সরস রচনা

আমার অনেক লোন আমি বড় লোনলি!

আঁকা: ষুভ
আঁকা: ষুভ

এই জীবনে ভালোবেসে আমাকে কোনো মেয়ে কখনো কিচ্ছু দেয়নি।
মনে আছে, শৈশবে আমাদের পাড়ায় হুট করে পরির মতো তিনটা মেয়ে চলে এল। হাসান ভাইদের বাসার নিচতলায়। শশী-লিমি... আরেকজনের নাম মনে নেই। পাড়ায় গুঞ্জন ছিল, শশীরা নাকি সিঙ্গাপুরে থাকত। বাসার দেয়ালে টাঙানো বাংলাদেশের মানচিত্র সারা দিন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বের করার চেষ্টা করেছি—সিঙ্গাপুরটা কোথায়। শুধু দিনাজপুর-রংপুর পাই, সিঙ্গাপুর আর পাই না।
আমাদের পাড়ায় সবচেয়ে জ্ঞানী ছিলেন পাপ্পু ভাই। তাঁর কাছে জানলাম, বাংলাদেশের মানচিত্রে খুঁজলে হবে না। সিঙ্গাপুর খুঁজতে হবে বিশ্বের মানচিত্রে। মানে শশীরা বিদেশ থেকে এসেছে!
বিদেশ! তার মানে কি ইংরেজিতে কথা বলতে হবে? আমরা সমবয়সীরা জোর লাগিয়ে ইংরেজি পড়তে শুরু করে দিলাম: দি ‘পেটিয়েন্ট’ হ্যাড ডায়েড বিফোর দ্য ডাক্তার... দি ‘পেটিয়েন্ট’ হ্যাড ডায়েড...।
আমাদের ইংরেজি-বিদ্যা কতটা এগোল, সেটা হাতেনাতে পরীক্ষার সুযোগও এসে গেল। আমাদের পাড়াতেই একটা এনজিও ছিল। সেই এনজিওতে বেশ কজন বিদেশি চাকরি করতেন। বিকেলে ঘুরতে বেরোতেন। এমনই একদিন এক বিদেশিকে আমরা পথে পেয়ে গেলাম। তিনি হাঁটেন। আমরাও হাঁটি। আর গল্প করি। অবশ্যই ইংরেজিতে, হুঁহ।
যেমন তিনি আঙুল উঁচিয়ে বললেন, ‘ইজ দিস আ গ্রেভইয়ার্ড?’ আমাদের ডিকশনারিতে তখনো গ্রেভইয়ার্ড শব্দটা ঢোকেনি। কয়েকটি কবরের ওপরে বরইগাছ। তাতে বরই ধরেছে। আমরা ভাবলাম, বরইগুলোকে তিনি আঙুর ভেবেছেন। উত্তর দিলাম, ‘নো স্যার, নো গ্রেপইয়ার্ড। দিস ইজ বরইইয়ার্ড। ইউ নো বরই? টক টক, মিষ্টি মিষ্টি?’
তখন আমরা বাংলা বলতাম খুব কম। বললেও তাতে প্রচুর ইংরেজি শব্দ মেশানো থাকত। এই যেমন একদিন কনক এসে আফসোসের সুরে বলল, ‘জানিস, শশীর বাবা না খুব লোনলি।’
‘কেন?’
‘আরে, ব্যাংকে প্রচুর লোন আছে তো, তা-ই। এ জন্যই তো সিঙ্গাপুরে থাকতে পারে নাই। আগে তো ওইখানেই বিজনেস করত।’
তত দিনে আমার মধ্যে ইংরেজিতে বাতচিতের কনফিডেন্স চলে এসেছে। শুধু তা-ই নয়, পুরোপুরি ইংরেজিতে নির্ভুল একটা প্রেমপত্রও লিখে ফেললাম: Deer Shoshi, My hurt is vary week four you. I love u...
সেই চিঠি হাতে নিয়ে দুরুদুরু বুকে চললাম শশীদের বাসায়। প্রচণ্ড রোদ আর লাল পিঁপড়ার কামড় অগ্রাহ্য করে দাঁড়িয়ে থাকলাম বারান্দার সামনে। নিমগ্ন ধ্যান করলে দেবীরও দর্শন মেলে। দেবীরা বরও দেয়। শশী একসময় বারান্দায় এল। লাজুকতার আবেশ ছড়ানো কী এক চাহনি! কীভাবে লিখি? এ যে অনির্বচনীয়। ইশ্, আমি কবি হলাম না কেন!
বুকপকেট থেকে চিঠিটা বের করে ওর হাতে দেব, ঠিক সেই সময় আবিষ্কার করলাম, ওটা চিঠি না, বাজারের স্লিপ, সকালবেলা আম্মা দিয়েছিল বাজার করতে!
ঝটপট সেটা বুকপকেটে চালান করে দিয়ে, জিবে কামড় বসিয়ে হাফপ্যান্টের পকেট থেকে আসল চিঠিটা বের করলাম। ওর হাতে দেব, তার আগেই লাজুক হাতটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিল শশী নিজেই। নিতে নয়, দিতে! সেখানে একটা ভাঁজ করা চিঠি! শশী আমার দিকে সরাসরি তাকাতেও পারছে না লজ্জায়। মুখটা কী রকম এক পাশে কাত করে রেখেছে। আহা, সে কী দৃশ্য! ইশ্, আমি কবি হলাম না কেন!
আমার বুকে কেউ হাতুড়ি পেটাচ্ছে। দড়াম, দড়াম। জীবনে প্রথম প্রেমপত্র হাতে নিচ্ছি। সেটাও দেবীর মতো দেখতে একটা মেয়ের কাছ থেকে!
আমি জ্ঞান হারিয়ে পড়েই যেতাম। শশীই বাঁচিয়ে দিল। বলল, পরিষ্কার বাংলাতেই বলল, ‘কিছু মনে কোরো না রাজীব, তোমাকে চিঠিটা দিলাম এ জন্য। আচ্ছা? আর ইয়ে...চিঠিটা একটু হাসান ভাইয়ের কাছে পৌঁছে দিয়ো, কেমন?’ আশপাশে কোথাও মেঝেতে কাচের গ্লাস পড়ে ঝনঝন একটা শব্দ হলো। কিংবা কে জানে, শব্দটা আমার বুকের ভেতর থেকেই এসেছে কি না!
ভালোবেসে সত্যিই কেউ আমাকে কোনো দিনই কিছু দেয়নি।
এমনকি ফেসবুকে কোনো মেয়ের কাছ থেকে একটা ফ্রেন্ড রিকোয়েস্টও পেলাম না! ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট? কপালের কপাল, একটা ‘পোক’ও দেয়নি।
সেদিন ফেসবুক খুলতেই নোটিফিকেশন!
রবীন্দ্র-ঘরানার হলে ‘পাইলাম, আমি ইহাকে পাইলাম বলে’ বলে একটা লাইন আওড়াতাম। ওমর সানী হলে ‘চাকভুম চাকভুম’ বলে নাচ শুরু করতাম। পদার্থবিজ্ঞানপ্রেমী হলে ‘ইউরেকা’ চিক্কুর দিয়ে জন্মদিনের পোশাকে...ইয়াল্লা ছিঃ!
পেয়েছি! পেয়েছি! অবশেষে একটা মেয়ে আমাকে কিছু একটা দিল! হোক না সেটা ক্যান্ডি ক্র্যাশ গেমের রিকোয়েস্ট! আবেগে আমার চোখে জল পর্যন্ত চলে এল। চোখের সামনে জলজ্যান্ত নোটিফিকেশন: সায়মা শামা সেন্ট ইউ আ...। তবু বিশ্বাস হয় না। শেষে মেয়েটাকে ইনবক্সে জিজ্ঞেসই করে বসলাম, ‘আচ্ছা, আপনি কি আমাকে ক্যান্ডি ক্র্যাশের...?’
উত্তর এল: উপস্ ভাইয়া! সরি, ভুল করে চলে গেছে। আপনাকে খামোখা ইরিটেট করলাম। সরি ভাইয়া, এমন ভুল আর হবে না। রিয়েলি ভেরি সরি...।