
বিশ্ব ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে লেখা আহ্বান করেছিল প্রথম আলোর শনিবারের ক্রোড়পত্র ‘ছুটির দিনে’। সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে ভালোবাসার টক–ঝাল–মিষ্টি গল্প লিখে পাঠিয়েছেন পাঠক। কেউ লিখেছেন দুরন্ত প্রেমের গল্প, কেউবা শুনিয়েছেন দূর থেকে ভালোবেসে যাওয়ার অনুভূতি। তেমনই একটি লেখা পড়ুন এখানে।
বড় বড় কপি লিখে ফেলছি, ক্লায়েন্টের ব্রিফও বুঝে ফেলছি; কিন্তু প্রেমিকার মন রাখতে একটা প্রেমের কবিতা আসছে না। আমার ভালোবাসার আন্তরিকতা নিয়ে তো প্রশ্ন উঠে যাবে…
আমার বন্ধু সপ্ত, কিছু পারুক আর না পারুক, মেয়ে পটাতে সে দারুণ কবিতা লিখতে পারে। কীভাবে যেন পারে। আমার যে ওকে দেখে হিংসা হয় না, সেটা বলা যায় না।
সব ঠিক যাচ্ছিল দিনকাল, বাসা থেকে অফিস, অফিস থেকে বাসা। বাসায় এসে মা-বাবার সঙ্গে আড্ডা, তারপর প্রেমিকাকে সময় দেওয়া। কিন্তু ঝামেলাটা লাগল অন্য জায়গায়—প্রেমিকার আবদার এই ভালোবাসা দিবসে কিচ্ছু না, শুধু একটা কবিতা লিখে দিতে হবে তাকে নিয়ে। তা ভালো, প্রেমিকার সৌন্দর্যের প্রশংসা করে গালিব থেকে শুরু করে রুমি, কত না কবিতা আছে, কিছু একটা পড়ে নতুন একটা লিখে দিলেই চলবে। আর এত কিছুরই–বা কী দরকার। সামনে বসে মনে যা আসে লিখে দিলেই হবে। বিজ্ঞাপনে কাজ করলে এই সুবিধা, না চাইতেই কত ভালো কথা যে মুখ থেকে বের হয় আর কলমে লেখা হয়, সেটা আমি বুঝি।
কিন্তু না, এবারের কবিতা—প্রেমের কবিতা। শর্ত, কোনো কবিতা পড়ে লেখা যাবে না। লিখতে হবে মনের ভেতরের কথাগুলো। মনের ভেতর মাঝেমধ্যে যা থাকে তা লিখে দিলে তো প্রেমের কবিতা হবেই না, উল্টো প্রেমটাই টিকবে না। কী করা যায়? তার ওপর বাড়তি চাপ, পাওনাদারের মতো প্রতিদিন মনে করিয়ে দেওয়া, কী ভাবছি—কী লিখব?
ভালোই ঝামেলা তো, এই কবিতা লিখতে চেষ্টা করছি অফিসের ব্রিফ তোলার নোটবুকে—কলিগরা দেখে হাসছে। বন্ধু সপ্তর কাছ থেকে সাজেশন নিচ্ছি। গোসলের সময় শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে চিন্তা করছি। আবার সুকুমার রায়ের ‘অবাক জলপান’–এর সেই কবির মতো, ক্লায়েন্টের কপির ছন্দ মিলিয়ে দিচ্ছি, কিন্তু কবিতা কী, কবিতার ‘ক’–ও আসে না মাথা থেকে।
একজন কপিরাইটার যদি প্রেমের কবিতা লিখতে না পারে, তার মনে হয় সমাজে মুখ দেখানো উচিত না, এটাই মনে হচ্ছে কয়েক দিন ধরে।
...শেষমেশ আর কী, ডেডলাইনের এক ঘণ্টা আগে অফিস থেকে ফেরার পথে ট্রাফিক জ্যামে বসে এই মাঘ মাসের শীতে ঘামতে ঘামতে আত্মসমর্পণ করে মেসেজ লিখলাম:
প্রিয়তমা, পাঁচ মিনিটের ক্লায়েন্ট ফিডব্যাক নেওয়া সহজ, কিন্তু তোমার চোখের একমুহূর্তের চাহনির ডেসক্রিপশন দেওয়া আমার শব্দের সাধ্যের বাইরে। তাই এই কয়টা লাইন তোমার জন্য—
ক্লায়েন্টের হাজারো ব্রিফ বুঝি নিমেষে
তোমার মনের ইশারাটা আজও গোলকধাঁধায় শেষে
সারা দিন শব্দের জাল বুনি জগৎময়
অথচ তোমার সামনে এলেই সব শব্দ হয় বিলয়
গালিব-রুমি ধারেকাছে নেই, নেই ছন্দের কারুকাজ
তোমার হাসির কাছে সব উপমা তুচ্ছ লাগে আজ
জেনে রেখো, এই খটখটে মানুষটার হৃদয়ের গভীরতায়
এক সমুদ্র ভালোবাসা শুধু তোমারই পথ চায়।
কবিতাটা লিখে নিচে একটা ছোট চিরকুট জুড়ে দিলাম, ‘এটাই প্রথম, এটাই শেষ। এর চেয়ে ভালো আর হবে না।’
পাঁচ মিনিট পর রিপ্লাই এল, ‘আমার কাছে এটাই একটা পারফেক্ট প্রেমের কবিতা।’