
চলতি পথে হঠাৎ মনোযোগ কেড়ে নিল পথে দাঁড়িয়ে থাকা বইয়ের তাকটি। ফুটপাতের পাশে কাঠের ফ্রেমের ওপর লম্বাটে বড় প্লাস্টিকের একটি বাক্স বাঁধানো। আর তাতেই সাজিয়ে রাখা হয়েছে কিছু বই। আগ্রহ নিয়ে এগিয়ে গেলাম। বইগুলো নেড়েচেড়ে দেখব কি না ভাবছি। এরই মধ্যে হাস্যোজ্জ্বল এক তরুণী এগিয়ে এলেন। বললেন, ‘এটা পথের পাঠাগার। এখানে বসে বইগুলো পড়তে পারেন। চাইলে এককালীন বই নিয়েও যেতে পারেন। তবে বিনিময়ে এখানে একটি বই দিতে হবে।’
তরুণীর নাম নিশাত তাহিয়াত। তিনিই এই পথের পাঠাগারের উদ্যোক্তা। ছোট থেকেই বই পড়তে ভালোবাসেন। উপহার হিসেবেও মানুষকে বই দিতে পছন্দ করেন। তাঁর মতে, অনেক মানুষ আছেন, যাঁরা বই পড়তে ভালোবাসেন, তবে নিয়মিত বই কিনে পড়ার সামর্থ্য রাখেন না। আবার সামর্থ্য থাকলেও ঘটা করে পাঠাগারে যাওয়া, পাঠাগারের সদস্য হওয়া, নিয়মিত চাঁদা দেওয়া—এসব প্রক্রিয়া অনেকের কাছেই জটিল মনে হয়। তাই ঝামেলা এড়িয়ে সহজে আর বিনা মূল্যে মানুষকে বই পড়ার সুযোগ করে দেওয়ার জন্যই তাঁর এই উদ্যোগ।
নিশাত জানালেন, বেশ কিছুদিন আগে ইন্টারনেটে বিভিন্ন দেশের স্ট্রিট লাইব্রেরি বা পথের পাঠাগার সম্পর্কে জেনেছিলেন। সেখান থেকেই এই পাঠাগার চালু করার ভাবনা তাঁর মাথায় আসে। এরপর ঠিক করেন, শুরুটা নিজের এলাকা থেকেই হোক। পরদিন বাজার থেকে বানিয়ে নিলেন একটি কাঠের ফ্রেম। আর কিনলেন বড় একটি প্লাস্টিকের বাক্স। বোনকে সঙ্গে নিয়ে রং-তুলির আঁচড়ে রাঙিয়ে ফেললেন পাঠাগারের উপকরণ।
এরপর ২০ ডিসেম্বর বন্ধুদের সঙ্গে নিয়ে নিজের সংগ্রহে থাকা অল্প কিছু বই দিয়ে রাজধানীর উত্তরার ঈশা খাঁ অ্যাভিনিউতে পাঠাগারটি চালু করেন নিশাত। যদিও অনেকে নিশাতকে নিরুৎসাহিত করেছিলেন। নিশাত বলেন, ‘প্রথমে তো অনেকেই বলেছিল, বই চুরি হয়ে যাবে, এমনকি পুরো পাঠাগারই হয়তো মানুষ উঠিয়ে নিয়ে যাবে। তবে আমি ইতিবাচকভাবে ভাবার চেষ্টা করেছি। তাই মানুষকে বিশ্বাস করে এই পাঠাগার চালু করার সিদ্ধান্ত নিই।’
পাঠাগারটি চালুর পর থেকে এখন পর্যন্ত বই হারানোর কোনো ঘটনা ঘটেনি বলে জানালেন নিশাত তাহিয়াত। উল্টো আশপাশের মানুষ উৎসাহ দিয়েছেন। স্থানীয় দোকান কর্মচারী আদিল জায়ন বলেন, ‘এই লাইব্রেরি তো আমাদের দোকানের সামনেই, তাই আমরা দেখে রাখার চেষ্টা করি। দুপুরের দিকে কাস্টমার কম থাকে, তখন এখান থেকে বই নিয়ে পড়ি।’
অনেকেই নিজেদের সংগ্রহের বই পথের পাঠাগারে দিয়েছেন। নিশাত বলেন, পাঠাগারটি চালুর পর মানুষ খুব ভালোভাবে এটি গ্রহণ করেছে। জুনায়েদ ইসলাম নামের একজন তরুণ লেখক তাঁর নিজের বই এখানে দিয়েছেন। ঢাকার বাইরে থেকেও বেশ কয়েকজন পাঠাগারের জন্য বই পাঠাতে চেয়েছেন।
পাঠাগারটি চালুর পর পাঠাগারের ছবি নিশাত নিজের ফেসবুকে প্রোফাইল থেকে পোস্ট দেন। এরপর সেটি শতাধিক শেয়ার হয় ফেসবুকে। বইপ্রেমীদের ফেসবুকভিত্তিক গ্রুপগুলোতেওদারুণ সাড়া ফেলেছে এই পথের পাঠাগার। শিগগিরই উত্তরাসহ ঢাকার আরও কয়েকটি স্থানে এই পথের পাঠাগার চালু করতে চান নিশাত তাহিয়াত। তবে তাড়াহুড়া নেই, সময় আর প্রস্তুতি নিয়েই পরবর্তী পাঠাগারগুলো চালু করতে চান। যেন পাঠাগারগুলো টেকসই হয়, মানুষের উপকারে আসে।