আমার এইডস জয়ের গল্প

বিশ্ব এইডস দিবস ছিল গত সোমবার। পড়ুন এইডসের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে যাওয়া এক সাহসী নারীর গল্প। 

অলংকরণ: নিয়াজ চৌধুরী
অলংকরণ: নিয়াজ চৌধুরী

ঢাকার খুব সাধারণ নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম আমার। চতুর্থ সন্তান, তার ওপর মেয়ে। আমার জন্ম, বেড়ে ওঠা আর পড়ালেখা কতটা নিরানন্দের ছিল, সেটা কাউকে বলে বোঝাতে পারি না। পরিবারের সবার মধ্যেই আমাকে নিয়ে একটা দুশ্চিন্তা। প্রতিনিয়ত সেটা প্রকাশ পাচ্ছিল। কখনো স্পষ্ট শব্দে, কখনো বা আচরণে। যার দিকেই তাকাই, মনে হয় আমাকে যেকোনোভাবে ঘাড় থেকে নামানোর চেষ্টায় আছে তারা।
আমার খুব পড়ালেখার শখ ছিল। এত প্রতিকূলতার মধ্যেও এসএসসি পরীক্ষা দিলাম। আশা ছিল পাস করে যাব। একবার কোনোভাবে কলেজে ভর্তি হয়ে গেলে অন্তত এইচএসসি পর্যন্ত আটকায় কে। কিন্তু আটকে গেলাম। পরীক্ষার ফল প্রকাশের আগেই মালয়েশিয়াপ্রবাসী এক ছেলের বিয়ের প্রস্তাব এল।
আমি তখন ১৬ বছর বয়সী কিশোরী মাত্র। আর প্রবাসীর বয়স ৩৫। সেসবের দিকে কারও খেয়াল নেই। ধনী পাত্রের কাছে মেয়ের বিয়ে মানে যে নিজেদেরও কিছুটা গতি হওয়া, সে হিসাবেই পরিবারের সবাই ব্যস্ত।
বিয়ে আর সংসার
২০০৩ সালের ১০ এপ্রিল তাড়াহুড়ো করেই আমার বিয়েটা হয়ে গেল। প্রথম খুব অসহ্য লাগত সবকিছু। তারপর ধীরে ধীরে মেনে নিলাম ভাগ্যকে। আর তো কোনো উপায়ও ছিল না। বিয়ের দুই মাসের মাথায় আমার স্বামী মাহবুবুর রহমান (ছদ্মনাম) আবার চলে গেল মালয়েশিয়া। আমি দেশে অপেক্ষা করতে থাকলাম।
এভাবে কেটে গেল দুই বছর। ২০০৫ সালের মে মাসের দিকে একদিন মাহবুব ফোন করে জানাল, মালয়েশিয়ায় তার কাজের মেয়াদ বাড়াতে পারছে না। ওই দেশের নিয়ম অনুযায়ী মেয়াদ বাড়ানোর জন্য সবাইকে শারীরিক পরীক্ষা দিতে হয়। তারা প্রায় ১৫ জন গিয়েছিল পরীক্ষা করতে। কিন্তু ১৪ জনের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। শুধু মাহবুবের পরীক্ষার ফল ভালো না বলে আটকে দেওয়া হলো। দুশ্চিন্তায় কাটতে লাগল দিন। মাহবুবকে কিছুতেই জানানো হচ্ছে না তার সমস্যাটা কী! একদিন সাব্বির (ছদ্মনাম) নামের এক সহকর্মী জানালেন, মাহবুবের রক্তে একটা খারাপ ভাইরাস পাওয়া গেছে। দেশে ফিরে যাওয়াই ভালো। কাউকে কিছু না বলে মাহবুব দেশে ফিরে এল।
ভয়াবহ সেই দিনগুলো
মাহবুবের জানা ছিল না তার জীবনে কী ঘটতে যাচ্ছে। দেশে ফিরেই চিকিৎসকের কাছে গেল। চিকিৎসকেরা নানা ধরনের পরীক্ষা করলেন। সব রিপোর্ট ভালো, কিন্তু তার শরীরের ইমিউনিটি (রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা) ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। এই চিকিৎসক থেকে সেই চিকিৎসক করতে লাগল। এই টেস্ট, সেই টেস্ট চলতেই থাকে। মাস ছয়েক এভাবে চলার পর চিকিৎসক পিসিআর, ওয়েস্টার্ন ব্লটের মতো আরও কিছু পরীক্ষা করতে দিলেন। আমরা তখনো জানি না কেন এই পরীক্ষা করা হয়। শুধু চুপচাপ টেস্ট করা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না।
রিপোর্ট হাতে পেলে হাসপাতালের রিসিপশন থেকে জানানো হলো মাহবুবের এইচআইভি পজিটিভ। সাধারণত এ ধরনের রোগীদের রোগের কথা জানানোর আগে কাউন্সেলিং করানো হয়। তাদের মানসিকভাবে শক্ত করেই রোগের বিষয়টা জানানোর নিয়ম। মাহবুবকে এসব না করে হুট করেই জানিয়ে দেওয়া হলো এইচআইভির কথা। এমনকি চিকিৎসকের জন্য অপেক্ষা পর্যন্ত করা হয়নি।
স্বাভাবিকভাবেই মাহবুব ভেঙে পড়ল। ধীরে ধীরে সমাজ, প্রতিবেশী, আত্মীয় এমনকি পরিবার থেকে আমরা আলাদা হয়ে গেলাম। এ দেশে ছোঁয়াচে রোগীকেও মুখে তুলে খাবার খাওয়ানো হয়। কিন্তু কোনো এক অদ্ভুত কারণে এইচআইভিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য সামান্য সহানুভূতি পর্যন্ত নেই। মাহবুবের জন্য তো নেই-ই, আমার জন্যও না। স্বামীর এইচআইভি পজিটিভ মানে আমারও যে মুক্তি নেই। ভয়ে ভয়ে আমিও পরীক্ষা করালাম। আমারও এইচআইভি পজিটিভ ধরা পড়ল। তখন সবকিছু কেমন অনুভূতিহীন মনে হতে থাকে। সবকিছু ছেড়ে কোথাও চলে যেতে ইচ্ছা করে। মাহবুব এতটা মানসিক চাপ নিতে না পেরে একদিন ভোরে আত্মহত্যা করে ফেলল। ঘুম থেকে উঠে দেখি আমার একমাত্র অবলম্বন আর নেই। সেটা ২০০৭ সালের কথা।

অলংকরণ: নিয়াজ চৌধুরী

একলা পথচলা
মাহবুবের মৃত্যুর পর আমি একদম একা হয়ে গেলাম। নিজের এই অবস্থা মেনে নিতে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় মাস সময় লাগল। দু-একবার আমিও আত্মহত্যার কথা ভাবলাম। মনে হতে লাগল, কার জন্য বেঁচে থাকব? ফ্যানে কাপড় ঝুলিয়ে চিৎকার করে কাঁদতে থাকি। একা একা পথে হাঁটি আর ভাবি, আমার সঙ্গে এমনটা না হলেও তো পারত। তারপর একসময় নিজেকে সামলে নিলাম। বুঝতে পারলাম, সামান্য একটা ভাইরাসের জন্য নিজেকে শেষ করে দেব, এটা তো হতে পারে না।
একদিন খুঁজে খুঁজে একটা এইচআইভি ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের সেবা সংস্থার ঠিকানা জোগাড় করলাম। ফোন করে আমার অবস্থা জানালে তারা দেখা করতে বলল। সেখানে গেলে আমার মতো আরও অনেকের সঙ্গে পরিচয় হলো, কথা হলো। একদম অজানায় যেন আমি নিজের আপনজন খুঁজে পেলাম। আমার মতো আরও মানুষ আছে? তারা বেঁচে আছে? তারাও নিজেদের ভালোবাসে? এটা আমার কাছে যে কত বড় একটা পাওয়া ছিল, সেটা দ্বিতীয় কেউ বুঝবে না।
ধীরে ধীরে এই সংস্থার সঙ্গে কাজ করার উৎসাহও তৈরি হলো। আমরা যেন নিজেরাই একটা পরিবার। আক্রান্ত রোগীদের সঙ্গে মিলে এইচআইভি ভাইরাসের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতা তৈরি করা আমার খুব বড় দায়িত্ব মনে হলো। আমি বেঁচে থাকার কারণ খুঁজে পেলাম।
এখন আমি
আমাদের একটা বদ্ধমূল ধারণা হচ্ছে এইডস একটা খুব বাজে রোগ। এর চেয়ে মরে যাওয়াও ভালো। আমি মানছি এইডস সুস্থ হওয়ার মতো রোগ নয়, তবে তার মানে এই নয় যে স্বাভাবিক জীবনযাপন করা অসম্ভব। একটু খেয়াল করে চললে এইডস আক্রান্ত একজন মানুষও বেঁচে থাকতে পারে দীর্ঘদিন।
তবে আমি বুঝি, এইডস আক্রান্ত হয়ে মনোবল ধরে রাখাটা কত কঠিন। আমার মতো অনেক এইডস বা এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তির সঙ্গে এখন আমার মেলামেশা। আমি এখন এইচআইভি ভাইরাসে আক্রান্ত সবাইকে মানসিকভাবে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছি।
আমার বিজয়
বাইরে থেকে যারা এইডস আক্রান্ত রোগীদের মানসিক কাউন্সেলিং করায়, তাদের চেয়ে এইডস আক্রান্ত ব্যক্তিদের কষ্টগুলো আমি খুব বেশি করে বুঝতে পারি। ওদের জীবনের কষ্টগুলো শুনতে শুনতে মনে হয় একটার পর একটা দৃশ্য আমার সামনেই ঘটে যাচ্ছে।
এইচআইভি খুব সাধারণ ভাইরাস নয়। তবে এটা তো ছোঁয়াচেও নয়। তাহলে আমি বা আমরা কেন এই ভাইরাসের জন্য আমাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারব না? একজন মানুষের চেয়ে নিশ্চয় ভাইরাসের গুরুত্ব বেশি নয়? একটা সুস্থ স্বাভাবিক জীবন তো আমাদেরও কাম্য!
এই জীবনের নিজস্ব একটা মূল্য আছে, আত্মসম্মানবোধ আছে, নিজের প্রতি দায়িত্ব আর ভালোবাসাটা আছে। তবে হেরে যাওয়াটা কেন? আমার মতো মানুষগুলোকে আমি শুধু প্রাণপণে এটুকুই বোঝানোর চেষ্টা করি। সেখানেই আমার শান্তি। আমার বিজয়। আক্রান্ত ব্যক্তিদের সঙ্গে মিলে এইচআইভির বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করাই এখন আসল সংগ্রাম বলে মনে করি।
জানি, আমার আয়ু কমে আসছে দ্রুত। এইচআইভি ভাইরাস থেকে এইডস আক্রান্ত হওয়ার পর আমি বারবার ভাবতে চেয়েছি, একদিন হয়তো জাদুমন্ত্রের মতো সব ঠিক হয়ে যাবে। একদিন কেউ বলবে, আরে কিচ্ছু হয়নি তোমার। তুমি তো সুস্থ!
একটা করে দিন পার হয়, আর আমার ছোট হয়ে যাওয়া জীবনটা আরও ছোট হয়। তাই বলে আমার পথচলা বন্ধ নেই। মারা যাওয়ার আগে আমি আরও অন্তত দুজন মানুষের মধ্যে এইডসের সঙ্গে লড়ার মতো মনোবল তৈরি করে দিয়ে যেতে চাই। আমি চাই এইচআইভি আক্রান্ত হয়ে কেউ যেন আর আত্মহত্যার পথ বেছে না নেয়, যে পথ আমার স্বামী বেছে নিয়েছিল। যেটুকু জীবন আমাদের আছে, সেটাও তো কম কিছু নয়। সেটুকু জীবন হাসি আর আনন্দে কাটুক। বাকি সবার মতো একটা সুন্দর ভালোবাসাময় জীবন আমাদেরও কেন হবে না?
লেখক: নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক