
বিদায় নিল অনেক কিছু,
কোনটা পরে কোনটা আগে
বয়স হচ্ছে বলেই বোধহয়
মাঝে মাঝে একলা লাগে
—কবীর সুমন
ঈদের ছুটি শেষ। সবার সঙ্গে আনন্দ-হুল্লোড়েরও পর্দা নামল। আবার সেই বাড়িতে একা থাকা। ছেলেমেয়েরা চলে যাবেন তাঁদের কর্মস্থলে। বাড়িতে শুধু মা। একা সময় তিনি কী করবেন বুঝে উঠতে পারেন না। মন খারাপ লাগে। একাকিত্বে ভোগেন তিনি।
আমার কাছে আসা একজন রোগী রাবেয়া খাতুন। বয়স সত্তরের ওপর, স্বামী থেকেও নেই-স্মৃতিভ্রম বা ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত। সারা দিন স্বজনহীন, বন্ধুহীন এই শহরে একা একা সময় কাটাতে চরম বিষণ্নতায় পেয়ে বসেছিল তাঁকে, এ জন্য চিকিৎসাও করাতে হয়েছে। গেল মাসে দেখি এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন তাঁর কথাবার্তায়। চোখ দুটো ঝলমল করছে রীতিমতো-‘জানেন? স্মার্টফোন আর কম্পিউটারের ব্যবহার শেখার পর, ফেসবুক আর স্কাইপ আয়ত্তে আসার পর নতুন এক দুনিয়া খুলে গেছে যেন। নাতি-নাতনি ও তাঁদের বন্ধুবান্ধব ছাড়াও বেশ কিছু বন্ধু হয়েছে এখন। তাঁদের নানা কথা পড়ি, ছবি দেখি। তা ছাড়া আমি নিজেও এখন লিখি। চলমান বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নিজের ভাবনাগুলো ফেসবুকে লিখে ফেলি। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে উত্তর আসে, কেউ লাইক দেয়, কেউ ভিন্ন মত প্রকাশ করে, তর্ক করে। স্পিরিটসায়েন্স নামের এক ব্লগ তো আমি নিয়মিতই পড়ি। নানা ইতিবাচক কথা লেখা হয় ওতে, আর আমিও লিখেছি এ রকম দু-একটা ব্লগে। জানেন, জীবনটাই পাল্টে গেছে।
তাঁর কথাগুলো শুনে আনন্দ লাগে। সত্যি, কতভাবেই না একজন মানুষ একাকিত্বের সঙ্গে বোঝাপড়া করে।
বনস্পতির ছায়া দিয়ে সারা জীবন
ব্যস্ততা, ছোটাছুটি, সংসার, সন্তান পালন, চাকরিবাকরি, সামাজিকতা-এক জীবনে এই ছুটন্ত ঘোড়ার পিঠে টগবগ করে ছোটার পর একসময় সব কেমন যেন ফুরিয়ে আসে। এখন আর সকাল-বিকেল অফিস নেই, সংসারে আর কাজ নেই, সন্তানেরা নিজ নিজ ঘোড়ায় চেপে বসেছেন, এখন অখণ্ড অবসর। এখন সঙ্গী সকালের এক কাপ চা আর বারবার পড়া পত্রিকাখানা, বিজ্ঞাপনে ভরা টেলিভিশনের সিরিয়াল বা নাটকগুলো, কিংবা সারা দিন টেলিফোনের দিকে অধীর আগ্রহে চেয়ে থাকা-কখন বাজবে রিং, আর কথা হবে ছেলেমেয়েদের সঙ্গে।
কিন্তু সত্যি কথা এই যে জীবন কখনো কাউকে খালি হাতে ফেরায় না। জীবনের প্রতিটি বাঁকে, প্রতিটি মোড়ে নতুন নতুন বিস্ময় আর নতুন নতুন আনন্দ লুকিয়ে আছে। খুঁজে নিতে পারলেই হলো! এই নিস্তরঙ্গ টিভি দেখার মাঝে একদিন ভাবতে বসুন না, একটা তালিকা করে ফেলুন না কী কী যেন করতে চেয়েছিলেন এই জনমে, সংসার আর অর্থের পেছনে ছুটতে গিয়ে ভুলে গেছেন। ফিরিয়ে আনুন পুরোনো কোনো স্বপ্ন বা সাধ, যা পূরণ করার সময় হয়নি এত দিন।
ভেবেছিলেন, একদিন সময় পেলে আবার দুই লাইন কবিতা লিখবেন, রবীন্দ্র রচনাবলী পুরোটাই আবার পড়ে ফেলবেন, ভাবতেন, আহা! সেই বলাকা সিনেমা হল থেকে ছবি দেখে রাতে বন্ধুদের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে ফেরার দিন আর কি ফিরে পাবেন? কেন পাবেন না?
আজকাল তো ঘরে বসেই অর্ডার দিয়ে আনিয়ে নিতে পারবেন নতুন-পুরোনো সব রকমের বই। পার্কে হাঁটার বয়স্ক সঙ্গীসাথি নিয়ে একদিন সিনেমা হলে চলে গেলেই বা ÿক্ষতি কী? জেনে নিন না শহরে এ মুহূর্তে কোথায় কী হচ্ছে, কোন সিনেমা, কোন নাটক কিংবা শিল্পকলায় কোনো নাচের অনুষ্ঠান। সেই কোন ছোট্টকালে নূপুর পায়ে নাচার শখ হয়েছিল—নাইবা হলো শেখা, উপভোগ করতে দোষ কী? সমমনা বন্ধুবান্ধব জোগাড় করে নিলেই হলো। পার্কে হাঁটতে গিয়ে বা পুরোনো বন্ধু বা সহকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে একটা বৃত্ত তৈরি করে নিতে পারেন সহজেই।
একসঙ্গে কোথাও ঘুরতে যাওয়া, মাঝে মাঝে কোথাও খেতে যাওয়া, এমনকি একটু বড় পরিকল্পনা করে ধারেকাছে কোনো রিসোর্টে ঘুরে আসা-এগুলো কোনো ব্যাপারই নয়। আজকাল শহরে অ্যাপার্টমেন্ট সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, আর বহুতল এসব ফ্ল্যাটে ইদানীং গড়ে উঠছে সমিতিও। এসব সমিতির কাজে যুক্ত হতে পারেন, অতি উৎসাহে নেতৃত্ব দিতে পারেন নববর্ষ বা ঈদ উদ্যাপনের অনুষ্ঠানগুলোতে। আপনার এক জীবনের অভিজ্ঞতা আর পরিপক্বতা অন্যদের কত সাহায্যে আসতে পারে, আপনার ধারণাই নেই সে সম্পর্কে। পুরোনো কোনো বন্ধুকে বাড়িতে এনেও অহেতুক চা খেতে খেতে আড্ডা দিতে পারেন। সবকিছু প্রয়োজনেই করতে হবে, তা তো নয়। নিজের ভালো লাগাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
দুঃখ যেন দেখতে পায় আমি সুখে আছি
বিদেশে বয়স্ক মানুষেরা নানা ধরনের কল্যাণ বা স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে নিজেদের যুক্ত করে থাকেন। কেউ হাসপাতালে একাকী রোগীর কাছে গিয়ে বসেন, কেউ অনাথ শিশুদের পড়ানোর দায়িত্ব নেন। অথচ আমরা আমাদের অভিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞ বয়স্কজনদেরও কর্মহীন বসে থাকতে উৎসাহ দিই—বলছিলেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক ফারজানা রহমান। তিনি বললেন, ‘অথচ কত সুন্দর আর উৎপাদনশীল উপায়েই না এই অবসর বা সময়টুকু ব্যয় করা যায়। যে ছোট গৃহকর্মীটি দিনমান আপনার সেবা করে, সন্ধ্যার পর তাকে নিয়ে একটু পড়তে বসা যায়। যে দূরের দরিদ্র স্বজনদের খোঁজ এত দিন নিতে পারেননি, এখন তাদের সঙ্গে আবার একটা সেতু তৈরি করে নেওয়া যায়।’ আজকাল অনেক বয়স্কজনের হাতেই অর্থকড়ি থাকে, সন্তানেরা দেয় নিয়মিত-খানিকটা এই দরিদ্র স্বজনদের উপকারে ব্যয় করলেই বা কী? কোনো সংগঠন বা সমিতির সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করে নিতে পারেন, কোনো জনহিতকর কাজে নিয়োজিত-দেখা যাবে জীবনের এক নতুন মানে খুঁজে পাচ্ছেন।
শরীরের যত্ন নেওয়াটা জরুরি, তাই একটু হাঁটতে যাওয়া, ব্যায়াম করতে যাওয়া, নিয়মিত চেকআপ আর অন্যান্য বয়স্ক ব্যক্তির সঙ্গে নিজের বিষয়গুলো শেয়ার করা-বিষয়গুলো ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। হয়তো দেখবেন অন্যদের তুলনায় আপনি কতই না ভালো আছেন! এই ঊর্ধ্বশ্বাস ছুটে চলার সময়ে সন্তান বা স্বজনেরা কতটাই বা সময় দিতে পারবে-সেই বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে নিজের মতো করে বাঁচার চেষ্টা করা যাক না কেন! বুড়ো হয়ে যাওয়া মানে যে কেবল হা-পিত্যেশ আর দীর্ঘশ্বাস নয়, বুড়িয়ে যাওয়া মানে যে ফুরিয়ে যাওয়া নয়-এটা দেখিয়ে দিতে পারেন আপনি কেবল নিজের দৃষ্টিভঙ্গিটা পাল্টে দিয়ে। এ জীবন, জয়শ্রী জীবন-হার মেনে নেবার নয়। আপনিও হার মেনে নেবেন না নিশ্চয়।