উদ্ভাবন আর আবিষ্কারের উৎসব

সিটি ব্যাংক–প্রথম আলো বিজ্ঞান জয়োৎসব ২০১৫
নরসিংদী, খুলনা, বরিশাল ও ঢাকা উত্তর আঞ্চলিক উৎসব নিয়ে বিশেষ আয়োজন

নরসিংদী: অতিথিদের সঙ্গে বিজয়ীরা
নরসিংদী: অতিথিদের সঙ্গে বিজয়ীরা

দেখতে বিদঘুটে হলেও রোবটটা বেশ কাজের। চলাফেরা করার পাশাপাশি সেটা তার যান্ত্রিক ‘হাত’ দিয়ে কোনো একটা জিনিস ধরে–তুলতে পারে, জিনিসটা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় পৌঁছে দিতে পারে। ঢাকা উত্তরের আঞ্চলিক বিজ্ঞান জয়োৎসবে শিক্ষার্থীদের যে দলটি এই রোবট বানিয়ে এনেছে, তারা দর্শনার্থীদের পুরো ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলছে। ভবন ধসে পড়ার মতো বিপর্যয়ের সময় এই রোবটকে উদ্ধারকাজ এবং ধ্বংসস্তূপের ভেতরে সাহায্য পৌঁছানোর কাজে ব্যবহার করা যাবে। আরেক দল শিক্ষার্থী কম খরচে বানানো যায়, এমন একটা থ্রিডি প্রিন্টার বানিয়ে এনেছে, যেটা দিয়ে কোনো একটা জিনিসকে প্রিন্ট করে বাস্তবে রূপ দেওয়া যাবে! রেললাইন কোথাও নষ্ট হলে আগেই নিয়ন্ত্রণকক্ষে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংকেত পাঠানোর উপায় বের করেছে আরেক দল ছেলেমেয়ে। এমন বেশ কিছু প্রকল্প দেখা পাওয়া গেছে নরসিংদী, খুলনা, বরিশাল ও ঢাকা উত্তরের আঞ্চলিক বিজ্ঞান জয়োৎসবে। সিটি ব্যাংক–প্রথম আলো বিজ্ঞান জয়োৎসবের আঞ্চলিক পর্ব গত ১৮ আগস্ট নরসিংদীতে, ২৪ আগস্ট খুলনা, ২৫ আগস্ট বরিশাল এবং ২৮ আগস্ট ঢাকা উত্তরের পর্ব অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিজ্ঞান প্রকল্প প্রদর্শনের পাশাপাশি প্রতিটি আঞ্চলিক জয়োৎসবেই ছিল বিজ্ঞান কুইজ প্রতিযোগিতা, বিজ্ঞানের বিভিন্ন মজার বিষয় হাতেকলমে পরীক্ষা করে দেখা এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং দেশসেরা বিজ্ঞানীদের কাছ থেকে অভিজ্ঞতা জানার সুযোগ।
বিজ্ঞান কুইজ দিয়ে শুরু
সকালে বেলুন উড়িয়ে আর জাতীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে শুরু হয় জয়োৎসব। নরসিংদীতে জেলা শিল্পকলা একাডেমীতে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক আবু হেনা মোরশেদ জামান। খুলনায় খুলনা সরকারি মহিলা কলেজ মিলনায়তনে এবং বরিশালে অশ্বিনীকুমার হলে উৎসবের উদ্বোধন করেন যথাক্রমে খুলনার জেলা প্রশাসক মোস্তফা কামাল এবং বরিশাল মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান মু. জিয়াউল হক। আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজে অনুষ্ঠিত ঢাকা উত্তরের জয়োৎসবের উদ্বোধন করেন কলেজের অধ্যক্ষ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তামিম আহমেদ চৌধুরী। 

ঢাকা উত্তর: উৎ​সবের শুরু বেলুন উড়িয়ে

উদ্বোধনের পরপরই শিক্ষার্থীরা প্রাইমারি, জুনিয়র ও সেকেন্ডারি—এই তিন ক্যাটাগরিতে অংশ নেয় আধা ঘণ্টার বিজ্ঞান কুইজ প্রতিযোগিতায়। পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, জীবিবজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞানসহ বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখার ওপরে করা মজার ও বিচিত্র সব প্রশ্নের উত্তর শিক্ষার্থীদের দিতে হয়েছে কুইজে। প্রশ্নের উত্তর ভেবে ভেবে কিংবা হিসেব কষে বের করার মাঝে কিছুক্ষণ পরপরই দেখা গেছে হাত দিয়ে মাথা চুলকানোর দৃশ্য! প্রতিটি অঞ্চলে কুইজে অংশ নিয়েছে গড়ে চার শতাধিক শিক্ষার্থী।
কুইজ শেষে শিক্ষার্থীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয় বিজ্ঞান জয়োৎসবের ব্যাজ, খাবার ও অংশগ্রহণের সনদ। কুইজ শেষে শুরু হয় প্রকল্প প্রদর্শন এবং বিচারকাজ।
উদ্ভাবন ও চিন্তার বৈচিত্র্য
প্রতিটি উৎসবেই শিক্ষার্থীরা এনেছে বেশ কিছু ভালো প্রকল্প। বরিশালে একদল মেয়ে লিপস্টিক তৈরি করেছে ভেষজ উপাদান থেকে। সেই লিপস্টিক তারা অনেক দিন থেকে ব্যবহার করছে বলেও জানায়। খুলনায় একদল শিক্ষার্থী বানিয়েছে অল্প খরচে দুধ থেকে মাখন তৈরির যন্ত্র। ঢাকা উত্তর আঞ্চলিক জয়োৎসবে ভিকারুনিসা নূন স্কুলের এক শিক্ষার্থী এমন একটি হুইলচেয়ারের ধারণা উপস্থাপন করেছে, যার তিন চাকার সমন্বিত চাকা অনায়াসে সিঁড়ির বাধা অতিক্রম করতে পারে। এ ছাড়া ভূমিকম্প শনাক্তকরণের উপায়, ভেষজ কীটনাশক, জলাবদ্ধতা সমস্যা দূর করার উপায়সহ নানা ধরনের প্রকল্প এনেছিল শিক্ষার্থীরা। প্রকল্প তৈরির ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা যে শুধু নতুন কিছু বানাতে চেষ্টা করেছে তা–ই নয়, নিজেদের আশপাশের সমস্যা সমাধানের দিকেও মনোযোগ দিয়েছে। সমস্যাগুলো সমাধানের ক্ষেত্রে তারা প্রচলিত চিন্তা থেকে অনেক ক্ষেত্রেই বের হয়ে আসতে পেরেছে।

খুলনা: শিক্ষার্থীরা অংশ নিয়েছে ব্যবহারিক বিজ্ঞানের মজার পর্বে

বিজ্ঞান যখন আনন্দের
একদিকে যখন চলতে থাকে প্রকল্প প্রদর্শন ও বিচারকাজ, তখন মিলনায়তনে শিক্ষার্থীদের জন্য থাকে বিজ্ঞানের বিভিন্ন পরীক্ষণ হাতেকলমে করার একটি মজার পর্ব। শুরুতে রুব গোল্ডবার্গ মেশিন বানাতে উৎসাহিত করা হয়। বিজ্ঞান জয়োৎসব উপলক্ষে দেওয়া নোবেল বিজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী জন সি মাথের ভিডিও বার্তা জয়োৎসবে অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের দেখানো হয়।
বিজ্ঞান যে কী আনন্দের হতে পারে, তা শিক্ষার্থীরা টের পায় এরপরই শুরু হওয়া পরীক্ষণগুলো দেখে। কাগজের হঁাড়িতে আগুন দিয়ে পানি গরম করা থেকে অনেকগুলো আলপিনের ওপরে জোরে বেলুন চাপ দিয়েও সেটা ফাটাতে না পারা, পৃথিবীর আকর্ষণ সত্ত্বেও চাঁেদর পৃথিবীতে আছড়ে না পড়া—প্রতি ক্ষেত্রেই শিক্ষার্থীরা যখন অবাক হয়, তখন তাদের বুঝিয়ে বলা হয় যে এটা আসলে ম্যাজিক নয়, বিজ্ঞান! পরীক্ষণগুলো শিক্ষার্থীদের নিজের হাতেই করতে দেওয়া হয়। আর প্রশ্নের ঠিকঠাক উত্তর দিতে পারলেই পুরস্কার হিসেবে মিলে যায় কিশোর আলো।
দেখা হবে বিজয়ে!
প্রকল্প প্রদর্শন আর বিচারকাজ শেষে থাকে সমাপনী পর্ব। এই পর্বে বক্তারা বাংলাদেশ নিয়ে আশার কথা যেমন জানান, তেমন ভাইল ফার্মিয়নের আবিষ্কারক বাঙালি বিজ্ঞানী জাহিদ হাসান, শরীয়তপুরের গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য কিংবা পৃথিবীর অর্ধেক কণা যার নামে, সেই সত্যেন বসুর গল্প সবাইকে শোনান। দেশে বিজ্ঞান শিক্ষায় শিক্ষার্থীদের আগ্রহ ফিরিয়ে আনতে বিজ্ঞান জয়োৎসব সহায়তা করবে বলে আশা প্রকাশ করেন।