শিশু

ওকে সময় দিন

যত বেশি পারা যায় শিশুর সঙ্গে মিশতে হবে, কথা বলতে হবে। মডেল: তুষ্টি ও অহনা। ছবি: অধুনা
যত বেশি পারা যায় শিশুর সঙ্গে মিশতে হবে, কথা বলতে হবে।  মডেল: তুষ্টি ও অহনা। ছবি: অধুনা

লোকে বলে, জন্মের পর শিশুর প্রথম কান্না নাকি সবচেয়ে শ্রুতিমধুর কান্না। সেই শিশু ধীরে ধীরে বেড়ে উঠতে থাকে। তার হাসি-কান্না আর আধো আধো বুলি পুরো পরিবারকে ব্যতিব্যস্ত রাখতে সক্ষম। তবে কখনো কখনো অনেক মা-বাবাই অভিযোগ করেন, শিশু নাকি বয়স অনুযায়ী কথা বলছে না। অনেকে এমনও বলেন যে শিশু কিছু শব্দ বলছে, কিন্তু যথেষ্ট বয়স হওয়ার পরও পূর্ণ বাক্য বলতে পারছে না। কেউ আবার মা-বাবার ডাকে সাড়া দেয় শুধু তখনই, যখন মা-বাবার কাছে আকর্ষণীয় কোনো জিনিস থাকে।
অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, মা-বাবা দুজনই কর্মজীবী হলে সারা দিন শিশুটিকে দেখভাল করার মানুষ পাওয়া গেলেও তার সঙ্গে কথা বলার মতো কেউ থাকে না। এর ফলে তার মধ্যে কথা বলার প্রবণতা শুরু থেকেই কম থাকে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে এমনও হতে পারে, শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে কোনো সমস্যা না থাকলেও কোনো শিশু একটু দেরিতে কথা শিখছে। এদের কোনো ধরনের চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না, বরং চার-পাঁচ বছর বয়স নাগাদ তারা নিজেরাই স্বাভাবিকভাবে কথা শিখে যায়। তবে বিশেষজ্ঞরা বললেন, শিশুকে সময় দেওয়াটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
শিশু ও মাতৃস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের মনোবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান ও শিশু মনোবিদ নার্সিস রহমান বললেন, শিশুর বয়স অনুযায়ী তাকে খেলনা কিনে দিন এবং তার সঙ্গে খেলুন। তাকে ছড়া বা গল্প শোনাতে পারেন। ছবির বই দেখিয়ে তার সঙ্গে কথা বলতে পারেন। সে যেসব বিষয়ে মজা পাবে, সেগুলোই তার সামনে করুন বা বলুন।
এ প্রসঙ্গে আরও ‘প্রয়াস’ স্কুলের স্পিচ ও ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্ট মমতাজ খানম জানালেন, আজকাল এ ধরনের সমস্যার কথা অনেক মা-বাবাকেই বলতে শোনা যায়। তবে নিজেরা একটু সচেতন হলেই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শিশুর এ ধরনের সমস্যা ঠিক হয়ে যায়।

কেন হয় এমন?
এ ধরনের সমস্যা যাদের হয়, তাদের অধিকাংশের মা-বাবা শিশুটিকে পর্যাপ্ত সময় দেন না। এই শিশুদের শান্ত রাখার জন্য প্রায় সারা দিনই টেলিভিশনে কার্টুন দেখানো হয় অথবা মোবাইলের রিংটোন শোনানো হয়। কাজেই তাদের মধ্যে অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করার ক্ষমতা তৈরি হয় না।
এ ছাড়া গর্ভকালীন সময়ে মা যদি নির্দিষ্ট কিছু জীবাণু দ্বারা সংক্রমিত হন, শিশু জন্মের সময় যদি কোনোভাবে মস্তিষ্কে আঘাত পায় বা শিশু যদি জন্মের পরপরই না কাঁদে, তাহলেও পরবর্তীকালে শিশুর কথা বলতে অসুবিধা হতে পারে। মাত্রাতিরিক্ত জ্বর, গুরুতর কোনো মানসিক আঘাত অথবা অটিজমের কারণেও এমনটা হতে পারে। আবার শিশু যদি কানে শুনতে না পায়, তাহলেও সে কথা বলতে পারে না।

হতে হবে সচেতন
ছয় সপ্তাহ থেকেই শিশু বিকট আওয়াজে ভয় পেয়ে যায়। এটি দেখে ধারণা করা যেতে পারে যে সে কানে শুনছে। তিন মাস বয়স থেকেই শিশু নিজে থেকে মুখ দিয়ে নানা রকম আওয়াজ করতে পারে। দুই বছর বয়সী একটি শিশুর গড়ে ৫০০-১০০০ শব্দের মানে বুঝতে পারার কথা এবং সেগুলো বলতে পারার কথা। এক-দুই বছরের মধ্যে শিশু কথা বলতে না শিখলে সত্বর তাকে শিশুবিশেষজ্ঞের কাছে নিয়ে যান। তিনি প্রয়োজনে শিশুটিকে অন্যান্য বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠিয়ে দিবেন।
আজকাল অনেক মা-বাবাই নিজেদের নিয়ে বেশি ব্যস্ত থাকছেন। শিক্ষিত ব্যক্তিদের মধ্যেই ক্যারিয়ার নিয়ে ব্যস্ত থাকার প্রবণতা বেশি লক্ষ করা যাচ্ছে। তবে শতব্যস্ততার মধ্যেও শিশুকে সময় দিতে হবে। আর কোন বয়সে শিশুর কোন ধরনের বিকাশ কতটা হবার কথা, তা ইন্টারনেট থেকে জেনে নিতে পারেন। টেলিভিশন, কম্পিউটারের মতো প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে শিশুকে খাওয়ানো বা তাকে এগুলো দেখিয়ে শান্ত রাখা থেকে বিরত থাকুন।

লাগতে পারে চিকিৎসা
শিশু যদি শুনতে না পায়, তাহলে তার বধিরতার চিকিৎসা লাগবে। যারা ঠিকমতো কথা বলছে না, তাদের জন্য লাগতে পারে স্পিচ ও ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি।
শিশু এ চিকিৎসার পর কথা বলতে পারবে কি না, তা নির্ভর করে শিশুর বয়স ও তার সমস্যাটির ওপর। বেশি বয়স হয়ে গেলে তাকে নতুন করে কথা শেখানো মুশকিল। আর শিশুর উচ্চারণগত সমস্যা থাকলে শিশু কথা বলতে শেখার পরে তাকে উচ্চারণ শুদ্ধ করার চিকিৎসা দেওয়া যায়।