
বিশ্বকাপে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানির মুখোমুখি হচ্ছে আজ কুরাসাও। ক্যারিবিয়ান সাগরের ছোট্ট এই দ্বীপদেশটির জনসংখ্যা দুই লাখেরও কম (অথচ আমাদের মিরপুরেই ৫ লাখের বেশি মানুষের বসবাস)!
কুরাসাওয়ের আয়তন ৪৪৪ বর্গকিলোমিটার। বিশ্বকাপের ইতিহাসে জনসংখ্যা বা আয়তনের দিক থেকে এত ‘ছোট’ দেশ এর আগে কোনো আসরে খেলেনি। একসময় ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে ১৫০-এর বাইরে থাকা দলটি আজ বিশ্বের সেরা ৪৮ দলের একটি। তবে কুরাসাওয়ের গর্ব শুধু ফুটবল না। ছোট্ট দেশটির আছে বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি, বিস্ময়কর ইতিহাস আর অসংখ্য অজানা গল্প। চলুন জেনে নিই এই দেশ সম্পর্কে ১০টি তথ্য।
কুরাসাও দুটি দ্বীপ নিয়ে গঠিত—মূল দ্বীপ কুরাসাও ও ছোট্ট জনবসতিহীন দ্বীপ ক্লেইন কুরাসাও, যেটি মূল দ্বীপের প্রায় ১০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত। অবস্থানগত কারণে দেশটি হারিকেন বেল্টের বাইরে, ফলে সারা বছর আবহাওয়া থাকে স্থিতিশীল ও উষ্ণ।
এটি স্বাধীন রাষ্ট্র নয়, তবে পরাধীনও বলা যায় না। নেদারল্যান্ডস রাজ্যের মধ্যে কুরাসাও একটি স্বায়ত্তশাসিত দেশের মর্যাদা পায় ২০১০ সালে। বিদেশনীতি আর প্রতিরক্ষার ভার নেদারল্যান্ডসের হাতে থাকলেও ভেতরের সব সিদ্ধান্ত নেয় কুরাসাও নিজে।
কুরাসাও নামটির উৎস নিয়ে পাঁচটিরও বেশি তত্ত্ব আছে। একটি প্রচলিত মত বলে, নামটি এসেছে পর্তুগিজ ‘coração’ থেকে, যার অর্থ হৃদয়। আরেকটি মত বলে, দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রায় অসুস্থ নাবিকদের এই দ্বীপে রেখে যাওয়া হতো, আর এখানকার ফলমূল খেয়ে তারা সুস্থ হয়ে উঠতেন। তাই পর্তুগিজ ‘cura’ অর্থ নিরাময় থেকেও নামটি এসে থাকতে পারে। তবে অধিকাংশ ইতিহাসবিদ এখন মনে করেন, নামটি আদতে এখানকার আদিবাসীরা নিজেদের যে নামে পরিচয় দিতেন, সেখান থেকেই এসেছে। নামের উৎস যা-ই হোক, একটি ছোট দেশকে ঘিরে এত গল্প থাকাটাই বলে দেয় কুরাসাও কতটা বিশেষ।
কুরাসাওয়ের সরকারি ভাষার নাম পাপিয়ামেন্তো। স্প্যানিশ, পর্তুগিজ, ডাচ, ফরাসি আর ইংরেজি মিলেমিশে তৈরি এই ক্রেওল ভাষাটি আদতে দেশটির পুরো ইতিহাসের আয়না। ঔপনিবেশিক শাসন, দাস–বাণিজ্য, বিভিন্ন দেশ থেকে আসা মানুষের মিলন—সবকিছুর ছাপ এই ভাষায়। আকর্ষণীয় বিষয় হলো, দাসদের মধ্যে একসময় একটি গোপন ভাষাও প্রচলিত ছিল, যার নাম ‘গুয়েনে’, যা মালিকেরা বুঝতেন না। সেই ভাষাও পাপিয়ামেন্তোর গঠনে ভূমিকা রেখেছে বলে ভাষাবিদেরা মনে করেন। বর্তমানে দেশটিতে পঞ্চাশটিরও বেশি জাতীয়তার মানুষ বাস করেন এবং অধিকাংশ মানুষ অনায়াসে চার থেকে পাঁচটি ভাষায় কথা বলেন। পৃথিবীতে এত ছোট জায়গায় ভাষা ও জাতীয়তার এত বৈচিত্র্য বেশ বিরল।
পাপিয়ামেন্তো ভাষায় একটি শব্দ আছে, ‘ডুশি’। অর্থ মিষ্টি, সুন্দর বা ভালো। সুস্বাদু খাবার থেকে শুরু করে সুন্দর দৃশ্য, এমনকি প্রিয় মানুষকে বর্ণনা করতেও ব্যবহৃত হয় ‘ডুশি’। শব্দটি শুধু অভিধানের পাতায় আটকে নেই। দোকানের সাইনবোর্ড, রেস্তোরাঁর নাম, রাস্তার দেয়ালচিত্র, প্রায় সর্বত্রই ছড়িয়ে। পর্যটকেরা বলেন, কুরাসাওয়ে নামার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শব্দটি কানে আসে, আর ফেরার পরেও মাথায় থেকে যায়। এটি শুধু একটি শব্দ নয়; উষ্ণতা, ভালোবাসা ও ইতিবাচকতাকে ধারণ করা কুরাসাওয়ের সংস্কৃতির অন্যতম পরিচয়।
১৬৬২ সালে কুরাসাও হয়ে ওঠে আটলান্টিক দাস–বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে। ডাচ জাহাজে করে আফ্রিকা থেকে এখানে মানুষ এনে বিক্রি করা হতো, তারপর পাঠানো হতো উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার বাগানে। তাঁদের সঙ্গে আচরণ করা হতো পণ্যের মতো। বন্দরে নামার আগেই গায়ে মালিকের চিহ্ন এঁকে দেওয়া হতো। পরিবার ভেঙে দেওয়া হতো নিলামে—মা একদিকে, সন্তান আরেক দিকে।
১৭৯৫ সালের ১৭ আগস্ট একটি বড় বিদ্রোহ হয়েছিল, নেতৃত্বে ছিলেন তুলা নামের এক দাস, যিনি স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখেছিলেন। বিদ্রোহ দমন হয়েছিল, তুলাকে সেই বছরের ৩ অক্টোবর প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তাঁর নাম আজও কুরাসাওয়ে উচ্চারিত হয় সম্মানের সঙ্গে।
রাজধানী উইলেমস্টাডকে দেখলে মনে হয় কেউ পুরো শহরটায় তুলি বুলিয়ে দিয়েছে। লাল, হলুদ, সবুজ, কমলা—বিভিন্ন রঙের সারি সারি ভবন। কিন্তু এই রঙের পেছনে আছে এক মজার ইতিহাস। একসময় এই ভবনগুলো ছিল ধবধবে সাদা। ১৮১৭ সালে রোদের ঝলকানিতে চোখের ক্ষতি এবং এর ফলে সৃষ্ট মাথাব্যথার কথা বলে গভর্নর আলবার্ট কিককার্ট সাদা রং নিষিদ্ধ করেন।
সেই রঙিন শহর ১৯৯৭ সাল থেকে ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় রয়েছে। আর শহরের মাঝখান দিয়ে বয়ে যাওয়া সেন্ট আনা বে-র ওপর দাঁড়িয়ে আছে কুইন এমা ব্রিজ। ১৮৮৮ সালে নির্মিত এই সেতুকে স্থানীয় লোকজন ডাকেন ‘সুইঙ্গিং ওল্ড লেডি’। জাহাজ আসার সময় সেতুটি সরে যায়।
স্থলভাগের মতো সমুদ্রেও কুরাসাও সমান সমৃদ্ধ। প্রায় ৪০টি সমুদ্রসৈকত আর ৬০টি ডাইভিং স্পট নিয়ে এই দেশটি ক্যারিবিয়ানের অন্যতম সেরা ডাইভিং গন্তব্য।
ক্যারিবিয়ানের অন্যতম বড় ও দীর্ঘস্থায়ী কার্নিভ্যাল হয় এই ছোট্ট দেশটিতে। প্রায় দেড় থেকে দুই মাস ধরে চলে উৎসব। তবে তারিখ প্রতিবছর বদলায়। কারণ, এটি নির্ধারণ করা হয় খ্রিষ্টীয় লিটার্জিক্যাল ক্যালেন্ডার অনুযায়ী। আফ্রিকান তাল, ইউরোপীয় ঐতিহ্য, লাতিন সুর আর ক্যারিবিয়ান রং—সব মিলিয়ে পুরো দেশটাই যেন হয়ে ওঠে একটি মঞ্চ। উৎসবের কেন্দ্রে থাকে ‘তুম্বা’ প্রতিযোগিতা, যেখানে সেরা সংগীতশিল্পী হন ‘রেই দি তুম্বা’, অর্থাৎ তুম্বার রাজা বা রানি। উৎসবের শেষ রাতে ‘কিং মোমো’ নামের একটি খড়ের পুতুল পোড়ানো হয়, যা পাপ আর দুর্ভাগ্যের প্রতীক। এই পোড়ানোর মধ্য দিয়ে শুরু হয় নতুনের যাত্রা।
ফুটবল দিয়ে পরিচিত হওয়ার আগে থেকেই কুরাসাও বিশ্বক্রীড়ায় নিজের নাম লিখিয়েছে, তবে সেটা বেসবলে। ১৯৮৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত এই দেশ থেকে ১৭ জন মেজর লিগ বেসবল খেলোয়াড় উঠে এসেছেন।
বিশ্বকাপে কুরাসাও দলের পরিচালনায় আছেন ৭৮ বছর বয়সী ডাচ কোচ ডিক অ্যাডভোকাট। তিনি বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বয়স্ক হেড কোচ। দলের অধিনায়ক মিডফিল্ডার লিয়ান্দ্রো বাকুনা। তাঁর ছোট ভাই জুনিনহো বাকুনাও একই দলে। গ্রুপ ই-তে তাদের প্রতিপক্ষ এবার জার্মানি, ইকুয়েডর ও আইভরি কোস্ট।
র্যাঙ্কিং ১৫০-এর বাইরে থেকে বিশ্বকাপ—এই যাত্রাটাই বলে দেয়, সংকল্প থাকলে ক্যারিবিয়ানের ছোট্ট একটি দ্বীপও পুরো পৃথিবীকে চমকে দিতে পারে। পাপিয়ামেন্তোতে বলে ‘ডুশি’। হার-জিত যা-ই হোক, আজ কুরাসাও যে বিশ্বকাপে খেলছে, এর চেয়ে ‘ডুশি’ আর কী হতে পারে!