মিউ মিউ মেলা!

ঢাকায় ১৩ ও ১৪ নভেম্বর আয়োজন করা হয় ব্যতিক্রমধর্মী এক ক্যাট শো। বিস্তারিত জানাচ্ছেন নাদিয়া মাহমুদ

এমন মিষ্টি বিড়ালকে ভালো না বেসে পারা যায়? ছবি: আশরাফুল আলম
এমন মিষ্টি বিড়ালকে ভালো না বেসে পারা যায়? ছবি: আশরাফুল আলম

তিতলীকে কোলে নিয়ে জারা হক মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করছিলেন। কিন্তু আদর পেয়ে বোধ হয় মন ভরছিল না, নিচে নামার জন্য কেবল উসখুস করছিল সে। ওর বয়স কত? জারা জানালেন তিতলী এবার সাতে পা দিয়েছে। মজা করে জানতে চাওয়া হলো, ‘স্কুলে ভর্তি করিয়েছেন ওকে’? জারা উত্তর দেয়ার আগেই তিতলী কী বুঝে যেন মিউ মিউ করে উঠল। বোঝা গেল, তিতলীর মতো এখানকার সব বিড়ালই এমন স্মার্ট। তা না হলে কি আর ‘ক্যাট শো’তে অংশগ্রহণ করে!

বিড়াল ছিল নানা জাতের

ঢাকার প্রেসক্লাব প্রাঙ্গণে ১৩ ও ১৪ নভেম্বর আয়োজন করা হয় ব্যতিক্রমধর্মী এই বিড়াল প্রদর্শনী। সেখানেই দেখা হয়ে গেল আয়োজকদের একজন জারা হক এবং তাঁর পোষা বিড়াল তিতলীর সঙ্গে। এই বিড়াল প্রদর্শনীতে অংশ নেয় ২৫ প্রজাতির প্রায় ১৫০টি বিড়াল। কোনো বিড়ালের গলায় বেল্ট বাঁধা, তো কোনোটার গলায় বো। স্নো, স্নোয়ী, এলি আর ওরিও নামের চার বিড়ালকে নিয়ে সেখানে হাজির হয়েছিলেন বিড়ালপ্রেমী বুশরা। এদের মধ্য থেকে দুটি বিড়ালকে তিনি যুক্তরাজ্য থেকে এক লাখ ১২ হাজার টাকা দিয়ে আনিয়েছেন শুনে রীতিমতো আক্কেলগুড়ুম। এই না হলে বিড়ালপ্রেমী! বিড়ালগুলোকে নিজের সন্তানের মতোই আদর করতে দেখা গেল তাঁকে। শুধু তিনিই নন, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা বিড়ালপ্রেমীদের প্রত্যেকের কাছেই যেন পোষা বিড়ালটা সন্তানের মতো। এক বিড়ালছানার নখের আঁচড় খেয়েও দর্শনার্থী লুতফা ফওজিয়াকে দিব্যি আনন্দে ঘুরতে দেখা গেল। প্রতিটি খাঁচার বিড়ালকে আদর করতে পেরেই নাকি তাঁর এই আনন্দ।

এমন সব বিড়ালপ্রেমী ভিড় করেছিলেন মেলায়

মঞ্চে তখন দেখা গেল বিড়ালের সঙ্গে ছবি তোলার ধুম। সেলফি তুলতেও বাদ রাখছেন না কেউ কেউ। প্রদর্শনীর অন্যতম আয়োজক ইমরান হোসেন জানালেন, তাঁদের এই ভিন্নধর্মী উদ্যোগের উদ্দেশ্য হলো অবহেলিত, অসহায় ও অসুস্থ বিড়ালদের শুশ্রূষা নিশ্চিত করা ও সবার মধ্যে বিড়াল সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো। পথেঘাটে অযত্নে পড়ে থাকা বিড়ালকে তারা তুলে নিয়ে অন্য বিড়ালপ্রেমীদের মধ্যে দত্তক দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। এ কাজ তাঁরা করেন সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে। ফেসবুকে তাঁদের ‘ক্যাট কনসার্ন অ্যাসোসিয়েসন অব বাংলাদেশ’ গ্রুপের সদস্য সংখ্যা এক হাজার ছাড়িয়ে গেছে। সম্প্রতি সরকারের কাছ থেকে অনুমোদন পাওয়া তাঁদের গ্রুপে বর্তমানে তালিকাভুক্ত সদস্য মোট ৮০ জন। ইমরান হোসেন, ফারহান হাবিব, আরসাদ অনিক, জারা হক এবং নাজিয়া জেরিন এই গ্রুপটির এডমিন। তাঁরাই এই ‘ক্যাট শো’-এর মূল আয়োজক। এত প্রাণী থাকতে বিড়াল নিয়েই মনোযোগী হলেন কেন? জানতে চাইলে নাজিয়া জেরিন বলেন, ‘আমাদের দেশে কুকুর ও পাখিদের নিয়ে সচেতনতা তৈরি হলেও এর আগে কখনো বিড়াল নিয়ে এভাবে ভাবা হয়নি। অথচ এদেরও চাইলে ঘরের সদস্যের মতোই লালন-পালন করা যায়। চাই শুধু একটু আদরযত্ন।’ এই অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে তারা সবাইকে এ কথাই জানান দিতে চেয়েছেন।
বিড়ালদের চিকিৎসা এবং সঠিক সময় টিকা দান নিশ্চিত করতেও এই দলটি বিভিন্ন ভূমিকা রাখছে। প্রতিবছর অন্তত একবার বিড়ালদের নিয়ে এ রকম একটি অনুষ্ঠান করার ইচ্ছা আছে তাঁদের। ভবিষ্যতে অবহেলিত এবং বেওয়ারিশ বিড়ালদের জন্য বিড়াল পুনর্বাসনকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করার স্বপ্নের কথাও জানালেন নাজিয়া। প্রদর্শনীর শেষ দিনে বিড়ালদের বিনা মূল্যে টিকা দেওয়া হয়। এ ছাড়া বিড়াল পালকদের নিয়ে একটি প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছিল সেদিন। তিনজন বিজয়ীর হাতে তুলে দেওয়া হয় তিনটি বিড়াল। বিড়ালদের জন্য সেখানে ছিল রং-বেরঙের পোশাক ও খাবার।

সচেতনতাও তৈরি হচ্ছে
সাগীর উদ্দীন আহমেদ

ক্যাট শো, ডগ শো—এগুলো বাইরের দেশেও হয়। আমাদের দেশে প্রচলন শুরু হয়েছে। অল্পবয়সী কিছু ছেলেমেয়ে মিলে ক্যাট শো আয়োজন করেছে, অবশ্যই তাঁদের উৎসাহ দেওয়া উচিত। এর মাধ্যমে অনেক বিড়ালপ্রেমী একসঙ্গে হতে পারছেন, তাঁরা বিভিন্ন বিষয়ে জানতে পারছেন। একটা সচেতনতাও তৈরি হচ্ছে। তবে আমার মনে হয়, বাইরের দেশের মতো কিছু নিয়মকানুন মেনে এ ধরনের শো করা উচিত। যেমন এবারের শোতে বিড়ালগুলো খাঁচায় ছিল, যেটা ঠিক হয়নি। বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার জন্য এবার হয়তো সব নিয়ম মানা সম্ভব হয়নি। তবু শুরু যে হয়েছে, সেটাই বড় কথা। সামনে নিশ্চয়ই আরও ভালো হবে।

লেখক: পশুচিকিৎসক