আসেন।
সম্রাট নিরোর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, তিনি নিজেকে একজন শিল্পী হিসেবে দাবি করতেন। তিনি মঞ্চে অভিনয় করতেন, বীণাজাতীয় একটি বাদ্যযন্ত্র বাজাতেন, গান গাইতেন ও কবিতা লিখতেন। বিভিন্ন খেলাধুলায়ও তিনি ছিলেন সমান পারদর্শী। তাঁর উপদেষ্টারা মনে করতেন, এগুলো খুবই লজ্জার ও মানহানিকর কাজ।
নিরোর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের শাখা–প্রশাখা বিস্তৃত হতে থাকে। তাঁর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে তিনি দার্শনিক সেনেকাসহ ২৩ উপদেষ্টাকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য করেন। ৬৮ খ্রিষ্টাব্দে নিরোর অধীনস্থ এক রাজা নিরোর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। এই সুযোগে নিরোর উপদেষ্টামণ্ডলী ও প্রিটোরিয়ান বাহিনী নিরোকে জনগণের শত্রু হিসেবে ঘোষণা করে। এর অর্থ হলো, তাঁকে যেখানে পাওয়া যাবে, সেখানেই হত্যা করা হবে। নিরো শহরতলির একটি জায়গায় পালিয়ে যান এবং সেখানে একটি ভিলায় আশ্রয় নেন। ৬৮ খ্রিষ্টাব্দের ৯ জুন রক্ষীরা তাকে খুঁজে পাওয়ার আগেই তিনি আত্মহত্যা করেন। তখন নিরোর বয়স ছিল মাত্র ৩০ বছর।