টাকা ছাড়া সমন নড়ে না

জারিকারকের জারিজুরি!

আদালতের জারিকারকেরা টাকা ছাড়া নোটিশ বা সমন নিয়ে প্রাপকের কাছে যান না। আবার টাকা নিয়েও তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির হাতে পৌঁছান না। এ কারণে বছরের পর বছর সমন আটকে থাকে। এতে মামলা নিষ্পত্তিতে দেরি হয়। এ ছাড়া, জারিকারকেরা অনেক সময় খরচের দু-তিন গুণ টাকা দাবি করেন। এক পক্ষের কাছ থেকে টাকা নিয়ে অন্য পক্ষের সর্বনাশও করেন তাঁরা। এমন অভিযোগ ভুক্তভোগী বাদী-বিবাদী, আইনজীবী ও সহকারীদের মুখে মুখে।

বিষয়টি অকপটে স্বীকার করলেন একাধিক জারিকারক। একজন জারিকারক বললেন, ‘আদালত থেকে একটি সমন নিয়ে মিরসরাইয়ের হিঙ্গুলি বা হাটহাজারীর গুমানমর্দন এলাকায় যাওয়া-আসা খরচ পড়ে দূরত্বভেদে চার থেকে ছয় শ টাকা। নগরের ভেতর খরচ হয় এক শ-দুশ টাকা। এভাবে বিভিন্ন জায়গায় সমন পৌঁছে দিতে খরচ পড়ে মাসে আট-নয় হাজার টাকা। কারও সহযোগিতা ছাড়া সমনগুলো পৌঁছাব কীভাবে?’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরেকজন জারিকারক ক্ষোভের সঙ্গে জানালেন, ‘চাইলে কেউ কেউ দূরত্বভেদে ৫০ থেকে চার-পাঁচ শ টাকা দেন। অনেকে দেন না। বরং দু-চার কথা শুনিয়ে দেন। কিন্তু যে বেতন পাই তার সঙ্গে চেয়ে নেওয়া টাকা যোগ করেও ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া ও সংসার চালাতে কষ্ট হয়। সবাই আমাদের টাকা নেওয়াটা দেখেন। কিন্তু বোঝেন না আমাদের কষ্ট।’

উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, জারিকারক ভানু ভট্টাচার্য এলপিআরে যাবেন এ মাসে। ৩৭ বছর চাকরি করে তিনি সব মিলিয়ে বেতন পান ১৫ হাজার ২৯১ টাকা। একই পদে নতুন জারিকারকেরা পান সাত হাজার ৬৫০ টাকা। অন্যদিকে তাঁদের শুধু সড়কপথে প্রতি কিলোমিটারে ৫০ পয়সা করে যাতায়াত খরচ দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। তবে তা পেতে হলে প্রতিবার যাতায়াতের প্রমাণসহ নির্দিষ্ট ছকে বিল তৈরি করে ছয়-সাত টেবিল ঘুরতে হয়। তাও মিলে কয়েক মাস পর। এ রকম হয়রানি এড়াতে বিলই করেন না সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

টাকা নিয়েও সমন না পৌঁছানোর ব্যাপারে আইনজীবীদেরও দুষলেন তাঁরা। জানালেন, অনেক মামলার আরজিতে সঠিক নাম-ঠিকানা লেখা হয় না। ফলে এলাকায় গিয়ে প্রাপককে পাওয়া যায় না। অনেকে নাম-ঠিকানা ভুল হওয়ার অজুহাতে সমন গ্রহণ করেন না। দাবি, তাঁদের নামে নেওয়া টাকার বেশিরভাগ আইনজীবীর সহকারীরাই রেখে দেন।

একাধিক মামলার নথিতে মনগড়া ঠিকানা লেখার প্রমাণও মিলেছে। একটি নথিতে বিবাদীর ঠিকানা লেখা হয়েছে এভাবে-‘গোল ছেনোয়ারা, আং-জহুরুল হক, সৈয়দুল হক, শামসুন্নাহার দোং (আং জমির উদ্দিন) পীং-মৃত ফজলুল হক সাং-মাদারবাড়ি, বেগমা খাতুন, পীং-ফজলুল হক, সাং-প. মাদারবাড়ি, চট্টগ্রাম।’ তিন বছরেও সমন পাননি তাঁরা।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, ‘একটি ওয়ার্ডে অনেক গলি এবং হাজারো বাড়ি থাকে। কিন্তু গলি ও বাড়ির নম্বর ছাড়া সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে খুঁজে পাওয়া অসম্ভব।’ তাঁদের মতে, মামলা দীর্ঘদিন ধরে রাখার কৌশল হিসেবেই কোনো কোনো আইনজীবী এ ধরনের দুর্বলতাগুলো রেখে দেন।

জারিকারকদের মূল কাজ নগর ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় মামলাসংশ্লিষ্ট পক্ষের কাছে স্থানীয় ও উচ্চআদালত থেকে জারি করা নোটিশ বা সমন পৌঁছে দেওয়া। এ ছাড়া, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্দেশমতো অন্য টুকিটাকি কাজও করতে হয় তাঁদের।

জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করে একজন বিচারক জারিকারকদের বেতন ও যাতায়াতভাতা সময়োপযোগী নয় বলে স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘এ ব্যাপারে উচ্চ পর্যায়ে সুচিন্তিত সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিৎ।’

এ বিষয়ে আইনজীবী আখতার কবির চৌধুরী বলেন, আরজি সঠিকভাবে লেখা, মামলা নথিভুক্ত করার আগে তা যাচাই করা এবং সমন জারিসহ বিচারপ্রক্রিয়া সহজ করার ব্যাপারে আদালতসংশ্লিষ্ট সবারই কমবেশি দায়িত্ব রয়েছে। সবাই নিজ নিজ ক্ষেত্রে আন্তরিক ও সতর্ক হলে বিচার প্রার্থীদের হয়রানি অনেকটা কম হতো।