মডেলিং

ঊর্ধ্বপানে পিয়া

জান্নাতুল ফেরদৌস পিয়া। ছবি: খালেদ সরকার
জান্নাতুল ফেরদৌস পিয়া। ছবি: খালেদ সরকার

পিয়াকে আমি চিনি দীর্ঘদিন। সেই মডেলিং ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই। ভীষণ আত্মবিশ্বাসী। ক্যারিয়ার শুরু করেছে স্কুল শেষ না হতেই। সে বয়সেই ওর মুখে যে নিষ্ঠার ছাপ আমি দেখেছি, সচরাচর তা দেখা যায় না। শারীরিক সৌন্দর্য ছাপিয়েও মেয়েদের ব্যক্তিত্বই আমাকে সব সময় মুগ্ধ করে। পিয়ার ক্ষেত্রেও তা-ই ঘটেছে। দেখেই মনে হয়েছিল, মেয়েটি অনেক দূর যাবে। ধারণা মিথ্যে হয়নি। মডেলিং শুরু হতে না হতেই ও নাম লেখাল ‘মিস বাংলাদেশ’ প্রতিযোগিতায় এবং জয়ী হয়ে দেখিয়ে দিল, ঢাকার বাইরে থেকে এসে একা একটা মেয়ের পক্ষেও অনেক কিছু করা সম্ভব।
জান্নাতুল ফেরদৌস পিয়া খুলনার মেয়ে। ওর পরিবারকেও আমি চিনি। খুব ভদ্র, বিনয়ী আর শিক্ষিত মানুষ তাঁরা। আমাদের বেশির ভাগ মধ্যবিত্ত পরিবারের মতো পিয়ার পরিবারও প্রথম দিকে ওর মডেলিং ক্যারিয়ারের পক্ষে ছিল না। মেয়েটি একা লড়াই করে এসেছে এত দূর। ওর চরিত্রের এই দিকটাই সবচেয়ে আকর্ষণীয়। কখনো গিভ-আপ করে না। কিছুটা একরোখা, জেদি; তবে ইতিবাচকভাবে। যেটা ধরে, সেটা করেই ছাড়ে। মডেলিংয়ের ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে। এই পেশাটাকে ভালোবাসত বলেই কাজ করে গেছে একাগ্র মনে। শুরু করেছিল ফ্যাশন ম্যাগাজিনে ফটোশুটের মাধ্যমে। তারপর একে একে টিভি বিজ্ঞাপন, র্যা ম্প, অভিনয়, উপস্থাপনা—কত দিকে ছড়িয়ে দিয়েছে তার মেধা। ভোগ ইন্ডিয়ার মতো সাময়িকীর প্রচ্ছদ মডেল হতে পারা চাট্টিখানি কথা নয়। পিয়াই প্রথম বাংলাদেশি মডেল, যে কিনা এ সাফল্যের মালিক। তার এই অর্জনে দেশীয় মডেলদের কথাও উন্নত হয়েছে বাইরের বিশ্বে।

র‍্যাম্পে হাঁটছেন পিয়া

আসলে ২০০৭ সালে মিস বাংলাদেশ হওয়ার পর থেকেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কাজ করতে শুরু করে সে। দেশের বাইরে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় একা একা অংশ নিয়ে সেখানে নিজের একটি জায়গা করে নেওয়া খুব সহজ নয়। সেই কাজটিও সে খুব সুন্দরভাবে করে গেছে। অর্জন করেছে ২০১১ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় আয়োজিত ‘ওয়ার্ল্ড মিস ইউনিভার্সিটি’ শিরোপা। কাজের মতোই নিজেকেও সে ভালোবাসে, সম্মান করে। সুনাম বা অর্থের পেছনে অন্ধের মতো ছোটে না। কাজ করে বেছে বেছে। নিজের যত্ন নেয়। দিনরাত এত মেকআপ নেওয়ার পরও তার ত্বক খুব ভালো। তার কারণ হলো, অযথা রাত জাগে না, সব সময় স্বাস্থ্যকর খাবার খায় এবং খুব পরিচ্ছন্ন থাকে। নিয়মিত শরীরচর্চা করা ওর দীর্ঘদিনের অভ্যাস। বেশির ভাগ মেয়েই কাজ বা সংসারের চাপে নিজের যত্ন নিতে ভুলে যায়। পিয়া একেবারেই ব্যতিক্রম। ও কাজ করছে প্রায় নয় বছর ধরে কিন্তু এখনো ওকে দেখলে সজীব মনে হয়, নতুন লাগে। এর একটা প্রধান কারণ হলো পিয়ার নিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন।
২০১২ সালে চোরাবালি ছবির মাধ্যমে আমাদের চলচ্চিত্রে পা রাখে সে। ছবিটি আমি দেখেছি। বেশি বলা হবে না, তার অভিনয় আমাকে মুগ্ধ করেছে। অত্যন্ত সাবলীল ও ন্যাচারাল অভিনয়। এই বড় পর্দায় পা রাখাটাও জাস্ট শখের বশে। কিন্তু এখন ও খুব সিরিয়াস এ ব্যাপারে। ইতিমধ্যে চারটি ছবিতে অভিনয় করে ফেলেছে। সামনে আরও করবে। আমাদের নায়িকা-সংকট কিছুটা হলেও মিটেছে পিয়ার জন্য। ব্যাপারটা আমাদের চলচ্চিত্রের জন্য অবশ্যই ইতিবাচক। সে ভালো অভিনয় করে, দেখতে সুন্দর, খুব আকর্ষণীয় ফিগার এবং কাজের প্রতি নিষ্ঠাবান—সব মিলিয়ে দারুণ সম্ভাবনাময়। আমার তো মনে হয়, মডেলিংয়ের মতো চলচ্চিত্রেও প্রথম সারির অভিনেত্রীদের একজন হয়ে উঠবে সে।
এবার পিয়ার সবচেয়ে বড় গুণটির কথা বলি। এই এত কিছুর মধ্যেও সে তার পড়াশোনা সব সময় ঠিক রেখেছে। ছোটবেলায় তার স্বপ্ন ছিল, বড় হয়ে ব্যারিস্টার হবে। সেই স্বপ্নপূরণের পথে ইতিমধ্যেই এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে এখন সে পুরোদস্তুর আইনজীবী। লন্ডন কলেজ অব লিগ্যাল স্টাডিজে আইন বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করেছে। ভাবা যায়, মিডিয়ার জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশে নিয়মিত কাজ করেও একটি মেয়ে পড়াশোনায় এতটা সিরিয়াস হতে পারে! পিয়া বলেই সম্ভব।
ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ভবিষ্যতে আর কী করবে সে। আমাকে চমকে দিয়ে উত্তর দিল, রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার ইচ্ছা আছে খুব শিগগির। দেশকে পাল্টে ফেলার সৈনিক হয়ে উঠতে চায় সে। জানি, পিয়া তার এই স্বপ্নটাকেও অপূর্ণ রাখবে না। আত্মবিশ্বাসী, কর্মঠ, নিষ্ঠাবান এই মেয়েটির জন্য শুভকামনা
লেখক: রূপবিশেষজ্ঞ, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, পারসোনা