কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ

লালনের শহরে

কলেজের সব খবরাখবর পাওয়া যায় অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল অ্যাপস ও ওয়েবসাইটের মাধ্যমে। ছবি: তৌহিদী হাসান
কলেজের সব খবরাখবর পাওয়া যায় অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল অ্যাপস ও ওয়েবসাইটের মাধ্যমে। ছবি: তৌহিদী হাসান

শহরের মাঝখানে মীর মশাররফ হোসেন সড়ক। চওড়া এই সড়কের দক্ষিণ পাশে শিক্ষার আলো জ্বেলে দাঁড়িয়ে আছে দক্ষিণাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ। সড়কঘেঁষা প্রধান ফটকে লোহার চেইন দিয়ে তালা লাগানো। তাতে ছোট্ট একটা সাইনবোর্ডে। লেখা আছে, ‘কলেজ চলাকালীন যান্ত্রিক যানবাহন ভেতরে চলা নিষেধ।’ ‘পকেট দরজা’ দিয়েই শিক্ষক, কর্মী ও ছাত্রছাত্রীদের ভেতরে পা রাখতে হয়। গাছগাছালি ও সবুজ ঘাসের চত্বরে হেঁটে বেড়ানোর আনন্দটাও অন্য রকম।

লাইব্রেরিতে নিরিবিলি সময় কাটে শিক্ষার্থীদের

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মীর মশাররফ হোসেন, কাজী মোতাহার হোসেন, কাঙাল হরিনাথ মজুমদার, বাঘা যতীন, কবি আজিজুর রহমানসহ বহু প্রতিভাধর মানুষের পা পড়েছে এই শহরে। অবিভক্ত বাংলার সাবেক মন্ত্রী মৌলভি শামসউদ্দিন আহমদ ১৯৪৭ সালে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন।
বর্তমানে এ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ২৪ হাজার। কলেজে ১৯টি বিভাগের মধ্যে ১৭টি বিভাগে স্নাতকোত্তর চালু রয়েছে। এ ছাড়া উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের জন্যও বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষায় কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের সুনাম আছে। ১২৩ জন শিক্ষক নিয়মিত ক্লাস নিচ্ছেন।
কলেজ প্রাঙ্গণের ভেতরেই বিশাল মাঠ। সেখানে প্রতিদিন কলেজের শিক্ষার্থীরা ছাড়াও বিকেলে এলাকার ছেলেরা খেলাধুলা করে। গরমের দিনে একটু শীতল হাওয়া পেতে মাঠে বসে থাকে কত লোক!
কলেজে একটি আধুনিক মিলনায়তন আছে। সেখানে বিভিন্ন জাতীয় দিবসে আলোচনার পাশাপাশি প্রজেক্টরে নানা দিক তুলে ধরা হয়। কয়েকটি বিভাগে পাঠদানের জন্য মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর আছে। এ ব্যাপারে শিক্ষার্থীদের সাহায্য করছেন পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী ও আইসিটি শিক্ষক লাল মোহাম্মদ।
অর্থনীতি বিভাগের সহকারী শিক্ষক শাহেদ আহমেদ বললেন, ‘শিক্ষকদের টেবিলে কম্পিউটার রাখা হয়েছে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে অন্য কলেজের শিক্ষকদের সঙ্গে আমরা সহজে যোগাযোগ করতে পারি। বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করা সহজ হয়।’
এ ছাড়া মসজিদ, পুকুর, শিক্ষক লাউঞ্জ, কম্পিউটার ল্যাব, সাইকেলস্ট্যান্ড, থিয়েটার, ডিবেটিং ক্লাব তো আছেই। কলেজের বিএনসিসি, রোভার, রেঞ্জার, রেড ক্রিসেন্ট সদস্যদের অংশগ্রহণ ও কার্যক্রম রয়েছে সক্রিয়ভাবে। আছে দোতলা পাঠাগার। সেখানে ছাত্রছাত্রীরা নিয়মিত বসেন। বই পড়েন। ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ের প্রায় ২৯ হাজার ৬৬১টি বই আছে পাঠাগারে। বিদেশি লেখকদের বই আরও বেশি থাকলে ভালো হতো—বলছিলেন এক পাঠক, কলেজের ছাত্রী নাসরিন বিনতে করিম।

রেডিওতলায় আড্ডা জমে শিক্ষার্থীদের

জানা গেল, ছেলেদের জন্য ১২০ আসনের একটিমাত্র হোস্টেল। ৫০ আসনের বিপরীতে বেগম খালেদা জিয়া ছাত্রীনিবাসে শতাধিক ছাত্রী থাকেন। ছাত্রীদের জন্য ১৫০ আসনের শেখ হাসিনা ছাত্রীনিবাস নির্মাণ করা হয়েছে। শিগগিরই উদ্বোধন করা হবে। কলেজের ভেতরে আছে প্রচুর গাছ। পুরো ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের বসার জন্য স্থায়ী বেঞ্চ করা রয়েছে।
নিজস্ব অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল অ্যাপস
কলেজের শিক্ষকেরা জানালেন, শিক্ষকদের মধ্যে দুটি মনিটরিং দল রয়েছে। তারা নিয়মিত ক্যাম্পাসে তদারকি করে। অযথা কেউ ক্লাস ফাঁকি দিয়ে বসে আছে কি না। শিক্ষকেরা ঠিকমতো ক্লাস নিচ্ছেন কি না, সেটারও খোঁজ রাখা হয়। ‘কেজিসি’ নামে কলেজে একটি মোবাইল অ্যাপস চালু করা হয়েছে; যাতে খুব সহজে যেকোনো শিক্ষকের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়। এই অ্যাপসে কলেজের যাবতীয় তথ্য দেওয়া আছে। আছে নিজস্ব ওয়েবসাইট। সেখানে শিক্ষার্থীদের যাবতীয় তথ্য এবং তাদের পরীক্ষার ফলাফল তুলে ধরা হয়, যাতে অভিভাবকেরা যেকোনো সময় দেখতে পারেন। মুঠোফোনে খুদে বার্তার মাধ্যমেও বিভিন্ন তথ্য জানিয়ে দেওয়া হয়। রয়েছে কলেজের নামে ফেসবুক পাতা। সংস্কৃতি বিষয়ে জোর দিতে কলেজে সম্প্রতি সংগীত বিভাগ খোলা হয়েছে। আশপাশের আর দশটি কলেজের তুলনায় ফল ভালো। আগের চেয়ে সম্মান শ্রেণিতে প্রথম শ্রেণি পাওয়ার হার বেড়েছে।

একদিন কলেজে
গত মঙ্গলবার কলেজে প্রবেশ করতেই শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে দেখা মিলল কলেজের গণিত বিভাগের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী সালমান আহমেদ, সালমা খাতুন, চামেলী আকতার, রেজওয়ান আলম ও মেহেদী হাসানের সঙ্গে।
সালমান বললেন, অনেক স্বপ্ন ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ না হওয়ায় পরে কলেজে ভর্তি হন। তাঁর বিশ্বাস, স্বপ্ন সামনে রেখে মনে সাহস থাকলে যেকোনো জায়গা থেকেই নিজেকে গড়ে তোলা যায়। এখানে এসে খুব সহজেই বন্ধু মিলে গেছে, তাদের সঙ্গে পড়াশোনার সমস্যাগুলো ভাগাভাগি করা যাচ্ছে।
শহীদ মিনারের সামনেই গাছগাছালি ঘেরা সবুজ চত্বরটির নাম রেডিওতলা। সেখানে এক জটলা। ক্লাসের ফাঁকে ছেলেমেয়েরা এখানেই আড্ডা দেন। কয়েকজন শিক্ষার্থীকে দেখা গেল সবুজ ঘাসের ওপর বসে তাঁদের এক বন্ধুর জন্মদিন পালন করছেন। তৌফিকুর রহমান নামের এক ছাত্র বললেন, ‘এই রেডিওতলায় একসময় এফএম গান শোনা হতো। থাকত পত্রিকা। এখন আর হয় না। তবে আড্ডা, মজা, আনন্দ, হাসি-কান্না...এমনকি মাঝে মাঝে মারামারিও

মো. বদরুদ্দোজা
শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিদ্যাপীঠ
মো. বদরুদ্দোজা
অধ্যক্ষ, কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ
আমি অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে। ইন্টারনেট ব্যবহার ও কম্পিউটার ল্যাবের ব্যবস্থা করা হয়েছে। আইসিটি বিভাগসহ প্রায় সব বিভাগেই মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমে পাওয়ার পয়েন্টে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করা হচ্ছে। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ঘরে বসেই কলেজের যাবতীয় তথ্যসুবিধার জন্য ডাইনামিক ওয়েবসাইট ও অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল অ্যাপস তৈরি করা হয়েছে। এ কলেজের আরেক নাম কুষ্টিয়ার শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিদ্যাপীঠ। আমরা সব সময় এই সুনাম ধরে রাখার চেষ্টা করি।