কমিউনিটি সেন্টারের বড় পর্দায় গতকাল তোলা হলুদের ছবি দেখছে সবাই। বর-কনে পাশাপাশি বসে আছে। দুজনের গায়ে হলুদের ড্রেস। গলায় ফুলের মালা। বন্ধুরা সোফায় বসে ছবি দেখছে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে কনে লজ্জায় মুখ ঢেকেছে।
রাফি বলল, ‘ক্রিঞ্জ!’
নাবিলা বলল, ‘পুরাই মুভি। মাথানষ্ট।’
তারপরের ছবিতে কনের দিকে তাকিয়ে বর হাসছে। কেন হাসছে, বোঝা যাচ্ছে না। কনের হাসির ভেতর কিছু ঈঙ্গিত আছে মনে হচ্ছে। বরকে গাধা টাইপ লাগছে।
সাফওয়ান বলল, ‘ভাই তো ডাউন ব্যাড!’
রাফি বলল, ‘দেখ, ভাইয়ের চোখে লাভ কম। ঘুম বেশি!’
সবাই হাসছে। বর হাসছে না। এবার একটা ভিডিও চালানো হয়েছে। সেখানে কনের কানে কানে বর কিছু একটা বলছে। কনে হাসতে হাসতে দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে সামনে ঝুঁকে এসেছে।
নাবিলা বলল, ‘কী বলছে?’
আনজান বলল, ‘বলছে, তুমি আমার জীবনের সবচেয়ে পিকিউলিয়ার ঘটনা।’
নাবিলা বলল, ‘আরে নাহ। বলছে, ক্যামেরার দিকে তাকিয়ো না। ডাবল চিন দেখা যাবে।’
রাফি হাসতে হাসতে বলল, ‘বলছে, হাসতে থাকো। ভিডিও চলছে!’
কাজি সাহেব এসেছেন। তাঁকে খুব ব্যস্ত মনে হচ্ছে। বর এগিয়ে এসে কাজি সাহেবকে সামনের চেয়ারে বসিয়েছে।
কাজি সাহেব বললেন, ‘আপনারা সবাই উপস্থিত থাকলে কাবিন লেখা শেষ করে বিয়ে পড়ানো শুরু করি। আরেকটা বিয়ে পড়াতে যাব।’
‘তা হলে আমারও একটা ছবি তুলে দাও। ফেসবুকে সেই ছবি দিয়ে ক্যাপশন লিখে দিয়ো, ‘বিয়ে পড়ানো দরকার, বিয়ে নয়। আমি কাজি হান্নান।’
ছেলে বলল, ‘কাবিন লিখতে হবে না। বিয়ে তো আজ হচ্ছে না। আজ শুধু বিয়ের ছবি তুলব।’
ঘটনা শুনে কাজি সাহেব হতভম্ব হয়ে গেলেন। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বললেন, ‘বিয়ের ছবি তুলবেন। বিয়ে করবেন না?’
ছেলে বলল, ‘আমরা দুজনই গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেছি। এখন একজন যাচ্ছি ইউএসএতে মাস্টার্স করতে। আরেকজন ইউকেতে। মাস্টার্স শেষ করে দেশে ফিরে বিয়ে করব।’
মেয়ে বলল, ‘তখন যদি হুট করে বিয়ে করতে হয়। ছবি তোলার সময় পাব না। বিয়ের ছবি তো জীবনে একবারই তুলব। বিয়ের দিন মুরব্বিরা এ রকম ছবি তোলা দেখলে মহা খেপে যাবেন। ছবি তোলার সময়ই দেবেন না। তাঁদের কাছে বিয়েটা বড় কথা। ছবি তোলার জন্য এতক্ষণ সময় দেওয়া খামোখা। তাই আগেভাগে হলুদ, মেহেদি, বিয়ে সব অনুষ্ঠানের ছবি তুলে রাখছি।’
কাজি সাহেব চারদিকে তাকালেন। ফুলের সাজ। কেক। আংটি। বিয়ের পোশাক। ফটোগ্রাফার। পুরো বিয়ের আয়োজন।
তিনি বললেন, ‘বুঝলাম। বিয়ের সব ব্যবস্থাই আছে। শুধু বিয়েটাই নেই!’
ছেলে বলল, ‘ঠিক তা–ই, আঙ্কেল।’
ফটোগ্রাফার ব্যস্ত হয়ে বললেন, ‘স্যার। এবার পারিবারিক ছবি তোলা হবে। সবাই একসঙ্গে দাঁড়ান।’
কাজি সাহেব দেখলেন, বর-কনে ছাড়া ছবি তোলার জন্য আরও আটজন দাড়িয়ে আছে। তাদের কাউকেই এই পরিবারের সঙ্গে আগে দেখেননি। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘এরা কারা?’
ছেলে বলল, ‘কমিউনিটি সেন্টারের দারোয়ান, ক্লিনার।’
কাজি সাহেব বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে গেলেন। মুখ হা করে বললেন, ‘দারোয়ান!’
মেয়ে বলল, ‘আসল আত্মীয়দের আনলে তাঁরা হাজারটা প্রশ্ন করতেন। বিরক্ত হতেন। বকা দিতেন। তাই ঝামেলা এড়াতে এদের পরিবারের সদস্য বানিয়েছি। এরা পেছনে দাঁড়িয়ে থাকবে। ছবিতে এদের ব্লার করে দেওয়া হবে। চেহারা বোঝা যাবে না।
কাজি সাহেব কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ‘তা হলে আমারও একটা ছবি তুলে দাও। ফেসবুকে সেই ছবি দিয়ে ক্যাপশন লিখে দিয়ো, ‘বিয়ে পড়ানো দরকার, বিয়ে নয়। আমি কাজি হান্নান।’
সেই ছবি ফেসবুকে আসার পর ভাইরাল হয়ে গেল। কাজি সাহেব কেন এ কথা বলেছেন, তা-ই জানতে গিয়ে ‘বিয়ে নয়, বিয়ের ছবি তোলা দরকার’-এর ঘটনা জানতে পেরেছি। সেটাই লিখেছি।