দবিরুল ইসলাম চৌধুরী

স্বপ্নবান শতবর্ষী

আলাপ শুরুর আগে খানিকটা অস্বস্তিই ভর করেছিল। তবে আলাপের শুরুতেই মুগ্ধ হলাম দবিরুল ইসলাম চৌধুরীর প্রখর স্মৃতিশক্তির কারণে। সাত-আট দশক আগের ঘটনাও বলে যেতে থাকলেন অবলীলায়। বয়সের কারণে দু-একবার কথার খেই হারিয়ে ফেললেও ছেলে আতিক চৌধুরী ধরিয়ে দিতেই শুরু করেন তাঁর এক শতাব্দীর জীবনের নানা বাঁকের গল্প। কিছুদিন আগে তাঁর সঙ্গে কথা হচ্ছিল হোয়াটসঅ্যাপে।

হেঁটে তহবিল গঠন, অক্টোবরে পাওয়া যুক্তরাজ্যের রানির বেসামরিক খেতাব ‘অর্ডার অব দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার (ওবিই)’, মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রবাস থেকেও পাশে দাঁড়ানোসহ তাঁর এক শতাব্দীর জীবনগল্প দবিরুল ইসলাম চৌধুরীর। একফাঁকে পুরস্কার পাওয়া নিয়ে তিনি বললেন, ‘যেকোনো কাজের স্বীকৃতি পাওয়া সম্মান ও আনন্দের। তবে এসব ভেবে আমি হাঁটিনি। মানুষের জন্য কিছু করতে চেয়েছিলাম। তবে খেতাব পেয়ে ভালো লাগছে।’

হেঁটে তহবিল সংগ্রহ

দবিরুল ইসলামের রোজকার কাজ দেখলে মনে হয় প্রচলিত কথাটি, বয়স স্রেফ সংখ্যা। এই বয়সেও নানা ধরনের সামাজিক কাজে যুক্ত আছেন তিনি। কমিউনিটির কেউ অসুস্থ হলে তাঁকে নিয়ম করে দেখতে যান। কারও কোনো দরকারে ছুটে যাবেন পাশে দাঁড়াতে। করোনা সংক্রমণ শুরু হওয়ার তাঁর এসব কাজকর্ম অনেকটাই বন্ধ হয়ে যায়। সময় কাটাতে তিনি বাড়ির বাগানে হাঁটাহাঁটি শুরু করেন। তবে পরিবারের ভয় ছিল, করোনায় অনেক ব্রিটিশ বাঙালির পরিবার বিপর্যস্ত—এ অবস্থায় দবিরুল চৌধুরীকে বাড়িতে আটকে রাখা কঠিন। যেকোনো সময় তিনি বাড়ির বাইরে পা রাখবেন। তাই যখন শুনলেন দবিরুল ইসলাম চৌধুরী তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছেন, পরিবারের সদস্যরা উৎসাহ জোগালেন।

পাশে বসে ছিলেন দবিরুলের ছেলে আতিক চৌধুরী। ফোনটা নিয়ে তিনি বলেন, ‘বাবা খুবই কর্মঠ মানুষ। তাঁকে আইসোলেশনে রাখাই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। হাঁটার মাধ্যমে তাঁকে ব্যস্ত ও সুস্থ রাখাই ছিল আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য। একসময় বাবার মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহ করতে যোগাযোগ করে স্থানীয় এক টেলিভিশন কর্তৃপক্ষ। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ পেয়ে বাবাও রাজি হন।’

বাগানে হেঁটে তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছিলেন দবিরুল ইসলাম চৌধুরী

দবিরুল ইসলাম চৌধুরী হেঁটেছিলেন গত রমজান মাসে। ব্রিটিশ-বাংলাদেশিদের টেলিভিশন চ্যানেল এসের ‘রামাদান ফ্যামিলি কমিটমেন্ট’ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে শুরু। এ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রতিবছর রমজান মাসে অর্থ সংগ্রহ করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দাতব্য সংস্থাকে দেওয়া হয়। দবিরুলও রোজা রেখেই বাড়ির বাগানে হেঁটে ৯৭০ বার চক্কর দিয়েছেন। প্রতি চক্করে ৮০ মিটারের বেশি হেঁটেছেন। জানালেন, রোজা রেখে হাঁটলেও তিনি কোনো শারীরিক সমস্যা বা ক্লান্তি বোধ করেননি।

হাঁটার ক্ষেত্রে দবিরুল ইসলামের অনুপ্রেরণা ছিলেন টম মুর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন ছিলেন টম মুর। বয়সে সেঞ্চুরি পার হয়ে গেলেও এখনো মানুষের জন্য কিছু করার তাগিদ অনুভব করেন টম। সেই তাগিদ থেকে নিজের দেশের যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিসকে (এনএইচএস) সাহায্য করতে হেঁটে হেঁটে তহবিল সংগ্রহ করেন।

শুরুতে দবিরুলের পরিকল্পনা ছিল ৫০-৬০ কদম হেঁটে কয়েক শ পাউন্ড সংগ্রহের। এর অংশ হিসেবে দবিরুল ইসলামের নাতি তহবিল সংগ্রহের ওয়েবসাইট জাস্ট গিভিংয়ে পোস্ট দেন। লিংক শেয়ার করেন বন্ধু-আত্মীয়রা। শুরুতে লক্ষ্যমাত্রা ছিল এক হাজার পাউন্ড সংগ্রহের। কিন্তু ছয় ঘণ্টাতেই আসে হাজার পাউন্ডের বেশি। তাঁর সংগৃহীত অর্থের পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ২০ হাজার পাউন্ডের ওপরে, বাংলাদেশি টাকায় যা সাড়ে ৪ কোটি টাকার বেশি। টম মুরের মতো দবিরুল ইসলামও সংগৃহীত তহবিলের প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা এনএইচএসের উন্নয়নে দেন। বাকি অর্থ বাংলাদেশসহ ৫২টি দেশের ৩০টি দাতব্য প্রতিষ্ঠানে দান করেন।

মাতৃভূমির মায়া

দবিরুল ইসলাম চৌধুরীর জন্ম ১৯২০ সালের ১ জানুয়ারি, সুনামগঞ্জের দিরাইয়ে। ১৯৫৭ সালে ইংরেজি সাহিত্যে উচ্চশিক্ষা নিতে যুক্তরাজ্যে পাড়ি জমান। তখন থেকে সে দেশেই আছেন। ছয় দশকের বেশি সময় বিদেশে থাকলেও দেশের জন্য তাঁর রয়েছে নিখাদ প্রেম। সুনামগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিষ্ঠা করেছেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। সেসব প্রতিষ্ঠানের নামও বললেন। নিয়ম করে প্রতিবছর দেশে আসেন। গত বছর অক্টোবরেও দেশে ঘুরে গেছেন। করোনার কারণে অবশ্য এ বছর দেশে আসা হয়নি।

দবিরুল ইসলাম বললেন, ‘ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলায় পারদর্শী ছিলাম।’ প্রায় আট দশক আগে বৃহত্তর সিলেটের কোথায় কোথায় ফুটবল খেলতে গিয়েছেন, তা এখনো মনে আছে তাঁর। ছিলেন সিলেট গভর্নমেন্ট স্কুলের ফুটবল দলের অধিনায়কও। ভালোবাসেন কবিতা লিখতে, পড়তে। কবিতা লিখে পুরস্কারও পেয়েছেন। মুখস্থ আছে অগণিত কবিতা। এক ফাঁকে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা নিয়ে লেখা একটি কবিতা আবৃত্তি করেও শোনালেন।

মাতৃভূমির প্রতি এমন মায়ায় মুক্তিযুদ্ধেও অবদান রেখেছেন দবিরুল চৌধুরী। সে–ও তহবিল সংগ্রহ। তাই করোনাকালে তহবিল সংগ্রহ মোটেও নতুন কিছু নয় দবিরুল চৌধুরীর জন্য। আলাপের একপর্যায়ে দবিরুল চৌধুরী বলেন, ‘‍বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর নির্দেশনায় ব্রিটেনের বাঙালিরা অ্যাকশন কমিটি গঠন করেন। এই কমিটির কাজ ছিল স্বাধীনতার পক্ষে জনমত গড়ে তোলা ও তহবিল সংগ্রহ। এর অংশ হিসেবে আমি সাতটি এলাকা থেকে তহবিল সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করেছি।’

এখন তিনি অনুপ্রেরণা

নানাভাবে সমাজে অবদান রাখা ব্যক্তিদের ব্রিটেনের রানির জন্মদিন উপলক্ষে বিভিন্ন খেতাব দেওয়া হয় প্রতিবছর। অর্ডার অব দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার বা ওবিই তার মধ্যে অন্যতম। রাজা পঞ্চম জর্জ ১৯১৭ সাল থেকে এই খেতাবের প্রচলন করেন। এবারের তালিকায় স্থান পাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে বেশির ভাগই করোনাকালে নানা ভূমিকা পালন করেছেন। কয়েকজন ব্রিটিশ-বাংলাদেশিও খেতাব পেয়েছেন। তবে দবিরুল চৌধুরীকে নিয়েই বেশি অলোচনা। বয়স বিবেচনায় তাঁর প্রচেষ্টা সবাইকে মুগ্ধ করেছে। এখন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তরুণদের আইকন। জরুরি প্রয়োজনে বাইরে বের হলে তাঁর সঙ্গে সেলফি তুলতে ভিড় করেন তরুণেরা। শুনতে চান এমন সাহসী পদক্ষেপের পেছনের গল্প।