সন্তান পালন

নিয়ম কী মানতেই হবে?

শিশুকে কিছু কাজ তার ইচ্ছামতো করতে দিতে হবে। মডেল: টিয়ারা, ছবি: অধুনা
শিশুকে কিছু কাজ তার ইচ্ছামতো করতে দিতে হবে। মডেল: টিয়ারা, ছবি: অধুনা

সকালে উঠেই মায়ের বকুনি ‘চার মিনিট দেরি হলো কেন উঠতে?’ ‘তাড়াতাড়ি দাঁত ব্রাশ করে তৈরি হয়ে নাও, স্কুলে দেরি হয়ে যাবে।’ ‘স্কুলে গিয়ে সোজা ক্লাসে বসে থাকবে, মোটেই বাইরে খেলবে না’। বড় হতে হতে নানা নিয়মের বেড়াজালে পড়ে যায় শিশুরা, বাবা-মায়ের খবরদারি ‘ঠিক সময়ে বাসায় ফিরবে’; ‘অবশ্যই দুধ খেয়ে নেবে’; ‘এর সঙ্গে মিশবে না ওর সঙ্গে বন্ধুত্ব করো’; ‘এভাবে বসবে না, এই পোশাক পরতে পারবে না’; ‘সময় মেনে ঘুমাবে, পরীক্ষার আগে খেলা দেখার দরকার নাই’ ইত্যাদি ইত্যাদি।
একটি শিশুর সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য নিয়মের প্রয়োজনীয়তা আছে বৈকি। শিশুর শারীরিক আর মানসিক বিকাশকে সাবলীল রাখতে হলে নিয়ম মেনেই তাকে বড় হতে হবে। তবে কখনো কখনো দেখা যায় বাবা-মায়েরা এই নিয়মগুলো সব সময় শিশুর ওপর চাপিয়ে দিচ্ছেন, নিয়মের গুরুত্ব কখনোই ব্যাখ্যা করছেন না আবার ব্যাখ্যা করলেও তাঁদের নিজেদের মতো করে একপেশে যুক্তি প্রয়োগ করছেন। উপযুক্ত ব্যাখ্যা ছাড়া নিয়মের প্রয়োগ করতে গেলে তা একবারেই একটি ‘নির্বাহী আদেশ’ হয়ে যায় যার ফল শিশুর জন্য বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মঙ্গলজনক নয়।
কেবল শিশুরা নয়, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করতে হলে নিয়ম মানতে হবে প্রত্যেককেই, কিন্তু এই নিয়ম মানার বিষয়টি যেন কখনো কারও ওপর মানসিক চাপ তৈরি না করে। বিনা প্রশ্নে কঠিন কঠোর নিয়ম মানার চর্চা শিশুসহ যেকোনো সৃজনশীল বিকাশের অন্তরায়। নির্দেশমতো চলতে গিয়ে দেখা যায় একজন মানুষের সম্ভাবনারÿক্ষেত্রগুলো ছোট হয়ে আসে। তার দৃষ্টিভঙ্গি হয়ে যায় সুড়ঙ্গের মধ্য দিয়ে দেখার মতো, যাকে বলা হয় ‘টানেল ভিশন’। বাইরের অপারসম্ভাবনার জগৎটি আড়ালেই থেকে যায়। পাশাপাশি একঘেয়ে নির্দেশিত আর নির্ধারিত নিয়মে চলতে চলতে পরিণত বয়সে তারা সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে, যার পরিণতি হতে পারে হতাশা আর বিষণ্নতা। অতিরিক্ত নিয়মপ্রবণ হয়ে ওঠা মানুষেরা একপর্যায়ে সমাজের যেকোনো অসংগতি দেখে বিরক্ত হন, রাগ করেন কিন্তু সমাজকে পরিবর্তন করতে না পারার মতো হতাশা থেকে বিষাদগ্রস্ত হয়ে পড়তে পারেন। ছোটবেলা থেকে কঠোর নিয়মের মধ্যে বড় হওয়া শিশু ভাবতেই পারে না যে নিয়মের ব্যত্যয় হতে পারে, তাই যেকোনো অসংগতি আর ব্যর্থতা তাদের দারুণভাবে কষ্ট দেয়। চিন্তার বিমূর্ত অংশটি অনেক সময় তাদের কাছে অধরাই থেকে যায়।

আবার একদম নিয়মহীনতার মধ্যে বেড়ে ওঠা শিশুরা সামাজিক দক্ষতা শিখতে পারে না, কখনো সমাজে মিলেমিশে চলার উপযোগী হয়ে ওঠে না। তাদের কারও কারও মধ্যে তৈরি হয় ব্যক্তিত্বের সমস্যা। অতি সৃজনশীলতার উদ্দেশ্য নিয়ে, কেবল প্রাতিষ্ঠানিকতার বিরোধিতা করে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠা কষ্টকর। এভাবে নিয়ম ভেঙে স্ব-স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন এমন মানুষের উদাহরণ পাওয়া যাবে ঠিকই কিন্তু তারা ব্যতিক্রম মাত্র। ফলে এই ‘ব্যতিক্রম’দের বিপরীতে ‘সাধারণ’ সবার জন্য সুস্থ, স্বাভাবিক জীবনাচারের নিয়মকে মোটেই বাদ দেওয়া যাবে না।
এই অতিরিক্ত নিয়ম মানা অথবা একবারেই নিয়মহীনতার কোনোটাই শিশুর বিকাশের জন্য উপযোগী নয়, এ জন্য বাবা-মায়েরা শিশুকে সুষম এবং যুক্তিযুক্ত নিয়মের চর্চায় উৎসাহিত করবেন। এ জন্য যে বিষয়গুলো মনে রাখা জরুরি তা হচ্ছে—
* কোনো যুক্তি বা ব্যাখ্যা ছাড়াই শিশুর ওপর কোনো নিয়ম চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। নিয়ম মেনে চলার সুফল এবং নিয়ম না মানার খারাপ দিকটি তার উপযোগী করে তাকে বুঝিয়ে বলতে হবে।
* •সমাজের ভালো আর মন্দ অনুষঙ্গগুলো শিশুদের তাদের বয়স উপযোগী করে জানাতে হবে এবং তার বেছে নেওয়ার আর সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য সুযোগ করে দিতে হবে।
* বাড়িতে কিছু সাধারণ নিয়ম থাকবে সবার জন্য, কেবল শিশু নিয়ম মানবে আর কেউ মানবে না সেটা ঠিক নয়। যেমন শিশুকে নিয়ম করে দেওয়া হলো রাত ১০টার পর টিভি দেখা যাবে না, ঘুমাতে হবে; কিন্তু বাবা-মা রাত ১২টা পর্যন্ত টিভি দেখলেন। এমনটা যেন না হয়।
* •শিশুর জন্য একটি রুটিন থাকা ভালো, তবে সেই রুটিনটি তৈরি করতে হবে মোটামুটি শিশুর ইচ্ছাকে আমলে রেখে। তবে প্রতিদিন এই রুটিন পরিবর্তন করার সুযোগ দেওয়া যাবে না।
* মাঝেমধ্যে নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটতেই পারে, এটিকে স্বাভাবিকভাবে নিতে হবে এর জন্য শিশুর ওপর অযৌক্তিক রাগ করা চলবে না।
* কখনো যদি দেখা যায় শিশু অতিরিক্ত পরিমাণে অবাধ্য হয়ে যাচ্ছে, সামাজিক রীতিনীতির পরিপন্থী কাজ করছে তখন তাকে কেবল শাসন না করে সংশোধনের জন্য সুযোগ করে দিতে হবে, ‘কনডাক্ট ডিসঅর্ডার’ জাতীয় কোনো সমস্যায় সে ভুগছে কি না, তা নির্ণয় ও চিকিৎসার জন্য বিশেষজ্ঞের কাছে নেওয়া প্রয়োজন হতে পারে।
* নিয়মের ব্যতিক্রম থাকবে, থাকবে নিয়মের বেড়াজালও। কিন্তু বাবা-মাকে সব সময় মনে রাখতে হবে যে নিয়মকানুনগুলো যেন শিশুর শৈশবকে আচ্ছন্ন করে না ফেলে, নিয়মের ঘেরাটোপে তার বিকাশ যেন কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত না হয়।

আহমেদ হেলাল : সহকারী অধ্যাপক, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, ঢাকা।