২০২৫ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর যাত্রা শুরু করে এখন পর্যন্ত ২০ হাজারের বেশি গ্রাহককে সেবা দিয়েছে বাংলাবিন। ব্যবহার শেষ মানেই ফেলনা নয়—এই স্লোগান সামনে রেখে ঢাকার বাসাবাড়ি, অফিস কিংবা ফ্যাক্টরি থেকে পরিবেশবান্ধব উপায়ে বর্জ্য সংগ্রহ করছে এই প্রতিষ্ঠান।

পুরোনো বই-খাতা, প্লাস্টিকের বোতল, অচল মোবাইল বা অকেজো ইলেকট্রনিক পণ্য–ঘরের কোণে জমে থাকা অব্যবহৃত ফেলনা জিনিসপত্র থেকেও আয়ের পথ খুলে দিয়েছে ‘বাংলাবিন’।
নগরবাসীর কাছ থেকে এ ধরনের পণ্য কিনে রিসাইকেল (পুনর্ব্যবহার) করে বাংলাবিন নিজেরাই কিছু পণ্য উৎপাদন করে। আর বড় অংশটি কাঁচামাল হিসেবে পৌঁছে দেয় আকিজ গ্রুপ ও আরএফএলের মতো শিল্পপ্রতিষ্ঠানে।
বাংলাবিনের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক আশরাফুল মুনতাসির তখন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থী। সোশ্যাল এনভায়রনমেন্টের একটি কোর্সে থিসিসের কাজে গিয়েছিলেন কড়াইল বস্তিতে। সেখানেই চোখে পড়ে প্লাস্টিক দূষণের ফলে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা।
আশরাফুল মুনতাসির বলছিলেন, ওরা ওখানেই থাকছে আবার ওদের ব্যবহৃত প্লাস্টিক ওখানেই ফেলছে। ফলে ড্রেনেজ ব্যবস্থার বারোটা বেজে যাচ্ছে। কিন্তু এর থেকে পরিত্রাণের উপায় কী? স্রেফ সচেতন করলেই তো আর সমাধান হবে না। তার চেয়ে বরং রিওয়ার্ড দিলে কেমন হয়? যারাই এই প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ করে দেবে, টাকা পাবে-এই একটি সূত্র মেনেই শুরু হয় বাংলাবিনের যাত্রা। প্লাস্টিক বর্জ্য দিয়ে শুরু হলেও এখন ঘরের অপ্রয়োজনীয় সব পণ্যই কেনে বাংলাবিন।
বাংলাবিনের ওয়েবসাইটে ‘বুক আ পিকআপ’ অপশনে ক্লিক করে বিনা মূল্যে ‘পিকআপ রিকোয়েস্ট’ করা যায়। গ্রাহকের নির্ধারিত তারিখ ও সময়ে ‘ইকো টাইগার’ নামের বাংলাবিনের প্রতিনিধিরা সরাসরি হাজির হয়ে যান অনুরোধকারীর দোরগোড়ায়। ডিজিটাল স্কেলের মাধ্যমে গ্রাহকের সামনেই পণ্য মেপে নির্ধারিত দামে তাৎক্ষণিক নগদ টাকা বা ডিজিটাল মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ করা হয়। বাংলাবিনের ফেসবুক পেজ ( https://www.facebook.com/banglabin?mibextid=rS40aB7S9Ucbxw6v) ও হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরেও (০১৫১৮৭০০৭৯৩) যোগাযোগ করা যাবে।
কাগজপত্র: পুরোনো খবরের কাগজ, বই, খাতা, কার্টন ও ব্যবহৃত পেপার বোর্ড।
প্লাস্টিক ও ধাতু: প্লাস্টিক বোতল, কনটেইনার, পুরোনো লোহা, তামার তার ও অ্যালুমিনিয়ামের জিনিসপত্র।
ই-বর্জ্য: নষ্ট বা অব্যবহৃত মুঠোফোন, ল্যাপটপ, চার্জার ও অন্যান্য সার্কিটযুক্ত জিনিস।
অন্যান্য: বাতিল কাপড়, কাচের বোতল।
বাংলাবিনের ওয়েবসাইটে নির্ধারিত বাজারদর অনুযায়ী, বিভিন্ন প্রকার ধাতুর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে তামা—প্রতি কেজি ৯০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা। পিতল ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা, অ্যালুমিনিয়াম ২১০ থেকে ২৫০ টাকা, লোহা ৩৫ থেকে ৪০ টাকা এবং প্লাস্টিক ও টিন ২৫ থেকে ৩০ টাকা কেজি।
কাগজপত্র ও বইয়ের ক্ষেত্রে খবরের কাগজ প্রতি কেজি ২৫ থেকে ৩০ টাকা, অফসেট কাগজ ২০ থেকে ২২ টাকা, খাতা ১৬ থেকে ১৮ টাকা, পুরোনো বই ১৪ থেকে ১৬ টাকা এবং কার্ডবোর্ড ৮ থেকে ১২ টাকা।
ই-বর্জ্য ও গৃহস্থালি সামগ্রীর ক্ষেত্রে সাধারণ ই-বর্জ্য প্রতি কেজি ৩০ থেকে ৩৫ টাকা। আর পিস হিসেবে প্রতিটি সচল ল্যাপটপ ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা, নষ্ট ল্যাপটপ ৩০০ থেকে ৭০০ টাকা, ডেস্কটপ পিসি ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা, মনিটর ১০০ থেকে ১৫০ টাকা এবং ছোট মুঠোফোন ৩০ থেকে ১০০ টাকা পিস। আইপিএস ব্যাটারি ও প্রিন্টার ১০০ থেকে ১২০ টাকা।
ভারী গৃহস্থালি যন্ত্রপাতির মধ্যে ব্যবহারের উপযোগিতার ওপর নির্ভর করে পুরোনো ২ টন এসি ৭ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকা, দেড় টন এসি ৫ হাজার থেকে ৫ হাজার ৫০০ টাকা, ১ টন এসি ৪ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা। দুই দরজার ফ্রিজ ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা, এক দরজার ফ্রিজ ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা, ওভেন ৬০০ থেকে ১ হাজার টাকা, সিলিং ফ্যান ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা, ওয়াশিং মেশিন ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা, এলইডি টেলিভিশন ৩০০ থেকে ৫৫০ টাকা এবং টিভি বক্স ২৫০ থেকে ৫০০ টাকা।
জাতীয় পরিচয়পত্রসহ ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই করে প্রতিটি পিকআপ পার্টনার নিয়োগ করে বাংলাবিন। পাশাপাশি রয়েছে রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিং সুবিধা, যার মাধ্যমে গ্রাহক শুরু থেকেই তাঁর পিকআপ পার্টনারের অবস্থান এবং পৌঁছানোর সময় সরাসরি অ্যাপ বা ওয়েবসাইটে ট্র্যাক করে নিশ্চিত হতে পারেন।
বাংলাবিনের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক আশরাফুল মুনতাসির জানান, ‘আমরা বিশ্বাস করি, ফেলে দেওয়া জিনিসেরও নতুন করে মূল্যায়ন করার সুযোগ আছে। সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, পুনর্ব্যবহার এবং সচেতনতার মধ্য দিয়ে একটি পরিচ্ছন্ন শহর গড়ে তোলার ইচ্ছা প্রকাশ করেন এই উদ্যোক্তা।’