টা ট কা র স

যে গল্প Ai লিখতে পারে না

স্যার, আমি মানুষ, আমার তো লোডশেডিং ফেস করতে হয়, যানজট ঠেলতে হয়, চা খেতে হয়, বাথরুমে যেতে হয়। এআই সাহেবের তো এসব লাগে না।

আমাদের অফিসে নতুন একজন জয়েন করেছেন। নাম এআই সাহেব। কোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি হয়নি, সিভি লাগেনি, ইন্টারভিউও লাগেনি। হঠাৎ একদিন বস এসে বললেন, ‘ইনি আজ থেকে আমাদের সঙ্গেই কাজ করবেন। ইনি কখনো ঘুমান না, ছুটি চান না, বেতনও চান না।’

শুনে আমরা খুশিই হয়েছিলাম। যাক, কাজের একটা লোক পাওয়া গেল। কিন্তু তিন দিনের মাথায় বুঝলাম, লোকটা কাজের না, আমাদের কাজ খাওয়ার লোক।

আগে অফিসে একটা রিপোর্ট লিখতে আমার তিন ঘণ্টা লাগত। এখন বস বলে, ‘ওটা এআই সাহেবকে দাও, তিন সেকেন্ডে করে দেবে।’ আমি তিন ঘণ্টা ধরে যা লিখতাম, নতুন সাহেব তিন সেকেন্ডে তার চেয়ে ভালো লিখে দেয়, সঙ্গে আবার ইংরেজি, বাংলা, ভুল-শুদ্ধ সব ভার্সন। বস তো মহাখুশি। আমাকে ডেকে বলে, ‘দেখেছ, শেখো ওর কাছ থেকে, কীভাবে কাজ করতে হয়।’

আমি মনে মনে বলি, স্যার, আমি মানুষ, আমার তো লোডশেডিং ফেস করতে হয়, যানজট ঠেলতে হয়, চা খেতে হয়, বাথরুমে যেতে হয়। এআই সাহেবের তো এসব লাগে না।

অফিসের ক্যানটিনের মামাও এখন টেনশনে। আগে আমরা ক্যানটিনে বসে বলতাম, ‘মামা, আজ কী রান্না করলা?’ এখন জুনিয়ররা মোবাইল খুলে এআই সাহেবকে জিজ্ঞেস করে, ‘আজ দুপুরে কী খেলে ভালো হয়, স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের তালিকা দাও।’ এআই সাহেব সঙ্গে সঙ্গে ১০টা আইটেমের তালিকা দিয়ে দেয়, ক্যালরিসহ। মামা বলে, ‘সাহেব, আমার ব্যবসা তো আপনিই খেয়ে দিলেন।’

অফিস শেষে বাসায় ফিরেও শান্তি নেই। ভেবেছিলাম বাসায় গিয়ে একটু হাঁপ ছাড়ব। কিন্তু না, এআই সাহেব বাসায়ও ঢুকে গেছে।

বাসায় ঢুকতেই স্ত্রী বলল, ‘শোনো, আজ ছেলের বিজ্ঞান প্রজেক্ট আছে, সৌরজগৎ বানাতে হবে।’ আমি বললাম, ‘দাও, আমি কার্ডবোর্ড দিয়ে বানিয়ে দিচ্ছি।’ স্ত্রী বলল, ‘লাগবে না, আমি এআই সাহেবকে জিজ্ঞেস করেছি, সে সুন্দর করে লিখে দিয়েছে, কীভাবে বানাতে হয়, আর ছবিও এঁকে দিয়েছে। তুমি বরং বাজার থেকে আঠা নিয়ে আসো।’

আমি আঠা আনতে গেলাম। আমার কাজ এখন আঠা আনা!

রাতে খাওয়ার টেবিলে মা বলল, ‘আজকাল প্রেশারটা বাড়ছে।’ আমি বললাম, ‘ডাক্তারের কাছে চলো।’ ছোট বোন পাশ থেকে বলল, ‘আরে ভাইয়া, এআই সাহেবকে জিজ্ঞেস করেছি। সে বলেছে লবণ কম খেতে, হাঁটতে।’ আমি বললাম, ‘বাহ, তাহলে তো ডাক্তারেরও দরকার নেই।’ বোন বলে, ‘ডাক্তারের দরকার আছে, তবে প্রাথমিক ধারণা তো পাওয়া গেল।’

এখন আমাদের বাসায় ডাক্তার, মাস্টার, বাবুর্চি সবই একজন— এআই সাহেব।

সবচেয়ে বিপদ হয়েছে বন্ধু-বান্ধবের আড্ডায়। আগে বন্ধুরা মিলে আড্ডা দিলে তর্ক হতো— ‘মেসি সেরা না রোনালদো সেরা?’ ‘বিরিয়ানিতে আলু থাকা উচিত কি উচিত না?’ এখন আর তর্ক হয় না। একজন মোবাইল বের করে বলে, ‘দাঁড়া, এআই সাহেবকে জিজ্ঞেস করি, এর যৌক্তিক উত্তর কী?’ এআই সাহেব দুই পক্ষের যুক্তি দিয়ে এমন একটা নিরপেক্ষ উত্তর দেয় যে তর্কটাই মরে যায়। আড্ডার মজাটাই শেষ!

আপনার চাকরি থাকবে, তবে আপনার কাজের ধরন বদলে যাবে। আপনাকে আরও ক্রিয়েটিভ হতে হবে, আপনাকে প্রম্পট দেওয়া শিখতে হবে। ভয় পাবেন না, এআই মানুষকে রিপ্লেস করবে না। এআই ব্যবহার করা মানুষ, এআই ব্যবহার না করা মানুষকে রিপ্লেস করবে।

গত সপ্তাহে একটা বিয়ের দাওয়াত পেয়েছিলাম। বন্ধু বলল, ‘দোস্ত, একটা সুন্দর শুভেচ্ছা বক্তব্য লিখে দে।’ আমি লিখতে যাব, তখনই মনে হলো, আমি কেন লিখব? এআই সাহেবকে বললেই তো হয়। বললাম, ‘একটা আবেগঘন বিয়ের শুভেচ্ছা লিখে দাও।’ সে তিনটা অপশন দিয়ে দিল—আবেগঘন, মজার এবং কবিতা আকারে। আমি কবিতাটা কপি করে বন্ধুকে পাঠিয়ে দিলাম। বন্ধু বলল, ‘বাহ, তুই তো কবি হয়ে গেছিস!’ আমি লজ্জায় কিছু বললাম না। কবি আমি নই, কবি তো এআই সাহেব।

এখন সমস্যা হলো আত্মসম্মান নিয়ে। আগে নিজেকে একটু চালাক মনে করতাম। এখন মনে হয়, আমি যা জানি, এআই সাহেব তার চেয়ে বেশি জানে। আমি যা পারি, সে তার চেয়ে ভালো পারে। তাহলে আমি কী পারি?

একদিন সাহস করে এআই সাহেবকেই জিজ্ঞেস করলাম, ‘আচ্ছা, আমার চাকরি কি থাকবে?’

সে খুব সুন্দর করে উত্তর দিল, আপনার চাকরি থাকবে, তবে আপনার কাজের ধরন বদলে যাবে। আপনাকে আরও ক্রিয়েটিভ হতে হবে, আপনাকে প্রম্পট দেওয়া শিখতে হবে। ভয় পাবেন না, এআই মানুষকে রিপ্লেস করবে না। এআই ব্যবহার করা মানুষ, এআই ব্যবহার না করা মানুষকে রিপ্লেস করবে।

উত্তরটা পড়ে মনে হলো, সান্ত্বনাটাও যেন বসের মতো দিল। মানে, চাকরি থাকবে, কিন্তু আমি এখন এআই সাহেবের অ্যাসিস্ট্যান্ট। আগে আমি ছিলাম বসের অ্যাসিস্ট্যান্ট, এখন আমি অ্যাসিস্ট্যান্টের অ্যাসিস্ট্যান্ট!

তবু একটা জায়গায় আমি জিতি।

গতকাল রাতে কারেন্ট চলে গিয়েছিল। ওয়াই–ফাই নেই, মোবাইলে চার্জ নেই। এআই সাহেব অফলাইন। পুরো বাসা অন্ধকার। আমার ছেলে এসে বলল, ‘বাবা, ভূতের গল্প বলো।’

আমি তখন মোমবাতি জ্বালিয়ে যে ভূতের গল্প বললাম, সেই গল্প এআই সাহেব কোনো দিন বলতে পারবে না। কারণ, সেই গল্পে আমার ছোটবেলার গ্রামের বাড়ি ছিল, পুকুরপাড়ের তালগাছ ছিল আর ছিল আমার দাদির মুখে শোনা ভয়!

ছেলে ভয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরল। আমি বুঝলাম, এই জড়িয়ে ধরাটা এআই সাহেবকে কেউ দেবে না।

তাই এখন আমি আর এআই সাহেবকে ভয় পাই না। অফিসে সে রিপোর্ট লিখুক, বাসায় সে রেসিপি দিক, আড্ডায় সে যুক্তি দিক। কিন্তু মোমবাতির আলোয় ভূতের গল্প বলার চাকরিটা আমারই থাকবে।

Also read:Breaking Good