
সকাল থেকে আকাশে মেঘ। কালবৈশাখীর হুংকার। ভরদুপুরে রাজধানী প্রায় অন্ধকার! ৩০ এপ্রিল এভাবেই চোখ রাঙাচ্ছিল শহরের আবহাওয়া। সেই হুংকারের থোড়াই কেয়ার করে বিকেলবেলা প্রথম আলোর কার্যালয়ে হাজির হলেন একদল তরুণ। ঘড়িতে বিকেল চারটা। বৃষ্টিস্নাত ঢাকার রাজপথ পেরিয়ে নানা ক্ষেত্রের তরুণেরা তাঁদের স্বপ্ন-সম্ভাবনা-পরিকল্পনার কথা জানাতে হাজির হয়েছিলেন তারুণ্যের জয়োৎসব বৈঠকে। ‘ক্রাউন সিমেন্ট-প্রথম আলো তারুণ্যের জয়োৎসব’-এর অংশ হিসেবে এই বৈঠকের আয়োজন করা হয়। তরুণদের কর্মযোগ্যতা ও দক্ষতা, নিজেদের গড়ে তোলা এবং আগামী দিনের প্রস্তুতি কেমন হচ্ছে, কেমন হওয়া উচিত—এসব নিয়েই হলো প্রাণবন্ত আলোচনা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশসহ বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরা সেদিন মস্তিষ্কে ঝড় তুললেন। ইংরেজিতে যাকে বলে ‘ব্রেইন স্টর্ম’। সবাই ভাবছিলেন, কেমন হবে আগামী দিনের ক্যারিয়ার? কীভাবে নিজেদের প্রস্তুত করবেন তাঁরা? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যারিয়ার ক্লাবের সভাপতি হালিমা আক্তার ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের শিক্ষার্থী লুবাবা মাইশা মনে করেন, শিক্ষার্থীদের সামনে কোনো পথনির্দেশনা নেই। কাউন্সেলিং বা গাইডলাইনের অভাব, অভিভাবক ও সমাজের প্রত্যাশার চাপ ছাত্রছাত্রীদের ভোগাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ—চিকিৎসক বা প্রকৌশলী না হলে জীবন বৃথা, এখনো এমনটা ভাবেন অনেক অভিভাবক। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যারিয়ার ক্লাবের সভাপতি শাহিন আলম ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এন্টারপ্রেনার্স ও ই-কমার্স ক্লাবের এস এম মুশফিকুল ইসলামের কথায় উঠে আসে তরুণদের বিশ্ববিদ্যালয়-জীবনের নানা সমস্যার কথা। নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির বিতর্ক ক্লাবের রাকেশ রায়হান বিশ্ববিদ্যালয়ের একঘেয়েমি আর নীরস পড়াশোনাকেই সব হতাশার কারণ হিসেবে দাঁড় করালেন।
বৈঠকে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সমস্যা-সংকট নিয়ে আলোচনা হয়েছে, তা নয়। তরুণ পেশাজীবীদের পেশা দক্ষতা ও সৃজনশীলতা নিয়েও কথা হলো। কোন কাজ করব, কীভাবে করব—এসব বিষয়ে পরামর্শ দেন চালডাল ডটকমের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা জিয়া আশরাফ। তরুণদের কর্মজীবন নিয়ে অনীহা ও দ্বিধার কথা তুলে ধরেন জুমশেপারের প্রধান নির্বাহী কাওসার আহমেদ। তাঁর ভাষ্যে, ‘আমাদের তরুণেরা স্বপ্ন দেখেন গুগল বা ফেসবুকে চাকরি করবেন। কিন্তু তাঁরা জানেন না কী করে সেই লক্ষ্যে পৌঁছাবেন।’
বৈঠকে যেমন উদ্যোক্তা, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কর্মী, শিল্প খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা হাজির ছিলেন; তেমনি ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষকেরা। তরুণদের জন্য কর্মক্ষেত্র বাড়ানো এবং পছন্দের পেশায় উদ্বুদ্ধ করতে বিভিন্ন পর্যায় থেকে সহযোগিতা করার ওপর জোর দেওয়া হয় আলোচনায়। আগামী কয়েক দশকে বাংলাদেশ কোথায় যাবে, নতুন কোন কোন কর্মক্ষেত্র তৈরি হবে, তা জানতে বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পসংশ্লিষ্টদের গবেষণায় মনোযোগ দিতে আহ্বান জানানো হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাশেদুর রহমান বলেন, ‘ইউরোপ-আমেরিকার বড় বড় কোম্পানি গবেষণায় অর্থ ব্যয় করছে। আমাদের দেশে এই প্রবণতা দেখা যায় না। আমাদের তরুণদের জন্য কর্মক্ষেত্র বাড়ানো ও উদ্যোক্তা হতে উদ্বুদ্ধ করতে দেশি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তাওহিদা জাহান তরুণদের পথনির্দেশনা ও সব প্রশ্নের উত্তর জানতে একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরির পরামর্শ দেন।
বর্তমান তরুণদের নানামাত্রিক সমস্যা নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়। যাঁরা এগিয়ে যাচ্ছেন, তাঁদের পাশাপাশি পিছিয়ে থাকা তরুণ কিংবা প্রত্যন্ত অঞ্চলে যাঁরা কিছু করার চেষ্টা করছেন, তাঁদের জন্য সমন্বিত কিছু করতে পরামর্শ দেন আলোকচিত্রী প্রীত রেজা। কুইন্স ইয়াং লিডারস অ্যাওয়ার্ডজয়ী সাজিদ ইকবাল তরুণদের কিছু শুরু করার আগে গবেষণা ও বাজার যাচাইয়ের কথা বলেন। গ্রিন সেভার্সের উদ্যোক্তা আহসান রনি বলেন গ্রামের তরুণদের জন্য সুযোগ তৈরির কথা। ছাদের বাগান তৈরি থেকে শুরু করে কৃষিক্ষেত্রে অবদান রাখতে তরুণদের তিনি উদ্বুদ্ধ করেন।
টেন মিনিট স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা আয়মান সাদিক তরুণদের অফলাইন-অনলাইনে যুক্ত থাকার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত শেখার পরামর্শ দেন। এ ছাড়া এমআইটি গ্র্যাজুয়েট তামান্না ইসলাম বড় স্বপ্ন দেখার আহ্বান করেন। তিনি কার্যকর শিক্ষাপদ্ধতির ওপর জোর দেন।
বৈঠকে আরও অংশ নেন ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের সহযোগী অধ্যাপক কাজী হাসান রবিন, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষক বিপাশা মতিন, ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বুশরা হুমায়েরা, স্থপতি ফারহানা রশীদ, ব্র্যাক সোশ্যাল ইনোভেশন ল্যাবের আকিব মো. শাতিল, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের তানজিম আমিন বোরহান, বিএনসিসি থেকে উৎপল চন্দ্র দাস, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির সিএসই ক্লাবের সুমনা ইসলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সামিয়া বিনতে আলমগীর, ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী মীর বুশরা বিনতে বাশার এবং আল ইহসান ক্যাডেট মাদ্রাসার তাজুল ইসলাম প্রমুখ।
বৈঠকের শেষে কথা বলেন, ক্রাউন সিমেন্ট গ্রুপের উপদেষ্টা এম এ মজিদ। তরুণদের কর্মক্ষেত্রে সাফল্যের জন্য যোগাযোগ-দক্ষতার ওপর জোর দিতে পরামর্শ দেন তিনি। ব্যক্তিজীবনে সততা ও আদর্শকে ধারণের ওপর গুরুত্ব দেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর যুব কর্মসূচি সমন্বয়ক মুনির হাসান। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান, সহযোগী সম্পাদক আনিসুল হক এবং ক্রাউন সিমেন্টের সহকারি মহাব্যবস্থাপক সারওয়ার আলম চৌধুরী।