শিশুকে ভাষার মূল্য বোঝানোর দ্বায়িত্ব অভিভাবকের
শিশুকে ভাষার মূল্য বোঝানোর দ্বায়িত্ব অভিভাবকের

ইংরেজি মাধ্যমের শিশুদের যেভাবে বাংলাচর্চা করাবেন

নিজের ভাষা পরিপূর্ণভাবে না শিখলে শেষ পর্যন্ত অন্য ভাষাও সঠিকভাবে শেখা সম্ভব নয়—এই বোধটুকু বুনে দিন শিশুর মনে

মাত্রই মুখে ফুটেছে কিছু শব্দ আর আধো বুলি। ওইটুকু কথাও শিশু তার মায়ের ভাষাতেই বলবে, এটাই স্বাভাবিক। এই সময় তার মুখে ভিনদেশি শব্দ আমাদের কাছে সাময়িক আনন্দের উৎস হলেও তা শিশুটির ভাষাগত ভবিষ্যতের কোনো উজ্জ্বল দিক নির্দেশ করে না। নিজের ভাষার ভিত্তি তৈরি হওয়ার পর অন্য ভাষার চর্চা নিশ্চয়ই হবে। বিশ্বায়নের যুগে ভিনদেশি ভাষা ছাড়া এগিয়ে যাওয়ার বিকল্প নেই। তবে শিকড়টাকে নাড়িয়ে দিয়ে নয়।

বর্ণ শেখার জন্য ভিন্ন উপকরণ বেছে নিন

অভিভাবকের মাত্রাতিরিক্ত ইংরেজি-প্রীতি কিংবা ভিনদেশি কার্টুন-অ্যানিমেশন-চলচ্চিত্র—সবই প্রভাব ফেলে শিশুর ভাষাগত বিকাশে। বিশেষ করে যারা ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করছে, মনের অজান্তেই মিশ্র ভাষার শব্দচয়ন করে ফেলছে তারা। বাংলা ভাষার প্রতি তাদের মনে একটা ভীতিও কাজ করে। ভাষায় ভিনদেশি টান আরোপের প্রচলনটাও দেখা যাচ্ছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক খালেদ হোসাইন বলেন, ‘ভাষার মূল্য শিশু নিজে থেকে বুঝবে না। তাকে বিকশিত করে তোলা অভিভাবকেরই দায়িত্ব।’

সু-অভ্যাসে শুদ্ধতা

শিশু-কিশোরদের সামনে ভাষা নির্বাচনে সচেতন হোন। অধ্যাপক খালেদ হোসাইন জানালেন, ভাষা প্রবহমান এবং গণতান্ত্রিক। তাই কিছু পরিবর্তন আসবেই। ভিনদেশি অনেক শব্দই বাংলায় গৃহীত হয়েছে। তবে তা একটি নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে। যে শব্দটি বাংলাতেই বিদ্যমান, সে শব্দের পরিবর্তে ভিনদেশি শব্দ ব্যবহারের প্রয়োজন নেই। ওদের সামনে শুদ্ধ উচ্চারণ করুন, ভুল শব্দচয়ন থেকে বিরত থাকুন। এগুলো সম্পর্কে তাই নিজের জ্ঞান থাকা আবশ্যক। প্রয়োজনে নিজেও শিখুন শুদ্ধ ভাষা। শিশুদের গল্প বলুন বাংলায়। আধো বুলিতে মজার ছড়া বাংলাতেই বলুক। পারিপার্শ্বিক কারণে ইংরেজি ভাষার ব্যবহার করতে হলেও বাড়িতে বাংলার চর্চা রাখুন। ওর সঙ্গে বাংলাতেই কথা বলুন সব সময়। শিশুর বাংলা লেখার সময়ও বানান শুদ্ধ হচ্ছে কি না, খেয়াল রাখুন।

গল্পচ্ছলে ওকে বুঝিয়ে দিন ভাষার কথা

গৌরবের বর্ণমালা

বাংলা ভাষার ইতিহাস, ভাষাশহীদদের আত্মত্যাগ এবং ঐতিহ্য সম্পর্কে নিজে স্বচ্ছ ধারণা রাখুন, গল্পচ্ছলে এই গৌরবের কথা শিশু-কিশোরদের জানান। শুদ্ধ বাংলার চর্চা করা যে আমাদের দায়িত্ব, সে বিষয়টি বুঝিয়ে দিন। সময়-সুযোগ করে একুশে বইমেলা, শহীদ মিনার, ভাষাশহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণে গড়ে তোলা জাদুঘর থেকে ঘুরিয়ে আনুন।

খেয়ালখুশির পড়ালেখা

শিশুদের বাংলা ছড়া, কবিতা, গল্প, উপন্যাসের বই উপহার দিন। বই বাছাইয়ের সময় ওদের বয়স আর পছন্দের দিকটা বিবেচনায় রাখুন। সুকুমার রায় বা বড়ুয়ার মজার ছড়ায় শিশু যেমন আনন্দ পাবে, তেমনি ওর চিন্তার পরিসরও আকাশ ছোঁবে। ভিনদেশি রূপকথাও বাংলায় পড়তে পারে শিশু। ব্যোমকেশ, প্রফেসর শঙ্কু, ফেলুদা, তিন গোয়েন্দা, পিকু, কুটি কবিরাজ—কাউকে না কাউকে আপনার পরিবারের কিশোরটির নিশ্চয়ই পছন্দ হবে। নারায়ণ দেবনাথের ‘নন্টে ফন্টে’ পড়লে প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিও হাসেন প্রাণখুলে।

চর্চার মাধ্যম

নিজের সারা দিনটিকে ডায়েরিতে বাংলায় লিখতে উৎসাহ দিতে পারেন। বাংলা অভিধান রাখুন ওর নাগালের ভেতর। আবৃত্তি শিখতে শিখতে ভাষার শুদ্ধতার চর্চা হয়। বিতর্কে বাড়ে ভাষাগত দক্ষতা। একই এলাকার শিশু-কিশোরদের নিয়ে সাহিত্য ও সংস্কৃতিমুখী কর্মকাণ্ডের আয়োজন করলে সবার মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

ডিজিটাল দুনিয়ায়

ডিজিটাল দুনিয়া এ যুগের শিশু-কিশোরদের সময় কাটানোর অন্যতম মাধ্যম। ডিজিটাল পর্দার বিনোদনের মাধ্যম হিসেবেও বেছে নিন বাংলাকে। বাংলা কার্টুন-অ্যানিমেশন-চলচ্চিত্রের ঝুলিও সমৃদ্ধ হচ্ছে। ভিনদেশি ভাষার কার্টুন-অ্যানিমেশন-চলচ্চিত্রও দেখতে দেবেন নিশ্চয়, তবে তা নিজের ভাষার ভিত্তি সুগঠিত হওয়ার পর।

শিশুকে বইয়ের দোকানে নিয়ে যান

জীবনধারায় বাংলা

শুদ্ধ ভাষাচর্চার জন্য চাই অনুকূল পরিবেশ। তাই রোজকার জীবনযাপন হোক দেশীয় ঐতিহ্যকে ধারণ করে। বাংলায় লিখিয়ে নিতে পারেন নামফলক কিংবা নিজস্ব পরিচিত (ভিজিটিং)। কাঠের তৈরি বাংলা বর্ণ দিয়ে ঘরের দেয়ালে লিখতে পারেন নাম বা প্রিয় কোনো বাক্য। দেয়ালের রং দিয়েও লিখতে পারেন। শহীদ মিনারও আঁকতে পারেন দেয়ালজুড়ে। চাবির রিংয়েও থাকতে পারে শহীদ মিনার। মগে বর্ণমালার নকশা থাকতে পারে।

ভাষা আমার অস্তিত্ব, নিজের ভাষা পরিপূর্ণভাবে না শিখলে শেষ পর্যন্ত অন্য ভাষাও সঠিকভাবে শেখা সম্ভব নয়—এই বোধটুকু বুনে দিন শিশুর মনে।