>

আর্চারি। তির–ধনুকের এই খেলাটি বাংলাদেশে খুব একটা জনপ্রিয় নয়। তারপরও আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় তির ছুড়ে লক্ষ্যভেদ করে সোনা জিতলেন বাংলাদেশের হীরা মনি। বন্যা আক্তার পেলেন রুপা। দলগত সোনার পদকও এল কয়েকটা। অথচ আর্চারিতে তাঁদের নতুনই বলা যায়। তির–ধনুকের খেলায় এই সফলতা এবং আরও কিছু টুকরো গল্প নিয়ে এবারের প্রচ্ছদ প্রতিবেদন।
বছর দুয়েক আগেও জানতেন না কীভাবে তির-ধনুক চালাতে হয়। ফরিদপুর শহরেই টুকটাক ফুটবল ও কাবাডি খেলতেন। খেলাটা রক্তের সঙ্গে এতখানি মিশে গিয়েছিল যে স্কুলে যেতেও ইচ্ছা করত না বন্যা আক্তারের। খেলার জন্য কিছুদিন পড়াশোনাও ছেড়ে দিয়েছিলেন। খেলাপাগল এই মেয়েকেই এলাকার ‘চুন্নু স্যার’ একদিন নিয়ে এলেন আর্চারির ট্রায়ালে। হাতের নিশানা আর দৃষ্টিশক্তির প্রখরতা দেখেই কোচ বুঝে গিয়েছিলেন, ‘হীরা’ চিনতে ভুল করেননি। ঢাকায় গত সপ্তাহে শেষ হওয়া আন্তর্জাতিক সলিডারিটি আর্চারিতে সেই মেয়েটিই জিতলেন রুপা।
এই টুর্নামেন্টের আরেক ‘হীরের টুকরো’, নামেও হীরা। বড় বোন শখ করে নাম রেখেছিলেন হীরা। কিন্তু অসচ্ছল পরিবারে হীরা আদৌ জ্বলবে কি না, তা হয়তো জানত না কেউ। আন্তর্জাতিক আর্চারিতে এবার ‘হীরা’ এমনভাবেই চকমক করে জ্বলে উঠল, যেন তার আলোয় আলোকিত হয়ে উঠল পুরো দেশ। রাজধানীর মাওলানা ভাসানী স্টেডিয়ামে রিকার্ভ বো ইভেন্টের মহিলা এককে বাংলাদেশের প্রথম সোনা জিতলেন ঠাকুরগাঁওয়ের এই তরুণী—হীরা মণি।
হীরা আর বন্যাদের গল্পটা একই সূত্রে গাঁথা। বাবার সংসারে টানাটানি। এরপর মেয়েরাই খেলাধুলা করে আলো জ্বালেন ঘরে। বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় পদক জেতেন, বাড়িতে বয়ে চলে খুশির বন্যা। পাশাপাশি সার্ভিসেস সংস্থা আর ফেডারেশন থেকে পাওয়া আর্থিক পুরস্কারে কিছুটা হলেও সংসারের অভাব ঘোচে।
বন্যার জন্য এই টুর্নামেন্টটা স্মরণীয়ই বলতে হবে। দুই বছর বিভিন্ন ঘরোয়া টুর্নামেন্টে খেলার পর প্রথম ডাক পেলেন জাতীয় দলে। প্রথম আন্তর্জাতিক গেমসে খেলতে নেমেই জিতলেন রুপা। যদিও কম্পাউন্ডের মহিলা এককে ইরাকের অভিজ্ঞ তিরন্দাজ ফাতিমা মাসাদানির কাছে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে হেরে যান বাংলাদেশ আনসারের মেয়ে বন্যা। ফাইনালে ফাতিমা মেরেছিলেন ১৩৫ পয়েন্ট স্কোর। বন্যার ১৩৩।
আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার অভিজ্ঞতা একদমই ছিল না বন্যার। তারপরও এত দূর আসতে পেরে সন্তুষ্ট, ‘আসলে সোনার পদক আমার ভাগ্যে ছিল না। তবু চেষ্টা করেছি। এখানে রুপা জিতেছি, এটাই আমার কাছে অনেক বড় কিছু।’
গত বছর ঘরোয়া প্রতিযোগিতায় ইনডোর গেমসে কম্পাউন্ডে জেতেন ব্যক্তিগত ইভেন্টে রুপা। জাতীয় প্রতিযোগিতায় আনসারের হয়ে জেতেন দলগত ব্রোঞ্জ। এরপর বিকেএসপি কাপে কম্পাউন্ডে ব্যক্তিগত সোনা, মিশ্র দলগত ও দলগত ইভেন্টে ছিল রুপা। মাত্র দুই বছরেই বন্যার শোকেসে এত্তগুলো পদক!
ফরিদপুরের বটতলায় ছোট একটি মুদি দোকান রয়েছে বন্যার বাবার। তা দিয়েই কোনো রকমে টেনেটুনে চলে বন্যাদের চার ভাইবোনের সংসার। আনসারে এখনো স্থায়ী চাকরি হয়নি বন্যার। মাত্র ৬ হাজার টাকা মাসিক ভাতা পান। আনসারে স্থায়ী হলে রেশন দেওয়া হয়, কিন্তু অস্থায়ী চাকুরে হওয়ায় সেই সুবিধাও পান না বন্যা। যদিও আর্চারির রুপা জয়ের পরে আশায় বুক বেঁধে আছেন, ‘শুনেছি স্যারেরা আমাকে কিছু আর্থিক পুরস্কার দেবেন। আনসারের হয়ে পদক জিতলে এটা সবাই পায়। তবে চাকরিটা স্থায়ী হলেই বেশি খুশি হব।’
খুশির বন্যা বয়ে চলেছে হীরার পরিবারেও। আন্তর্জাতিক আসরে পঞ্চমবারের মতো অংশ নিয়ে প্রথম সোনা জিতলেন হীরা। ২০১০ সালে তাঁকে বিকেএসপির পথ চিনিয়েছিলেন চাচাতো ভাই মির্জা কাউসার। বিকেএসপির সাবেক ক্রিকেটার সেদিন আর্চারিতে ভর্তি হওয়ার বুদ্ধি দিয়েছিলেন। মোটেও ভুল পরামর্শ দেননি বড় ভাই। সোনাজয়ের পর হীরার চোখে-মুখে ছিল উচ্ছ্বাসের জোয়ার। ছিল দেশের পতাকা ওপরে তুলে ধরার গর্ব, ‘আমার খুবই ভালো লাগছে। দেশের জন্য কিছু একটা করতে পেরেছি, এতেই খুশি।’
বাংলাদেশে আর্চারি সেই অর্থে মোটেও জনপ্রিয় খেলা নয়। কিন্তু এই আর্চারিতেই এবার ৯টি ইভেন্টের ৬টিতে সোনা জিতেছে বাংলাদেশ। ব্যক্তিগত আর দলীয় ইভেন্টে এভাবে সাফল্য পেয়ে তিরন্দাজদের যেন নতুন স্বপ্নযাত্রা শুরু হলো। এমন ‘হীরের টুকরো’ ছেলেমেয়েরা স্বপ্ন দেখেন একদিন অলিম্পিকে খেলার। স্বপ্ন দেখেন লাল-সবুজের পতাকা মাথার ওপরে ওড়ানোর।
দুই বান্ধবী
ঢাকায় আন্তর্জাতিক আর্চারি খেলতে এসেছিলেন ভুটানের মেয়ে কারমা। বাংলাদেশের তিরন্দাজ শ্যামলী রায়ের সঙ্গে কারমার বন্ধুত্ব অনেক দিনের। অনুশীলন করলেন একসঙ্গে। অনুশীলনের ফাঁকে দুই বান্ধবী এমনভাবে গল্প করছিলেন, যেন কত দিনের জমানো কথা বলছেন! কারমার সঙ্গে শ্যামলীর প্রথম দেখা বছর তিনেক আগে হংকংয়ে এশিয়ান আর্চারিতে। এরপর ব্রাজিলের রিও অলিম্পিকে দুজনেই ছিলেন একই ভবনে। একই হোটেলে ছিলেন ভারতে হওয়া সর্বশেষ এসএ গেমসেও। কারমা ঢাকায় খেলতে আসায় ভীষণ খুশি শ্যামলী। বান্ধবীকে উপহার দিয়েছেন, পাশে বসিয়ে খাইয়েছেন পদ্মার ইলিশ মাছ।
ভুল করে আর্চারিতে
তির-ধনুকের খেলা কেমন লাগে? প্রশ্নটা করতেই আজারবাইজানের আর্চার সুগোখানিম আবিদোভার অবাক করা উত্তর, ‘আমি আসলে শুটার হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু স্পোর্টস একাডেমির স্যার ভুল করে আর্চারিতে পাঠিয়ে দেন আমার নাম। আমি ভুল করে আর্চার হয়ে গেছি।’ বলেই হাসিতে ফেটে পড়লেন। তবে ভুল করে এলেও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় নিয়মিতই পদক জিতছেন আবিদোভা। আজারবাইজানের মেয়েরা এবার ঢাকায়ও জিতেছেন ১টি রুপা ও ১টি ব্রোঞ্জ।
পুরো পরিবারই আর্চার!
আত্মরক্ষার প্রয়োজনে হয়তো ইরাকিরা অস্ত্র রাখেন সঙ্গে। কিন্তু ফাতিমা মাশদানি রাখেন তির-ধনুক। তবে সেটা নিজেকে বাঁচাতে নয়। খেলার জন্যই তির-ধনুক বেছে নিয়েছেন। ঢাকায় এবার খেলতে এসেছে ফাতিমাদের পুরো পরিবার। ফাতিমার সঙ্গে এসেছেন বাবা সাদ আল মাশদানি, যিনি ইরাকের আর্চারি ফেডারেশনের সভাপতি। ফাতিমার মা জাতীয় দলের কোচ, তিনিও এসেছেন। শুধু তা-ই নয়, ফাতিমার ছোট ভাই আবদুল্লাহ ও বোন রাদ মাশদানি আর্চারি খেলেন। নিয়মিত আর্চারি খেলছেন বোনের জামাই ইশাক রাহিম!