১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসরেরা বাংলাদেশের মুক্তিযোদ্ধা, বিশিষ্টজন, বুদ্ধিজীবী, সাধারণ মানুষকে ধরে নিয়ে হত্যা করার জন্য কিছু জায়গা বেছে নিয়েছিল। নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী হয়ে দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে আছে এমন অনেক স্থান। কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাস কিংবা ক্যাম্পাসসংলগ্ন এলাকায়ও মিলেছে বধ্যভূমির খোঁজ। এ সময়ের তরুণ শিক্ষার্থীরা যখন নিজ ক্যাম্পাসের বধ্যভূমির কাছে যান, কী উপলব্ধি হয় তাঁদের? বধ্যভূমির ইতিহাস তাঁরা কতখানি জানেন? শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে লেখা আহ্বান করেছিলাম আমরা। এখানে পড়ুন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী হালিমা আক্তারের লেখা।

২০১৭ সালে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। নবীনবরণ অনুষ্ঠানে অতিথিদের বক্তব্যে জানতে পারি, হাজারো তরুণের কলরবে মুখর আজ যে ক্যাম্পাস, মুক্তিযুদ্ধের সময়ে এখানেই বহু মানুষ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরতার শিকার হয়েছিল। এখানে আছে বধ্যভূমি।
বধ্যভূমির কথা শুনেই কৌতূহল জেগেছিল। এর পর থেকে যখনই বধ্যভূমিসংক্রান্ত কোনো লেখা কোথাও পেয়েছি, মন দিয়ে পড়েছি। আমার ক্যাম্পাসের এই বধ্যভূমি সম্পর্কেও খোঁজখবর নিয়েছি, পড়েছি। যত দূর জানি, ১৯৭১ সালে গল্লামারী ছিল এক আতঙ্কের নাম। খুলনা শহর থেকে ৩ কিলোমিটার দূরের জায়গাটি তখন বেশ নির্জন ছিল। সে সময় এখানে ছিল রেডিও পাকিস্তানের খুলনা কেন্দ্র। পাকিস্তানি বাহিনীর কিছু সদস্য কেন্দ্রটির নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন।
নির্জনতা এবং পাশে বয়ে চলা ময়ূর নদের (যা এখন মৃতপ্রায়) কারণেই এই স্থানকে বধ্যভূমির জন্য বেছে নেওয়া হয়। নদীর তীরে থাকা বেশ খানিকটা জায়গাজুড়েই ছিল রেডিও স্টেশন, যা মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্যাতন ও হত্যাকেন্দ্রে রূপান্তরিত হয়। এখানে দিনের বেলায় নিরীহ মানুষকে ধরে নিয়ে আসা হতো। পরে সেই বধ্যভূমির ওপরেই গড়ে ওঠে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর তৎকালীন রেডিও স্টেশনটির নাম হয় ‘শহীদ নজরুল ইসলাম ভবন’। বর্তমানে ভবনটি পুরাতন প্রশাসনিক ভবন হিসেবেও পরিচিত।
মুক্তিযুদ্ধের সময় খুলনার গল্লামারী বধ্যভূমিতে পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসররা ঠিক কত লোককে হত্যা করেছে, তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। এ নিয়ে উল্লেখ করার মতো কোনো গবেষণা হয়েছে বলে জানা যায়নি। তবে অমল কুমার গাইনের লেখা গণহত্যা-বধ্যভূমি ও গণকবর জরিপ: খুলনা জেলা বইয়ের আছে, ‘গল্লামারীতে প্রায় প্রতিদিন গণহত্যা চালানো হতো। সে হিসাবে ধরলে এপ্রিল থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত এখানে কমপক্ষে ২৫০টি গণহত্যা হয়েছে। কয় হাজার মানুষকে এখানে হত্যা করা হয়েছে, তা না জানলেও আনুমানিক সে সংখ্যা ১০ হাজারের কম হবে না।’
আজ যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটক, ঠিক তার সামনে দিয়ে ছিল একটি বড় খাল। সেই খাল দিয়ে প্রতিনিয়ত যাতায়াত করত হানাদার বাহিনীর গানবোট। যুদ্ধের সময় এই খালে ভেসে থাকত অজস্র লাশ।
২০১৫ সাল পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে কোনো জায়গা বধ্যভূমি হিসেবে সংরক্ষিত ছিল না। ২০১৬ সালের ৬ জানুয়ারি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের পাশে স্থানটিকে চিহ্নিত করে স্মৃতিফলক উন্মোচন করেন ‘১৯৭১: গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর’-এর ট্রাস্টি সভাপতি, ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে একটি টিনশেড ঘর আছে, যা পাকিস্তানি বাহিনী টর্চারসেল হিসেবে ব্যবহার করেছিল। এ বছর ৫ জুন এটিকে ‘গল্লামারী বধ্যভূমি স্মৃতি জাদুঘর, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়’ হিসেবে সংরক্ষণ, সংস্কার ও ল্যান্ডস্কেপিং উন্নয়নকাজের সূচনা হয়। সবশেষে বলব, জাতি হিসেবে আমাদের সবচেয়ে বড় পরিচয় এই মুক্তিযুদ্ধ। তাই মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত স্থানে পড়াশোনা করতে পারাটা আমার জন্য গর্বের, আবেগের।