
বিগত তিন–চার দশক ধরে বাংলাদেশে মানুষের সন্তান জন্মদানের হার ও শিশুমৃত্যুর হার ক্রমেই কমছে এবং গড় আয়ু বাড়ছে। এতে দেশের মোট জনসংখ্যায় বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বু্যরোর জরিপ অনুযায়ী, ২০১৩ সালেই দেশের মানুষের গড় আয়ু ৭০ বছর অতিক্রম করেছে, যা ২০০৯ সালে ছিল ৬৭.২ বছর। যেখানে ১৯৮০ ও ১৯৯০ সালে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু ছিল ৪৮ ও ৬০ বছর। বর্তমানে দেশের তরুণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা মোট জনসংখ্যার এক–তৃতীয়াংশের বেশি, কিন্তু আগামী তিন থেকে চার দশক পরে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা অনেকাংশে বৃদ্ধি পাবে। ফলে দেশটি জাপান এবং পশ্চিমা দেশগুলোর পথ অনুসরণ করে তরুণ জনসংখ্যার দেশ থেকে প্রবীণ মানুষের দেশে রূপান্তরিত হতে যাচ্ছে কি না, সেই প্রশ্ন উঠছে। বাংলাদেশে জনসংখ্যার বয়সকাঠামোয় এ ধরনের পরিবর্তন ঘটবে—বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধিতে এ রকমই ইঙ্গিত পাওয়া যায়। পশ্চিমা অনেক দেশে ইতিমধ্যে এ রকম পরিবর্তন ঘটে গেছে। ২০৬১ সালের মধ্যে বাংলাদেশে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা পাঁচ গুণ পর্যন্ত বাড়তে পারে। ২০১১ সালে যে সংখ্যাটি ছিল ১ কোটি ১২ লাখ, তা ২০৬১ সালে আনুমানিক ৫ কোটি ৫৭ লাখ হবে। এতে করে আমাদের জনসংখ্যার বয়স কাঠামোতে বড় ধরণের পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা রয়েছে, যার প্রভাব পড়বে আর্থ–সামাজিক জীবনে।
বাংলাদেশের জনসংখ্যার বয়সকাঠামোয় পরিবর্তনের প্রকৃত চিত্রের দিকে আরেকটু ভালোভাবে নজর দিলে মনে হবে, ব্যাপারটা আসলে ততটা উদ্বেগের নয়। বাংলাদেশের জনসংখ্যা নিয়ে যে অনুমানটা করা হয়, তাতে বর্তমান জনসংখ্যার সঙ্গে ২০৬১ সালের মধ্যে আরও ৫ কোটি ২০ লাখ মানুষ যোগ হবে।
বাংলাদেশে পরিবার পরিকল্পনা কর্মসূচি গত তিন দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে সফল হয়েছে। সন্তান জন্মদানের সামগ্রিক হার ১৯৭১-১৯৭৫ সালে ছিল নারীপ্রতি ৬ দশমিক ৩। ১৯৮৪-১৯৮৮ সালে সেই হার নারীপ্রতি ৫ দশমিক ১-এ নেমে আসে। পরবর্তী দশকে এই হার আরও দ্রুত কমে নারীপ্রতি ১ দশমিক ৮ হয়। তবে ১৯৯৪-১৯৯৬ সালে তা আবার বেড়ে নারীপ্রতি ৩ দশমিক ৩ হয়। সন্তান জন্মদানের এই হার নব্বইয়ের দশকজুড়ে প্রায় অপরিবর্তিত ছিল। পরে সামগ্রিক জন্মহারে অন্তত একটি শিশু কমে যায় এবং ২০১১ সাল থেকে তা নারীপ্রতি ২ দশমিক ৩টি সন্তানে স্থির হয়ে আছে।
জন্মনিয়ন্ত্রণ-সামগ্রীর ব্যবহারের উচ্চহার (সিপিআর) বাংলাদেশে সন্তান জন্মদানের সামগ্রিক হার হ্রাসের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রেখেছে। সব ধরনের গর্ভনিরোধকের ব্যবহার ১৯৭৫ সালে যেখানে ছিল ৭ দশমিক ৭ শতাংশ, তা বেড়ে ২০১৪ সালে ৬২ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছায়। আর আধুনিক জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির প্রাপ্যতার হার মোট সিপিআরের ৫৪ দশমিক ১ শতাংশ। আধুনিক পদ্ধতিগুলোর জন্য সিপিআর বৃদ্ধি পেয়েছে মূলত সাময়িক, দীর্ঘমেয়াদি এবং স্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন পদ্ধতি বেছে নেওয়ার সুবিধার কারণে।
আধুনিক পদ্ধতিগুলোর ব্যাপক প্রসার সত্ত্বেও এ ক্ষেত্রে একটি বিশৃঙ্খলা রয়ে গেছে। দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির (এলএপিএম) ব্যবহার কমে গেছে। এর পরিবর্তে স্বল্পমেয়াদি পদ্ধতির ব্যবহার যেমন—গর্ভনিরোধক বড়ি, ইনজেকশন, কনডম ইত্যাদির ব্যবহার বেড়েছে। তবে এগুলো ব্যবহারের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতার অভাব অত্যন্ত বেশি। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি তিন দম্পতির মধ্যে এক দম্পতি এক বছরের মধ্যে এসব পদ্ধতি ব্যবহারে ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন না।
বর্তমানে বিবাহিত দম্পতিদের ৮ শতাংশ দীর্ঘমেয়াদি এবং স্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহার করেন, যার মধ্যে রয়েছে আইইউডি, ইমপ্ল্যান্টস এবং পুরুষ ও নারীর বন্ধ্যত্বকরণ। গত কয়েক বছরে এ ধরনের পদ্ধতির ব্যবহার কমেছে এবং স্বল্পস্থায়ী ও অস্থায়ী জন্মবিরতিকরণ পদ্ধতিগুলোর ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। জন্মনিয়ন্ত্রণের স্থায়ী পদ্ধতি ব্যবহারে এই স্থবিরতা বাংলাদেশের সার্বিক সিপিআর এবং টিএফআরে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। তাই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সন্তান জন্মদানের নিম্নহার পরিলক্ষিত হয়নি।
‘সন্তান ধারণের বয়স’ বাংলাদেশে আরেকটি উদ্বেগের বিষয় । এখানে বাল্যবিবাহের হার অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় অনেক বেশি। তাই প্রথম সন্তান জন্মদানের ক্ষেত্রে নারীদের গড় বয়সও হয় খুব কম। অধিকাংশ নারী ২০-এর কোঠার মধ্য থেকে শেষ পর্যায়ে গর্ভধারণ করেন। ফলে পরবর্তী দুই থেকে তিন দশক পর্যন্ত এসব নারীকে গর্ভধারণ থেকে বিরত থাকার জন্য সুরক্ষা নিতে হয়। তাঁদের জন্য সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি হলো দীর্ঘমেয়াদি বা স্থায়ী জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি গ্রহণ করা। এতে তাঁরা অপ্রত্যাশিত গর্ভধারণ ও অনিরাপদ গর্ভপাত থেকে দূরে থাকতে পারবেন। এ জন্য নারীদের যৌন ও প্রজননস্বাস্থ্য সম্পর্কে আরও বেশি তথ্য পাওয়ার সুযোগ দিতে হবে। এতে তাঁরা বিভিন্ন পদ্ধতির মধ্য থেকে প্রয়োজনীয়টি বাছাই করে নিতে পারবেন।
এটা ঠিক যে বাংলাদেশে বয়সকাঠামো রাতারাতি পরিবর্তিত হবে না। এতে এখনো তুলনামূলক আগের এবং অধিকতর সন্তান জন্মদানের হারের প্রতিফলন ঘটছে। ২০৬১ সালের আগে জনসংখ্যার ভারসাম্য পরিবর্তনের প্রভাব ব্যাপকভাবে দেখা যাবে না। বর্তমান পরিপ্রেক্ষিতে তুলনামূলক কম সন্তান জন্মদান এবং তুলনামূলক দেরিতে সন্তান নেওয়ার ব্যাপারটি নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে, বিশেষ করে নারীদের জন্য।
পরিশেষে আশার বাণী হচ্ছে, বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যে জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা ২০১৩ প্রণয়ন করেছে এবং এটির বাস্তবায়নে কর্মসূচি গ্রহণ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
ইউএনএফপিএর একটি প্রতিবেদন থেকে অনুদিত