তিতুমীর কলেজেই শিক্ষক হয়ে ফিরেছেন আল আমীন, এখন যুক্তরাষ্ট্রে করছেন পিএইচডি

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস রিও গ্র্যান্ডে ভ্যালিতে পূর্ণ অর্থায়নে পিএইচডি করছেন মো. আল আমীন মিয়া
ছবি: আল আমীনের সৌজন্যে

একদিন যে ক্লাসে বসে গণিত শিখেছেন, সেখানেই শিক্ষক হয়ে ফিরবেন, কখনো ভাবেননি মো. আল আমীন মিয়া। যুক্তরাষ্ট্রে পিএইচডি করতে যাবেন, সেটাও তাঁর ভাবনায় ছিল। গণিতের প্রতি ভালোবাসাই তাঁর পথ ঠিক করে দিয়েছে।

ছাত্রজীবনে প্রতি রোববার প্রথম আলোর ‘স্বপ্ন নিয়ে’ পড়তেন। অন্যের সাফল্যের গল্প পড়ে ভাবতেন, একদিন হয়তো তাঁর জীবনও কাউকে স্বপ্ন দেখতে সাহস জোগাবে। সেই দিনটা কি চলেই এল?

সরকারি তিতুমীর কলেজে গণিত বিভাগে পড়েছেন তিনি। এরপর ৩৫তম বিসিএসের মাধ্যমে সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দেন নিজের বিভাগেই। এখন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস রিও গ্র্যান্ডে ভ্যালিতে (ইউটিআরজিভি) পূর্ণ অর্থায়নে পিএইচডি করছেন মো. আল আমীন মিয়া। পিএইচডি করতে যাওয়ার আগে তিনি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবেও কাজ করেছেন।

শিক্ষার্থী থেকে শিক্ষক

উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার পর একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছিলেন আল আমীন। তবে পছন্দের সাবজেক্ট না পাওয়ায় শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের জন্য অপছন্দের বিষয়ে পড়তে চাননি।

গণিতের প্রতি ছোটবেলা থেকেই ভালো লাগা ছিল। কঠিন কোনো সমস্যার সমাধান করতে পারার আনন্দ তাঁকে টানত। তাই গণিতটাই বেছে নেন।

সরকারি তিতুমীর কলেজের গণিত বিভাগে শিক্ষক হিসেবে ফিরে আসা আল আমীনের জীবনের বিশেষ এক অধ্যায়। সাবেক শিক্ষকদের সহকর্মী হিসেবে পাওয়া—এক অন্য রকম অনুভূতি। শিক্ষকতা করতে গিয়ে আল আমীন বুঝেছেন, একজন শিক্ষক শুধু পাঠ্যবইয়ের বিষয় শেখান না, শিক্ষার্থীর চিন্তা ও আত্মবিশ্বাস গঠনেও ভূমিকা রাখেন।

ক্লাস করানোর সময় বিভাগের বাইরের শিক্ষার্থীরাও নাকি আল আমীনের ক্লাসে এসে বসে থাকতেন। আসতেন মনোবিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীরাও। তাঁদের সঙ্গে গণিতের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ ও স্বপ্ন নিয়েও কথা বলতেন তিনি।

অনেক শিক্ষার্থীকেই অন্য কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ না পাওয়ায় হতাশ হতে দেখেছেন।

আল আমীন বলেন, ‘আমি তাদের বলতাম, আমিও এই কলেজের শিক্ষার্থী ছিলাম। আমি বিসিএসে টিকেছি, ব্যাংকের চাকরির সুযোগ পেয়েছি। তুমি কোন প্রতিষ্ঠানে পড়ছ, সেটা তোমার ভবিষ্যতের সীমা নির্ধারণ করে না। তুমি যদি সত্যি বড় স্বপ্ন দেখতে পারো, স্বপ্ন অবশ্যই পূরণ করা সম্ভব।’

গবেষণার নতুন দিগন্ত

শিক্ষকতা করতে করতেই গবেষণার প্রতি আগ্রহ বাড়ে আল আমীনের। গণিতের সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), রোবোটিকস, অপটিমাইজেশন ও কম্পিউটেশনাল সায়েন্সের সংযোগ তাঁকে আকৃষ্ট করে।

উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করেন। শেষ পর্যন্ত মোট পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পূর্ণ অর্থায়নে পিএইচডির আমন্ত্রণ পান। এর মধ্যে বেছে নেন ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস রিও গ্র্যান্ডে ভ্যালির ম্যাথমেটিক্যাল অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিক্যাল সায়েন্সেস প্রোগ্রাম।

বর্তমানে সেখানে পিএইচডির পাশাপাশি গ্র্যাজুয়েট রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে গবেষণায় যুক্ত আছেন। গাণিতিক অপটিমাইজেশন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রিইনফোর্সমেন্ট লার্নিং ব্যবহার করে এমন পদ্ধতি নিয়ে কাজ করছেন, যাতে রোবট পরিবর্তনশীল পরিবেশে নিরাপদ ও দক্ষভাবে চলাচলের পথ নির্ধারণ করতে পারে।

আল আমীন বলেন, ‘শিল্পকারখানা, গুদাম ও হাসপাতালের মতো জায়গায় স্বয়ংক্রিয় রোবটের ব্যবহার বাড়ছে। ফলে মানুষের সঙ্গে একই পরিবেশে রোবটের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। আমার গবেষণার অভিজ্ঞতা থেকে আমি একটা বিষয় শিখেছি, কোনো মডেল প্রথমবার কাজ না করলে হাল ছেড়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। সমস্যার কারণ খুঁজতে হয়, নতুন পদ্ধতি চেষ্টা করতে হয়।’

স্বপ্ন ছড়িয়ে দেওয়ার প্রত্যয়

বাংলাদেশের সরকারি কলেজে শিক্ষকতা এবং যুক্তরাষ্ট্রে গবেষণার অভিজ্ঞতা থেকে আল আমীন মনে করেন, দুই জায়গারই নিজস্ব শক্তি আছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রে গবেষণার অবকাঠামো, অর্থায়ন, ল্যাব সুবিধা এবং বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সহযোগিতার সুযোগ তুলনামূলক বেশি।

বাংলাদেশের গণিত শিক্ষায় পরিবর্তন আনতে স্নাতক পর্যায় থেকেই শিক্ষার্থীদের গবেষণায় যুক্ত করা, গণিতের সঙ্গে কম্পিউটারবিজ্ঞান ও প্রকৌশলের সমন্বয় এবং আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথ গবেষণার সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

পিএইচডি শেষে গবেষণাকে আরও গভীর পর্যায়ে নিয়ে যেতে চান। একই সঙ্গে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা, গবেষণা ও আন্তর্জাতিক মেন্টরশিপের সুযোগ তৈরিতে ভূমিকা রাখার ইচ্ছা তাঁর।

ছোটদের উদ্দেশে আল আমীনের বার্তা, ‘নিজের শুরুকে কখনো ছোট করে দেখবেন না। আপনি কোন প্রতিষ্ঠানে পড়ছেন, কোন অঞ্চল থেকে এসেছেন অথবা প্রথমবার কোথায় সুযোগ পাননি, এগুলোর কোনোটিই আপনার শেষ পরিচয় নয়।’

একসময় অন্যের গল্প পড়ে সাহস পেয়েছেন। এখন চান তাঁর গল্প পড়ে মফস্‌সলের কোনো শিক্ষার্থীও নিজের ওপর আস্থা রাখুক। আল আমীন বলেন, ‘আজ যদি আমার গল্প পড়ে মফস্‌সলের কোনো একজন শিক্ষার্থী নিজের মনে একবার বলে, “আমিও পারব”, তাহলে সেটিই আমার জন্য সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।’