
দেশের ক্রীড়াবিদদের আর্থিক সচ্ছলতা নিশ্চিত করা আর ক্রীড়াকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্য নিয়ে ক্রীড়া ভাতা চালু করেছে সরকার। এ পর্যন্ত ‘ক্রীড়া কার্ড’ পাওয়া খেলোয়াড়দের মধ্যে একমাত্র ট্রায়াথলেট ফেরদৌসী আক্তার মারিয়া
আগের দিনই হাতে পেয়েছেন ‘ক্রীড়া কার্ড’। সেই উচ্ছ্বাস নিয়েই ২০ এপ্রিল প্রথম আলো কার্যালয়ে এলেন ফেরদৌসী আক্তার মারিয়া। মুখে একধরনের নীরব আনন্দ, যেন পথচলার গুরুত্বপূর্ণ একটি স্বীকৃতি হাতে এসে ধরা দিয়েছে।
১৯ এপ্রিল জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের অডিটোরিয়ামে ক্রীড়া ভাতা কর্মসূচির দ্বিতীয় ধাপে যুক্ত হওয়া ১৭১ জন ক্রীড়াবিদকে এক লাখ টাকা করে ভাতা ও ক্রীড়া কার্ড দেওয়া হয়। ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকের হাত থেকে ১৭১ নম্বর কার্ডটি পান মারিয়া। এই তালিকায় একমাত্র ট্রাইয়াথলেট তিনি।
মারিয়া বলছিলেন, ‘আমাদের ট্রাইয়াথলেটদের জন্য এটা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। আমি এখনো শিক্ষার্থী। এই ভাতা আমাকে আরও মনোযোগ দিয়ে অনুশীলন করতে সাহায্য করবে।’
ক্রীড়া কার্ডের জন্য সম্ভাব্য ক্রীড়াবিদ বাছাইপ্রক্রিয়া নিয়ে কাজ করা জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের পরিচালক (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) টিটন খীসা বলেন, ‘সর্বশেষ যাঁরা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন, তাঁরাই এই ভাতার জন্য মনোনীত হয়েছেন। সেই ভিত্তিতেই ট্রায়াথলন থেকে ফেরদৌসী আক্তার মারিয়াকে দেওয়া হয়েছে।’
দৌড়, সাঁতার আর সাইক্লিংয়ের সমন্বিত একটি খেলা ট্রায়াথলন, যেখানে শরীরের পাশাপাশি প্রয়োজন মানসিক দৃঢ়তা। এই কঠিন খেলাতেই নিজের জায়গা তৈরি করেছেন মারিয়া। অর্ধদূরত্বের আয়রনম্যান, অর্থাৎ ‘আয়রনম্যান ৭০.৩’ প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে ইতিমধ্যে পরিচিতি পেয়েছেন তিনি। এই প্রতিযোগিতায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ১ দশমিক ৯ কিলোমিটার সাঁতার, ৯০ কিলোমিটার সাইক্লিং এবং ২১ দশমিক ১ কিলোমিটার দৌড় শেষ করতে হয়।
সর্বশেষ গত ফেব্রুয়ারিতে শ্রীলঙ্কার কলম্বোতে অনুষ্ঠিত ‘আয়রনম্যান ৭০.৩’ প্রতিযোগিতায় সফল হয়ে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছেন মারিয়া। বাংলাদেশের প্রথম নারী হিসেবে দ্বিতীয়বারের মতো এই আসরে অংশ নেবেন তিনি। আগামী সেপ্টেম্বরে ফ্রান্সের নিস শহরে বসবে এই প্রতিযোগিতা।
রংপুরের পীরগঞ্জের প্রত্যন্ত এক গ্রামে মারিয়ার জন্ম ও বেড়ে ওঠা। বাবা দবির উদ্দীনের পেশা কৃষিকাজ, মা রেহানা বেগম গৃহিণী। চার বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার প্রতি তাঁর প্রবল আগ্রহ। সেই আগ্রহই তাঁকে নিয়ে যায় বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে (বিকেএসপি)। শুরুটা ছিল ফুটবল দিয়ে। প্রিমিয়ার লিগ পর্যায়েও খেলেছেন। কিন্তু একসময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশের আয়রনম্যান সামছুজ্জামান আরাফাত ও আরিফুর রহমানের ভিডিও দেখে ট্রায়াথলনের প্রতি তাঁর আগ্রহ জন্মে।
২০২৪ সালে মালয়েশিয়ার লাংকাউইয়ে প্রথমবার ‘আয়রনম্যান ৭০.৩’ প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে সফল হন মারিয়া। সেই সাফল্যে স্পেনে অনুষ্ঠিত বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান। তাঁর সাফল্যের খবর প্রকাশিত হয় প্রথম আলোর শনিবারের ক্রোড়পত্র ছুটির দিনের পাতায়। পরে গত বছরের ৮ মার্চ প্রথম আলোর নারী দিবসের অনুষ্ঠানে আয়রনম্যান হওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে গিয়ে জানান, অনেক পরিশ্রম করে এ যোগ্যতা অর্জন করলেও তাঁর নিজের কোনো সাইকেল নেই। এ ধরনের সাইকেল বেশ দামি। কেনার সামর্থ্য তাঁর নেই।
প্রথম আলোর সমন্বয়ে কয়েকজনের সহযোগিতায় পরে এ ধরনের একটি সাইকেল উপহার পান মারিয়া। সেই সাইকেল নিয়েই স্পেনে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে হাজির হয়েছিলেন তিনি। যদিও সেখানে সফল হতে পারেননি, তবে থেমে থাকেননি। ব্যর্থতাকে পাথেয় করে আবার প্রস্তুতি নেন।
কলম্বোতে সফল হয়ে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছেন মারিয়া।
মারিয়া ট্রায়াথলন-যাত্রায় নানা সময় প্রথম আলোকে পাশে পাওয়ার কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘প্রথম আলো সব সময় আমার পাশে ছিল। আয়রনম্যান প্রতিযোগিতার জন্য বিশেষ বাইসাইকেল জোগাড় করে দেওয়াসহ নানাভাবে সহযোগিতা করেছে। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পাওয়ার পর তাই সবার সঙ্গে দেখা করতে এলাম।’
বর্তমানে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিক্যাল এডুকেশন অ্যান্ড স্পোর্টস সায়েন্স বিভাগের দ্বিতীয় সেমিস্টারে পড়ছেন মারিয়া। পাশাপাশি চলছে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপের প্রস্তুতি।
মারিয়ার কথায়, ‘ট্রায়াথলেট হিসেবে আসন্ন বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপই এখন আমার ধ্যানজ্ঞান।’