
ইনাম আহমদ চৌধুরী
সাবেক সচিব, রাজনীতিক ও লেখক
সময়টা চল্লিশের দশকের মাঝামাঝি। ব্রিটিশ রাজত্বের অন্তিমকাল। তখন দেশপ্রেমমূলক একটা চলচ্চিত্র মনে দাগ কেটেছিল। যত দূর মনে পড়ে, এটাই আমার দেখা প্রথম চলচ্চিত্র, কিসমত। শিলং শহরের একটি সিনেমা হলে দেখেছিলাম। ছবিটিতে অশোক কুমার ও মমতাজ শান্তি অভিনয় করেছিলেন। মমতাজ শান্তির বোন মিসেস কিদোয়াইদের সঙ্গে আমাদের পরিবারের যোগাযোগ ছিল। এই সিনেমাটি মিসেস কিদোয়াইসহ আমরা পুরো পরিবার একসঙ্গে দেখেছিলাম। সে সময়ের খুব জনপ্রিয় সিনেমা এটি। একটা লাইন এখনো বেশ মনে আছে। ‘যাহা হামারে মন্দির, মসজিদ, শিখোকা গুরুদয়ালা হ্যায়। দূর হাটো ভাই দুনিয়াওয়ালে...।’ ছবিটায় দেশপ্রেম দেখানো হয়েছিল চমৎকারভাবে।
সে সময় অবসর বিনোদনের একমাত্র সঙ্গীই ছিল সিনেমা।
বাবার ছিল বদলির চাকরি। তাই জেলা শহরের বিভিন্ন সিনেমা হলে ছবি দেখার অভিজ্ঞতা হয়েছে। মনে আছে, ১৯৫১ সালে ময়মনসিংহের ছায়াবাণী সিনেমা হলে বসে দেখেছিলাম শেষউত্তর। সে সময় গোয়েন্দা-কাহিনি খুব ভালো লাগত। তাই মঞ্জু দে আর বিকাশ রায় অভিনীত জিঘাংসা ছবিটিও মুগ্ধ করেছিল। পরপর দুইবার দেখেছিলাম।
আসলে এটা আমার একটা বাতিক বলতে পারেন! যে সিনেমাটা খুব ভালো লাগে সেটা বেশ কয়েকবার দেখে ফেলি। আনাকারেনিনা সিনেমাটি এতই ভালো লেগেছে যে এটা আটবার দেখেছিলাম।
কিছু সিনেমা আজও অতীতের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। যেমন: কংগন, উদয়েরপথে, শিরিফরহাদ, আওয়ারা, আন্দাজ, সংসার, পদ্মিনী, জাল ও বাবলা। তখনকার বিকল্পধারার সিনেমা বাবলা। এক কিশোরের বেড়ে ওঠা নিয়ে সিনেমার কাহিনি। জহর গাঙ্গুলি এতে দারুণ অভিনয় করেছিলেন, এখনো চোখে লেগে আছে!
মুগ্ধ হয়েছিলাম সমাজসংস্কারমূলক সিনেমা হামলোগ দেখে। ‘জিস দিলমে তেল নেহি, উসকে জ্বালনেকা কেয়া অধিকার...।’ এখনো গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে ডায়ালগটা মনে পড়লে! মধুবালার সব ছবিই খুব ভালো লাগত। এর মধ্যে মহাল সিনেমাটি বেশ চমৎকার! উত্তম কুমার অভিনীত ছবি বসুপরিবারখুব ভালো লেগেছিল। প্রিয় সিনেমার তালিকায় আরও আছে মেজদিদি, পথেরপাঁচালীআর সহযাত্রী।
এবার বলি প্রথম দেখা রঙিন ছবির কথা। সিনেমার নাম আন। দেখেছিলাম নিশা সিনেমা হলে। সে এক অদ্ভুত অনুভূতি! সিনেমার এই বিবর্তন সেদিন আমাকে খুব আলোড়িত করেছিল। প্রথমে নির্বাক, তারপর স্ববাক, তারও পর আবার রঙিন! কী দারুণ এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন। আর একটা কথা মনে আছে। কত কম টাকায় সিনেমা দেখতে পেতাম। চার আনা, ছয় আনা, আট আনা বা এক টাকায় একটা পুরো ছবি! ভাবা যায়!
সিনেমা দেখা নিয়ে বাড়িতে তেমন কোনো নিষেধ ছিল না। তাই স্কুলজীবনে অসংখ্য ছবি দেখেছি। খানিকটা মুশকিলে পড়ে গিয়েছিলাম কলেজে পড়ার সময়। তখন মিশন হোস্টেলে থাকতাম। সুপারিনটেনডেন্ট খুব কড়া ছিলেন। সেখানে নিয়ম ছিল রাত ১০টার পর সব ঘরের বাতি নিভে যাবে। কেউ বাইরে থাকবে না। এদিকে আমাদের সিনেমা দেখার ঝোঁক! কী করি! সদর ঘাটে তখন রূপমহল সিনেমা হল ছিল। সেখানে সেকেন্ড শো দেখতে যেতাম। তখন একটা বুদ্ধি বের করেছিলাম। আমরা বিছানায় বালিশ বিছিয়ে তার ওপরে চাদর দিয়ে ঢেকে রাখতাম। আর দরজার ছিটকিনিটা একটা দড়ির সঙ্গে বেঁধে রেখে যেতাম। যাতে স্যার ঘরের আংশিক দেখতে পান। পুরো ঘর যাতে না খোলা যায়। তখন বন্ধু এনায়েতউল্লাহ, জাফর আর আমি মিলে অনেক ছবি দেখেছি। মনে আছে সে সময় বিট্রানিয়া, মায়া, গুলিস্তান, নাজ সিনেমা হলে ইংরেজি সিনেমা দেখানো হতো। সেখানেও অনেক ইংরেজি সিনেমা দেখেছিলাম।
চলচ্চিত্র জগতের দুজনের কথা বলতে পারি, যারা আমার বন্ধু ছিল। আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের বন্ধু জহরত আরা মুখওমুখোশচলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন। চিত্রনির্মাতা জহির রায়হানও ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন।
এখন বয়স বেড়েছে। অবসর তেমন পাই না। আর সেই কলেজ দিনের মতো পালিয়ে সিনেমা দেখার বয়সও নেই। বাড়িতে বসেই দেখি। কয়েক দিন আগে দেখলাম টুয়েলভইয়ারসঅ্যাস্লেভ। তারেক মাসুদ আর ক্যাথরিন মাসুদের অন্তর্যাত্রা ছবিটিও খুব ভালো লেগেছে। ভালো লেগেছে মনপুরা। এই চলচ্চিত্রটি সিনেমা হলে বসে পরিবারের সবাইকে নিয়ে দেখেছি।
অনুলিখন: সুচিত্রা সরকার