
বিদ্যালয়ের আঙিনার দুই পাশে ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছের সারি। সামনের বিস্তৃত মাঠ ঘেঁষে বিশাল আকৃতির দিঘি। নয় একর জায়গাজুড়ে এ দিঘির চারপাশে নানা জাতের গাছ দেখে মনে হবে এক চিলতে বন। শতবর্ষী চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর কধুরখীল উচ্চবিদ্যালয়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যে কারও মন কেড়ে নেবে। কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নয়, ঐতিহ্য, ভবনের স্থাপত্যশৈলী, লেখাপড়ার মানের দিক দিয়েও এই বিদ্যালয় উপজেলায় অনন্য।
শতবর্ষী কধুরখীল উচ্চবিদ্যালয় কেবল বোয়ালখালীর সেরা বিদ্যালয় নয়। নানা করণে এটি দেশের অন্যতম আলোচিত বিদ্যালয়। এই বিদ্যালয়ে রয়েছে ১০০ বছর আগে নির্মিত মাটির তৈরি ভবন, যা মৃৎভবন নামে পরিচিত। ইতিমধ্যে যেটি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের মর্যাদাও পেয়েছে। স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় ওই অঞ্চলে মুক্তিযোদ্ধাদের অন্যতম প্রধান ঘাঁটিও ছিল বিদ্যালয়টি। এ ছাড়া দেশের বিদ্যালয়ভিত্তিক প্রথম শহীদ মিনারও তৈরি হয় এই বিদ্যালয়ে।
উপজেলা সদর থেকে দুই কিলোমিটার দূরে আলী আহমদ সওদাগর সড়কে অবস্থিত এই বিদ্যালয়। গত রোববার বিদ্যালয়ের ফটক দিয়ে ঢুকতেই শতবর্ষী মাটির ভবনটি চোখে পড়ে। তার সামনের আঙিনায় ফুলের বাগান। এক পাশে শহীদ মিনার। এই ভবনের পেছনেই দোতলা মূল একাডেমিক ভবন। খেলার ছুটিতে দল বেঁধে খেলছিল শিক্ষার্থীরা। বিদ্যালয়ের মূল একাডেমিক ভবনের অপর পাশে অবস্থিত গ্যালারিযুক্ত মাঠেও শিক্ষার্থীদের কোলাহল। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে জানা গেল বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১ হাজার ১০০ ও শিক্ষকের সংখ্যা ১৬।
আধুনিক শিক্ষার সব উপকরণসমৃদ্ধ এই বিদ্যালয়ে রয়েছে চার হাজার বইসমৃদ্ধ পাঠাগার, বিজ্ঞান গবেষণাগার, পাঁচ হাজার বর্গফুটের মিলনায়তন, গ্যালারিযুক্ত খেলার মাঠ, কম্পিউটার ল্যাব, ভাষা গবেষণা ল্যাব এবং স্কাউট ডেন ও সাংস্কৃতিক কক্ষ।
প্রতিষ্ঠার ইতিহাস: ১৯১৭ সালের ১ জানুয়ারি বিদ্যালয়ের শিক্ষক বিধুভূষণ চৌধুরীর নেতৃত্বে দুই কক্ষবিশিষ্ট একটি বেড়ার ঘরে শুরু হয় বিদ্যালয়ের কার্যক্রম। সেই সময় কধুরখীল ইংরেজি উচ্চবিদ্যালয় নামে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাময়িক স্বীকৃতি লাভ করে এটি। শুরুতে সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণিতে ২৭ জন ছাত্র নিয়ে শুরু হয় পথ চলা। পরবর্তী সময়ে ১৯১৯ সালে বর্তমান পার্বতী চরণ দিঘির পাড়ে কয়েকজন ব্যক্তির দান করা জমিতে নির্মিত হয় বিদ্যালয়ের মাটির ঘর। প্রায় ২০ একর জায়গার ওপর প্রতিষ্ঠিত এ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রথম ম্যাট্রিক (মাধ্যমিক) পরীক্ষা দেয় ১৯২০ সালে।
প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন: বিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবন হিসেবে ১৯১৯ সালে নির্মিত মাটির ঘরটি এখন প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। ২০১৫ সালের ১ আগস্ট জাতীয় প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এটি সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নেয়। ২০১৬ সালের শেষের দিকে এটি সংরক্ষণে কাজ শুরু করে জাতীয় প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। ৭৫টি পিলারের ওপর নির্মিত মাটির এই ভবনের দৈর্ঘ্য ২০৩ ফুট ও প্রস্থ ৪২ ফুট। ভবনে রয়েছে আটটি কক্ষ। ব্রিটিশ বাংলোবাড়ির স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত এই ভবন তৈরি হয়েছিল মিয়ানমার থেকে সংগৃহীত বাঁশ, গাছ, মাটি ও টিন দিয়ে।
সুকান্তের স্মৃতি: কধুরখীল উচ্চবিদ্যালয় বহু জ্ঞানী–গুণী মানুষের জন্ম দিয়েছে। বিদ্যালয়ে এসেছিলেন অনেক কীর্তিমান মানুষ। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য ১৯২৫ সালে সর্বভারত ফেডারেশনে যোগ দিতে বোয়ালখালীতে এসে ঘুরে যান এই বিদ্যালয়ে। এখানকার একটি ক্লাসরুমে বসে কবিতাও লেখেন তিনি। সেই ক্লাসরুমটিকে এখন কবি সুকান্তের নামেই নামকরণ করা হয়েছে। বাইরে ফলকে উৎকীর্ণ আছে চট্টগ্রাম নিয়ে রচিত তাঁর একটি বিখ্যাত কবিতাও। ‘ক্ষুধার্ত বাতাসে শুনি এখানে নিভৃত এক নাম/ চট্টগ্রামঃ বীর চট্টগ্রাম!’
মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাঁটি: প্রতিষ্ঠার পর থেকেই বোয়ালখালীর এই বিদ্যালয়টি হয়ে উঠেছিল আন্দোলন-সংগ্রামের কেন্দ্র। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নিয়েছে এই বিদ্যালয়ের ছাত্ররা। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের নায়ক মাস্টারদা সূর্য সেনের সঙ্গী বিপ্লবী মহেন্দ্র দত্ত এ বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। সূর্য সেন ধরা পড়ার পর মহেন্দ্র দত্ত আমরণ অনশন করে মারা যান।
১৯৬৫ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি শিক্ষকদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে বিদ্যালয়ের ছাত্ররা নির্মাণ করে ভাষাশহীদদের স্মরণে শহীদ মিনার। এ শহীদ মিনার নির্মাণ করার অপরাধে বিদ্যালয়ের ছাত্র সৈয়দ আবুল হাসান ও সৈয়দ নুরুল হুদাকে বিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়। পাশাপাশি পাকিস্তান সরকার ওই বছর বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান শিক্ষার বরাদ্দ বাতিল করে। ভাষা আন্দোলন নিয়ে লেখা প্রথম কবিতার কবি মাহবুবুল আলম চৌধুরী এ বিদ্যালয়ের ছাত্রদের নির্মিত শহীদ মিনারে একুশ উদ্যাপন কারার জন্য আসতেন নিয়মিত।
১৯৭১ সালের মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাঁটি ছিল এ বিদ্যালয়। স্বাধীনতাযুদ্ধে অংশ নিয়ে শহীদ হয়েছেন বিদ্যালয়ের শিক্ষক বঙ্কিম চন্দ্র আইচ ও দিলীপ চৌধুরী। এ ছাড়া বিদ্যালয়ের ছাত্র এখলাসুর রহমান, প্রদীপ বিশ্বাস, চন্দন দাশ গুপ্ত ও অমিত চৌধুরী প্রাণ দেন মুক্তিযুদ্ধে। যুদ্ধে সরাসরি অংশ নেন আরও অসংখ্য ছাত্র।
পরিবেশবান্ধব বিদ্যালয়: বিদ্যালয় আঙিনা ঘেঁষে প্রায় নয় একর জায়গায় অবস্থিত পার্বতী চরণ দিঘি। দিঘির চারপাশে ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছের সারি। দিঘির পারপাশে বৃক্ষ রোপণের জন্য ২০০৯ সালে বনায়নের জাতীয় পুরস্কার পায় বিদ্যালয়টি।
ধারাবাহিক ভালো ফল: বিদ্যালয়টি থেকে প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী কৃতিত্বের সঙ্গে এসএসসি পাস করছে। ২০১৭ সালের ১২ এপ্রিল প্রেসিডেন্ট পদক পায় বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র কামরুল হোসেন। ২০১৩ ও ২০১৪ সালে এই বিদ্যালয়ের এসএসসি পরীক্ষায় পাসের হার ছিল শতভাগ। তবে গত দুই বছর পাসের হার কিছুটা কমেছে। ২০১৫ সালে এসএসসিতে পাসের হার ছিল ৯৪ দশমিক ৬৬ শতাংশ এবং ২০১৬ সালে ৮৬ দশমিক ৪৭ শতাংশ।
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বক্তব্য: বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি স্থানীয় সাংসদ মঈন উদ্দিন খান বাদল নিজেও এই বিদ্যালয়ের ছাত্র। তিনি বলেন, ‘দেশের পুরোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এটি অন্যতম। এত বিশাল সম্পদ, মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ দেশের আর কোনো বিদ্যাপীঠে আছে কি না তা আমার জানা নেই। এ বিদ্যালয়ের প্রথম একাডেমিক ভবনটি এখন প্রত্ন নিদর্শন। এটি শুধু বোয়ালখালী নয়, সারা বাংলাদেশের জন্য গর্ব করার মতো একটি প্রতিষ্ঠান।’
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বিশ্বজিৎ বড়ুয়া বলেন, এটি একটি গৌরবোজ্জ্বল বিদ্যাপীঠ। এ বিদ্যালয়ের অনেক ইতিহাস–ঐতিহ্য রয়েছে। শিক্ষা–সংস্কৃতিতে সুনামের সঙ্গে এগিয়ে চলছে এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।