
শহর, গ্রাম বা শহরতলির ঘরে ঘরে বেড়ে ওঠা ছোট্টমণিদের পিছু ছাড়ে না রোগবালাইয়ের যন্ত্রণা। সূর্যের প্রখরতায় অস্থির ছোট্ট প্রাণগুলো কখনো না বুঝেই খেয়ে নিচ্ছে অস্বাস্থ্যকরভাবে তৈরি করা আইসক্রিম বা শরবত, কখনো আবার তীব্র গরমে ছোটাছুটি করে এসেই ঢুকছে শীতল ঘরে। হাসিখুশি শিশুগুলো এভাবেই অসুস্থ হয়ে পড়ছে হঠাৎ করে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু বিভাগের অধ্যাপক সেলিনা খানম বলেন, এ সময় শিশুরা সর্দি-কাশি, গলাব্যথা কিংবা পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হতে পারে। এসব সমস্যা প্রতিরোধে মা-বাবাদের সচেতন থাকা প্রয়োজন।
এই সময়ে খাওয়া-দাওয়া
সেলিনা খানম জানালেন, বাসি খাবার শিশুদের জন্য ক্ষতিকর। এক দিনের রান্না করা খাবার ফ্রিজে রেখেও শিশুকে অন্যদিন খাওয়ানো ঠিক নয়। বারডেম জেনারেল হাসপাতালের জ্যেষ্ঠ পুষ্টি কর্মকর্তা শামসুন্নাহার নাহিদ বলেন, অতিরিক্ত লবণ মেশানো খাবার শিশুদের জন্য ক্ষতিকর। ওদের অতিরিক্ত মেয়োনেজ বা মাখন মেশানো খাবার দেবেন না।
পানি ও পানীয়
কোমল পানীয় এবং রাসায়নিক মিশ্রিত ফলের রস শিশুদের জন্য ক্ষতিকর। ঘরে তৈরি শরবত বা ফলের রস দিতে পারেন। ঠান্ডা পানি বা বরফ মেশানো পানীয় খেলে শিশুর গলাব্যথা হতে পারে। সেলিনা খানম জানালেন, একটি শিশুর সারা দিনে দু-তিন লিটার পানি প্রয়োজন। পানি, শরবত, ফলের রস মিলিয়ে মোট দু-তিন লিটার পরিমাণ হলেই চলবে। তবে তিন-চার বছরের বেশি বয়সীদের এ সময় অতিরিক্ত দুধ খেতে দেওয়া ঠিক নয়। এতে তাদের অ্যাসিডিটি হতে পারে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সোহেলা আখতার বলেন, শিশুদের সামান্য লবণ মিশিয়ে লেবুর শরবত দেওয়া যেতে পারে। আর সারা দিনে পর্যাপ্ত পানি পান করার ব্যাপারে বড় ভূমিকা রাখতে পারেন শিক্ষকেরা।
প্রত্যেক শিক্ষক ক্লাস শুরু করার আগে শিশুদের একবার পানি পান করে নিতে বলতে পারেন।
রোদের সঙ্গে আড়ি?
শিশুদের ত্বকে সানস্ক্রিন ক্রিম বা লোশন লাগানোর প্রয়োজনীয়তা নেই। সানস্ক্রিন লোশনের কোনো উপাদানের প্রতি শিশুর অ্যালার্জি থাকলে হিতে বিপরীত হয়ে যাবে। আর শিশুদের রোদচশমা ব্যবহার করাটাও খুব জরুরি কিছু নয় বলেই জানালেন বিশেষজ্ঞরা।
যখন স্কুলে
স্কুলের জন্য বাসায় তৈরি করা টিফিন সবচেয়ে ভালো। আপেল, কলাসহ বিভিন্ন ফল, আলুর চপ, হালুয়া বা শুকনো মিষ্টি দিতে পারেন টিফিনে। ভাজাপোড়া খাবার এবং বাইরের পানি, চাটনি, ঝালমুড়ি ইত্যাদি না দেওয়াই ভালো। পর্যাপ্ত পানি দিয়ে দিতে হবে শিশুর সঙ্গে। ঘরে তৈরি ফলের রসও দিতে পারেন। সোহেলা আখতার বলেন, পানি পান করার পাশাপাশি শিশুদের উৎসাহিত করতে হবে, যেন ওরা ওয়াশরুমে যাওয়া থেকে নিজেদের বিরত না রাখে। অপরিষ্কার ওয়াশরুমে যেতে শিশুরা অস্বস্তিবোধ করতে পারে। স্কুলের ওয়াশরুম যেন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকে, সে ব্যাপারে খেয়াল রাখতে হবে স্কুল কর্তৃপক্ষের। কারণ প্রস্রাব আটকে রাখলে কিডনি কিংবা মূত্রনালির সংক্রমণ হতে পারে।
স্কুল হলো ছুটি
সেলিনা খানম বলেন, অনেক সময়ই দেখা যায়, শিশুকে স্কুল থেকে আনার পথে মা অথবা অন্য যেকোনো অভিভাবক নিজেও আইসক্রিম কিনছেন, শিশুটিকেও কিনে দিচ্ছেন। কিংবা কেটে বিক্রি হয়, এমন কোনো ফল কিনে খাচ্ছেন শিশুর সামনে। রোদের মাঝে আইসক্রিম খেলে যেমন শিশুর ঠান্ডা লেগে যেতে পারে, তেমনি ফল যদি ময়লা পানিতে ধোয়া হয়, সেই ফল খেয়ে শিশু পেটের পীড়ায় ভুগতে পারে। তাই মা-বাবা অথবা অন্য যে ব্যক্তিই শিশুর সঙ্গে থাকুন না কেন, তাঁকে এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। শিশুদের সামনে এসব খাবার খেলে সে-ও এগুলো খেতে আগ্রহ দেখাবে, এটাই স্বাভাবিক।
গরম হলেই ঘাম
শিশুরা খেলাধুলা করে ঘেমে যায় বলে ঘন ঘন পোশাক বদলে দিতে হবে ওদের। ঘেমে গেলে শরীর মুছিয়ে দিতে হবে। শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র শিশুর জন্য ক্ষতিকর নয়। তবে প্রচণ্ড গরমে ঘেমে-নেয়ে একাকার শিশুটিকে চট করে শীতল হাওয়ার সংস্পর্শে নেবেন না। খেলাধুলা করে এসেই ফ্যানের বাতাসে বসতে পারে শিশু। এ সময় স্বাভাবিক তাপমাত্রার পানি দিতে পারেন। খানিক পরে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র চালু করুন।
যেমন পোশাক চাই
এ সময়ে শিশুদের পোশাক হতে হবে আরামদায়ক। সুতি, ঢিলেঢালা পোশাকই এ সময়ের উপযোগী। হাতা কাটা জামাও চলতে পারে, আবার শিশু যদি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, তাহলে ফুলহাতা জামাতেও কোনো সমস্যা নেই। ফ্যাশন হাউস যাত্রার ধানমন্ডি শাখার ব্যবস্থাপক সোনিয়া আক্তার শম্পা জানালেন, শিশুদের ফতুয়া, হাতা কাটা জামাসহ গরমের উপযোগী বিভিন্ন পোশাক রয়েছে সেখানে। হালকা রঙের ওপর আকর্ষণীয় আঁকিবুঁকির যেকোনো পোশাকই এই সময়ের জন্য ভালো।
আরও কিছু কথা
গরমে শিশুর চুল ছোট করে দেওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চুল বড় থাকলে গরমে শিশুর অস্বস্তি হবে। আর শিশু চাইলে দিনে দুবার গোসল করতে পারে। এতে আপত্তি করার কিছু নেই।
হঠাৎ অসুস্থতায়
সেলিনা খানম জানালেন, শিশুর সর্দি হলে নাক পরিষ্কার করে দেওয়াটা জরুরি। অ্যান্টিহিস্টামিন জাতীয় সিরাপও দিতে পারেন। জ্বর হলে দিতে পারেন প্যারাসিটামল সিরাপ। গলাব্যথা বা অন্য যেকোনো সমস্যা খুব বেশি হলে শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।
ডায়রিয়া হলে প্রচুর পানি ও স্যালাইন খাওয়াতে হবে। তবে পায়খানার সঙ্গে রক্ত গেলে, পায়খানার সময় পেট ব্যথা হলে বা অতিরিক্ত পিচ্ছিল পদার্থ (সাধারণভাবে যেটিকে আম বলা হয়) গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।