চট্টগ্রাম থেকে আসা বিকেলের ফ্লাইটটি যখন ঢাকা বিমানবন্দরের রানওয়ে স্পর্শ করল, গবেষক রুবিনা হকের চোখে তখন রাজ্যের ক্লান্তি। বাড়ি ফেরার পথে ছোট সন্তানের জন্য কিছু ভালো গল্পের বই কিনতে হবে। যানজট পার হয়ে কোথায় যাবেন, এ নিয়ে যখন দ্বিধা, তখনই তাঁর স্মার্টফোনের সার্চ রেজাল্টে ভেসে উঠল ইউনাইটেড টার্মিনালের নাম। বিমানবন্দর থেকে মাত্র দুই মিনিটের দূরত্ব। টার্মিনালের সুপারশপ ইউনিমার্টের বিশাল বুক কর্নারেই কাঙ্ক্ষিত বইটি পাওয়া গেল। বলেন, এখানে যে এত কিছু আছে, জানতেন না রুবিনা। রুবিনা হকের মতো ব্যস্ত নগরবাসীর জন্য এক প্রাঙ্গণেই জীবনের সব আয়োজন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ইউনাইটেড টার্মিনাল। এ প্রাঙ্গণেই আছে সেন্টারপয়েন্ট শপিং মল, ইউনাইটেড কনভেনশন সেন্টার ও ইউনিসেন্ট্রাল।
কী আছে ইউনাইটেড টার্মিনালে, দেখতে এক দুপুরে একদল জেন-জি কিশোরের সঙ্গে সেখানে ছুটে যাই। কেনাকাটা যাদের শখ, তাদের জন্য দারুণ এক নতুন গন্তব্য টার্মিনালের সেন্টারপয়েন্ট শপিং মল। দেশীয় নামী ব্র্যান্ডের পাশাপাশি এখানে রয়েছে ১৬০টির বেশি বিদেশি ব্র্যান্ডের আউটলেট।
পোশাক, জুতা, কসমেটিকস থেকে শুরু করে গ্যাজেট—এক ছাদের নিচে সবই পাওয়া যাচ্ছে। বিভিন্ন ফ্লোরে মারিয়া বি, সেফায়ার, জমশেদ জুনায়েদ, মুমুসো বাংলাদেশসহ বিভিন্ন বিদেশি ব্র্যান্ডের আউটলেট। টেকনো, অপো, অনারের মতো মোবাইল ফোন ব্র্যান্ডের বিশাল এক্সপেরিয়েন্স জোন আছে।
ফারহানা ইসলাম নামের এক ক্রেতা বলেন, বিদেশি ব্র্যান্ডের কোনো পণ্যের জন্য আগে দেশের বাইরে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকতে হতো। এখন সেন্টারপয়েন্টে এলে সেই আক্ষেপ আর থাকে না। ব্র্যান্ডগুলোর বিশাল সংগ্রহ তো আছেই, পাশাপাশি এখানকার হাঁটাচলার জায়গা ও পরিবেশ খুবই ছিমছাম।
পিক্সেল নামের একটি স্টোরে ভিড় দেখে ঢুকে দেখতে পেলাম, সেখানে মিলছে ছবি আঁকা থেকে শুরু করে ডায়েরি লেখার নানান অনুষঙ্গ। মল থেকে বের হতেই দেখা যায় মুমুসো ব্র্যান্ডের বিশাল আয়োজন। কুমিল্লা থেকে আসা ফ্রিল্যান্সার জুয়েল হাসান বলেন, ‘এখানে এসেছি মুমুসো ব্র্যান্ডের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে। অনেক তারকা আসবে। ঢাকার মধ্যে এত বিশাল জায়গায় এত বড় শপিং মল কল্পনার মধ্যেও ছিল না।’
সাধারণত আমাদের দেশের শপিং মলগুলোতে ঢুকলেই চোখে পড়ে নানা পণ্যের দোকান আর বিজ্ঞাপনের ঝলক। কিন্তু সেন্টারপয়েন্ট শপিং মলের প্রবেশপথেই দর্শকদের অভ্যর্থনা জানায় ‘ভূমি’ নামের বিশাল আর্ট এক্সিবিশন গ্যালারি। এটি কেবল একটি প্রদর্শনীকেন্দ্র নয়; বরং দেশের গুণী সব শিল্পীর তুলিতে আঁকা শিল্পের এক জীবন্ত গ্যালারি। কেনাকাটার উদ্দেশ্যে এসেও দর্শনার্থীরা মুহূর্তের মধ্যে পেয়ে যান শিল্পের স্বাদ।
ইউনাইটেড টার্মিনালের অন্যতম আকর্ষণ ‘প্লেয়ার্ড’। সেন্টারপয়েন্টের লেভেল সিক্সের বিশাল এলাকাজুড়ে শিশুদের জন্য তৈরি করা হয়েছে বিশাল এই খেলার জগৎ। শহুরে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য যে ধরনের উন্মুক্ত ও নিরাপদ পরিসর প্রয়োজন, তার অনেকটাই এখানে আছে।
ছুটির দিনে এখানে ভিড় জমান শত শত অভিভাবক। প্লেয়ার্ড বিষয়ে গৃহিণী সামিনা সুলতানা জানান, উত্তরায় শিশুদের খেলার মতো মানসম্মত জায়গা পাওয়া খুব কঠিন। এখানে রাইডগুলো যেমন আধুনিক, তেমনি শিশুদের নিরাপত্তার বিষয়টিও সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এটি কেবল খেলার জায়গাই নয়; বরং শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ সামাজিকীকরণের কেন্দ্র। প্লেয়ার্ডে কিডস ক্যাসল, স্লাইম, ট্রামপোলিন, রেসিং, শুটিং, বাম্পার কার, আর্চারি, শুটিং, রেসিং সিমুলেটর, ফুটবল খেলার সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া ক্লেস্টেশনে মিলবে রং নিয়ে খেলার সুযোগ।
ইউনাইটেড টার্মিনালের সেন্টারপয়েন্ট শপিং মলে দুপুরের পরই বাড়তে থাকে তারুণ্যের ভিড়। সিনেপ্লেক্সে সাম্প্রতিকতম ব্লকবাস্টার উপভোগ করতে পারেন দর্শক। সিনেমার পাশাপাশি এখানকার খাবারের বৈচিত্র্য যে কাউকেই মুগ্ধ করবে। দেশি খাবারের পাশাপাশি রয়েছে কন্টিনেন্টাল, চায়নিজ, ইতালিয়ানসহ নানা পদের বিশাল সমাহার।
পরিবারের সঙ্গে সিনেমা দেখতে আসা তরুণ শিক্ষার্থী আরিয়ান বলেন, ‘বিমানবন্দরের পাশেই এমন একটি চমৎকার সিনেপ্লেক্স পাওয়া আমাদের জন্য দারুণ হয়েছে। হলের সাউন্ড সিস্টেম ও বসার জায়গাগুলোও খুব ভালো।’
ফুডকোর্টে কফিশপ এবং খাবারের পরিবেশটি বেশ প্রিমিয়াম। গ্রিন অ্যান্ড সিডস, আফগান গ্রিল, ওয়াফল ক্যাফে, কেএফসি, ক্রিসপ, ইনডালজ, কই তে, তাবাকসহ নানান দোকানে মিলছে দেশ–বিদেশের খাবার ও পানীয়।
ইউনিমার্টকে বলা চলে সেন্টারপয়েন্টের হৃৎস্পন্দন। দৈনন্দিন বাজারের পাশাপাশি এখানে এমন সব পণ্য পাওয়া যায়, যা অন্য কোথাও মেলা ভার। বিশেষ করে এর বুক কর্নার আর ইন্টেরিয়র অংশ মানুষের কাছে খুবই জনপ্রিয়।
কেবল দৈনন্দিন বাজারই নয়, জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে প্রয়োজনীয় সব সরঞ্জাম এখানে পাওয়া যায়। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ফাতিমা আলম বলেন, ‘আমি মূলত বইয়ের টানেই আসি। তাদের বুক কর্নারটি খুব সুন্দরভাবে গোছানো।
কেনাকাটার ফাঁকে কফি হাতে বই দেখার সুযোগটি আমাকে টেনে আনে বারবার।’ রান্নাঘরের গ্রোসারি থেকে শুরু করে ঘরের সাজসজ্জার সরঞ্জাম—সবই এখানে পাওয়া যায়।
ইউনাইটেড টার্মিনাল কেবল কেনাকাটা বা বিনোদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি একটি বিশাল বাণিজ্যিক ও করপোরেট হাব। ইউনিসেন্ট্রাল নামে এখানে আছে ১২ তলাবিশিষ্ট একটি আধুনিক অফিস ব্লক।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে তৈরি করা এই অফিসে রয়েছে ৯ শতাধিক গাড়ি পার্কিংয়ের সুবিধা। বিদেশি পর্যটকদের জন্য আছে ১৬ তলাবিশিষ্ট ৩৭৬ কক্ষের একটি অত্যাধুনিক পাঁচ তারকা হোটেল। পাশাপাশি আইএইচজি ঢাকা এয়ারপোর্ট পরিচালিত ১৪ তলাবিশিষ্ট চার তারকা হোটেল ক্রাউন প্লাজা ভ্রমণকারীদের জন্য বিলাসিতা ও আরামের একটি জায়গা।
বিমানবন্দরের কাছে হওয়ায় বিদেশি ব্যবসায়ী ও অতিথিদের জন্য এসব হোটেল এখন প্রথম পছন্দে পরিণত হয়েছে। পাকিস্তান থেকে আসা পর্যটক হাসান কুরায়েশি বলেন, ‘এখানকার আতিথেয়তা এবং এয়ারপোর্টের সঙ্গে সহজ যোগাযোগ আমাকে মুগ্ধ করেছে। ইটস আ নিউ ঢাকা।’
বড় করপোরেট ইভেন্ট ও সামাজিক অনুষ্ঠানের জন্য ঢাকার অন্যতম ভেন্যু এখানকার ইউনাইটেড কনভেনশন সেন্টার, এটির ধারণক্ষমতা চার হাজারের বেশি। সব মিলিয়ে ইউনাইটেড টার্মিনাল যেন ভবিষ্যৎ–মুখী ঢাকার প্রতিচ্ছবি।
মোট জমি: ১৬ একর (৩০,০০০+ বর্গমিটার)
একটি পাঁচ তারকা হোটেল
৩৭৬টি রুম (১৬ তলা)
একটি চার তারকা হোটেল
২৮৪টি রুম (১৪ তলা)
সেন্টারপয়েন্ট শপিং মল
৫০০টি দোকান (৮ তলা)
ব্র্যান্ড আউটলেট
১৬০টির বেশি
ফুডকোর্ট
শেফস টেবিল (১০০+ দোকান)
কনভেনশন সেন্টার (ব্যাংকুয়েট হল)
৪০০০+ মানুষের ধারণক্ষমতা
অফিস ব্লক ইউনিসেন্ট্রাল
১২ তলাবিশিষ্ট (৯০০+ পার্কিং)