ট্রেনের আচমকা ঝাঁকুনিতে ঘুমটা ভেঙে গেল। এলোমেলো চুলগুলো কপালের দুপাশ থেকে সরিয়ে নিতে নিতে জানালা দিয়ে বাইরের প্ল্যাটফর্মের দিকে চোখ ফেরালাম। কোন স্টেশনে এসে পৌঁছালাম ঠিক ধরতে পারছি না। হাতে রাখা মোটা ফ্রেমের চশমাটা চোখে দিয়ে জানালার বাইরে মুখ বের করে স্টেশনের নামটি পড়ার বৃথা চেষ্টা করলাম। পারলাম না।
নাহ্, আজকাল চশমার পাওয়ারটাও ভালো কাজে দিচ্ছে না। বুড়িয়ে গেলাম! জানালার পাশে বসাতে বুঝলাম, প্ল্যাটফর্মের খুব কাছেই ছিলাম। হঠাৎ চোখ আটকে গেল। কী জানি, বুকের বাঁ পাশটাও হয়তো একটু কেঁপে উঠল! দেখলাম, মলিন পোশাকে আধো আবৃত একটি পুরুষকে। চেহারাটা কাঁচাপাকা দাড়িগোঁফে মোড়ানো। মাথার জটা চুলে বিকেলের সোনালি রোদটুকু খেলা করছে, মৃদুমন্দ বাতাসে চুলগুলো ওড়ার ক্ষমতা হারিয়েছে। বরং বাতাসে ভেসে আসছিল একটা ভ্যাপসা গন্ধ, তার চুল থেকে, নিঃশ্বাস থেকে অথবা ক্ষয়ে যাওয়া লম্বা নখগুলো থেকে। নখের দিকে দৃষ্টি পড়তেই দেখতে পেলাম একটি সৃষ্টিকর্ম। লম্বা নখযুক্ত আঙুলের মুঠিতে একটি লাল ইটের সুরকি, যা দিয়ে সে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মটিতে অবিরত লিখে চলেছে, ‘সোহাগী’, ‘সোহাগী’।
লাল রঙের সোহাগী নামটিতে তার লাল চোখের দৃষ্টি পড়তেই সে উন্মাদ হয়ে উঠছে। একদলা থুতু দিয়ে ভিজিয়ে দিচ্ছে নামটি। তারপর দুই হাতের তালু দিয়ে ঘষে ঘষে মুছে ফেলছে সব কটি নাম। এরপর আবার লিখছে। লিখে চলছে ক্রমাগত। ‘ম্যাডাম, আপনার টিকিটটা দেখান।’ ট্রেনের টিটি সাহেবের কথায় সংবিৎ ফিরে পেলাম। ব্যাগ থেকে টিকিট বের করতে করতে জানতে চাইলাম, ‘এটা কোন স্টেশন?’ তিনি উত্তর দিলেন, ‘এটা সোহাগী রেলওয়ে স্টেশন।’ অনুভবে যখন দ্বিতীয়বার নামটি ধরা দিল, স্মৃতির ডায়েরিটিতে শক্ত করে আটকানো তালাটা কোনো চাবি ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুলে গেল। আমি ফিরে গেলাম দুই যুগ আগের সেই চিরসবুজ দিনগুলোয়। তখন আমার বয়স ১৭ কিংবা ১৮। কলেজজীবনের প্রথম দিনগুলো ভালোই কাটছিল। বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, হইচই, চিৎকার-চেঁচামেচি। ভাবতাম, এ জীবন যদি শেষ না হতো! এ সময় যদি থমকে যেত। কিন্তু বাস্তবতার অবস্থান যে সর্বদাই কল্পনার বিপরীতে।
মাস ছয়েকের মধ্যে এক ছেলের সঙ্গে খুব ভালো বন্ধুত্ব হয়। সহপাঠী। সারা দিন একসঙ্গে থাকি। বন্ধুত্ব ভালোবাসাতে গড়াতে বেশি সময় নিল না। একে অন্যের পরিপূরক হয়ে উঠলাম। কেবলই মনে হতো, ভালোবাসা বড় মধুর অনুভূতি। নিমেষেই আমার সাদাকালো পৃথিবীটাকে কেমন রঙিন করে তোলে! আমি তাকে ভালোবাসি। খুব বেশি ভালোবাসি। আর সে যেন আমাকে আমার চেয়েও অনেক বেশি ভালোবাসে। তার ভাষায়, ‘তুই খুব সোহাগপ্রণয়া মেয়ে রে! তোকে আমি সোহাগী বলে ডাকব।’
তারপর একসময় ভালোবাসার সুন্দর এই দিনগুলো মুহূর্তেই হারিয়ে গেল। আর দশটা বাঙালি মেয়ের মতো আমার ভালোবাসাও বাবার হৃদ্রোগ আর মায়ের উচ্চ রক্তচাপের চাপে বিয়ের পিঁড়িতে আরেকজনের হয়ে গেল। কয়েকটা শব্দের বিনিময়ে আমি একজনের প্রেমিকা থেকে অন্য একজনের সহধর্মিণী হয়ে গেলাম। তারও কয়েক বছর পর কারও মা। এরপর আমাকে সোহাগী ডাকার সেই মানুষটার কোনো খোঁজ রাখা হয়নি। শুধু সোহাগী স্টেশনে এলে বারবার অতীতটাকে পাল্টে দিতে ইচ্ছা করে।