সুন্দর পিচাই
সুন্দর পিচাই

ইন্টারভিউতে গুগলের সিইওর কেন মনে হয়েছিল, তাঁর সঙ্গে প্র্যাঙ্ক করা হচ্ছে

সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সব সময় তিনটি ফিল্টার বা ছাঁকনি ব্যবহার করেন গুগলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সুন্দর পিচাই। ১৪ জুন যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির সমাবর্তনে সে কথাই বলেছেন তিনি। পড়ুন তাঁর বক্তৃতার নির্বাচিত অংশের অনুবাদ।

১.

প্রথমত, আশাবাদী থাকা।

এ মুহূর্তে দাঁড়িয়ে কথাটা অবাস্তব মনে হতে পারে। এমনিতেই পৃথিবীতে হাজারটা সমস্যা। বিশ্বজুড়ে নানা দ্বন্দ্ব-সংঘাত, অর্থনৈতিক উদ্বেগ, প্রযুক্তির আমূল পরিবর্তন, তথ্যের অতিরিক্ত চাপ—সবকিছুই ঘটছে খুব দ্রুত। মনে হতে পারে, আমরা একটা অস্বাভাবিক সময়ে বাস করছি। পছন্দসই দুনিয়ায় গ্র্যাজুয়েশন করার সুযোগ আমাদের নেই। কিন্তু আমরা নিশ্চয়ই নিজ নিজ দৃষ্টিভঙ্গি বেছে নিতে পারি।

এই শিক্ষা মা-বাবা খুব ছোটবেলায় আমার মনে গেঁথে দিয়েছিলেন। আমি ভারতের চেন্নাইয়ের একটা প্রাণবন্ত শহরে বড় হয়েছি। তীব্র খরায় পানির গাড়ি সময়মতো আসবে কি না, তা নিয়েও আমাদের দুশ্চিন্তা করতে হতো। আর আমাদের জন্য প্রযুক্তি এসেছিল খুব ধীরগতিতে। একটা টেলিফোন, একটা টিভি বা একটা ফ্রিজ পাওয়ার জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে।

স্ট্যানফোর্ড থেকে যখন ভর্তির ডাক এল, বিমানের টিকিট কাটতে গিয়ে বাবাকে তাঁর পুরো এক বছরের বেতন দিয়ে দিতে হয়েছিল। ওটাই ছিল আমার প্রথম বিমানে চড়া। যখন ক্যালিফোর্নিয়ায় নামলাম, জায়গাটা ঠিক আমার কল্পনার সঙ্গে মিলছিল না।

ক্যালিফোর্নিয়াকে বিজ্ঞাপনে সবুজ ও মনোরম হিসেবে তুলে ধরা হয়। কিন্তু গাড়ির জানালা দিয়ে তাকিয়ে আমার মনে হচ্ছিল—সবটাই বাদামি। কথাটা মুখ ফুটে বলেই ফেলেছিলাম। আমার হোস্ট—মিসেস জেন আর্ল আলতো করে সংশোধন করে দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমরা বরং এটাকে সোনালি বলতে পছন্দ করি।’

আশাবাদ বেছে নেওয়া বলতে আমি ঠিক এটাই বোঝাতে চেয়েছি। এটা হলো ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। আমি যেখানে বাদামি দেখেছিলাম, তিনি দেখেছিলেন সোনালি। দৃষ্টিভঙ্গির এই সামান্য পরিবর্তন চারপাশের পৃথিবী সম্পর্কে আমার চিন্তাভাবনায় এক বিশাল ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছিল।

এখানে আসার আগে আমার ইচ্ছে ছিল, পিএইচডি শেষে শিক্ষকতা করব। কিন্তু জীবন আমাকে নিয়ে ভিন্ন পরিকল্পনা সাজিয়ে রেখেছিল। সে কারণেই হয়তো একটা চাকরি আমার দরকার হয়ে পড়েছিল। তাই ডক্টরেট প্রোগ্রামটা ছেড়ে দিই। স্ট্যানফোর্ড যথেষ্ট উদারতা দেখিয়ে আমাকে মাস্টার্সের সুযোগ দেয়।

চাইলে এটাকে স্বপ্নের শেষ হিসেবে দেখতে পারতাম। কিন্তু মিসেস আর্লের কল্যাণে, আমি সেই বাদামি পাহাড়টিকেও ‘সোনালি’ দেখতে শুরু করেছিলাম। আমি আশাবাদ বেছে নিয়েছিলাম।

গুগলের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সুন্দর পিচাই

২.

আমার দ্বিতীয় ফিল্টার হলো—কঠিন কাজের দিকে পা বাড়ানো।

স্ট্যানফোর্ড ছাড়ার পরই রাতারাতি সাফল্য পেয়ে গিয়েছিলাম, আপনাদের এমনটা বলতে পারলেই ভালো লাগত। কিন্তু তা হয়নি। এমনকি এক দশক পরও প্রায়ই মনে হতো, আমি ঠিক পথে নেই।

২০০৪ সালে যেদিন গুগলে আমার শেষ ইন্টারভিউটা দিই, সেদিন ছিল এপ্রিল ফুলস ডে। ঠিক সেদিনই জিমেইল চালু হয়। তাই টেবিলের ওপাশে বসে থাকা মানুষগুলো যখন জিমেইল নিয়ে প্রশ্ন করছিলেন, বুঝতে পারছিলাম না এটা কোনো প্র্যাংক কি না! কারণ, সেই সময়ে প্রত্যেকের জন্য ১ গিগাবাইট ফ্রি স্টোরেজ দেওয়াটাকে উচ্চাকাঙ্ক্ষী এবং প্রায় অসম্ভব বলে মনে হতো।

চাকরিতে যোগ দেওয়ার কয়েক বছর পর, আমি নিজেও এমন একটা ‘আপাত-অসম্ভব’ সমস্যা নিয়ে কাজের সুযোগ পাই। আমাদের মধ্যে ছোট্ট একটা দল অনুভব করেছিল, আমরা চাইলে ইন্টারনেট ব্রাউজারকে নতুন করে সাজাতে পারি। যা হবে অনেক বেশি উন্নত, দ্রুতগতির। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের ভেতরই অনেকের মত ছিল, এমন একটা ব্রাউজার তৈরি করা অত্যন্ত কঠিন। এ জন্য শত শত প্রকৌশলী প্রয়োজন। অথচ আমাদের দলে লোক ছিল মোটে ১০ জন।

তাদের ধারণা কিন্তু অমূলক ছিল না। কাজটা সত্যিই বেশ কঠিন মনে হচ্ছিল। কিন্তু নতুন কিছু শুরু করার সময়টাতে বোধ হয় একটু সরল, একগুঁয়ে হওয়াই ভালো। অবশেষে ২০০৮ সালে, আমরা আমাদের দৃষ্টিতে দারুণ একটি ব্রাউজার বাজারে আনলাম। প্রথম ২৪ ঘণ্টাতেই ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৮০ লাখ ছাড়িয়ে গেল। রিভিউও বেশ ভালো ছিল। কিন্তু তারপরই ব্যবহারকারী বৃদ্ধির গতি থমকে গেল।

এক বছর পর, ব্রাউজারের বাজারে আমাদের শেয়ার ছিল মাত্র ২ শতাংশের মতো। মনে আছে, মাইক্রোসফটের তৎকালীন সিইও স্টিভ বালমার এক ইন্টারভিউতে মজা করে ক্রোমকে গুগলের ‘হিসাবের ভুল’ বলেছিলেন।

আমরা দমে যেতে পারতাম। কিন্তু ক্যালিফোর্নিয়ার সেই আশাবাদ সঙ্গে নিয়ে আমি আমার টিমকে বললাম—তিনি যে নিজে থেকে এসে আমাদের উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন, তারে মানে আমরা ঠিক পথে আছি। টিমকে আরও চাঙা রাখতে রীতিমতো খ্যাপাটে পর্যায়ের একটা বিশাল লক্ষ্য নির্ধারণ করলাম। অন্য কোম্পানিগুলো যেখানে ছয় মাস বা এক বছরে একটা আপডেট আনত, আমরা প্রতি ছয় সপ্তাহে ব্রাউজারের নতুন সংস্করণ বাজারে ছাড়তে শুরু করলাম। ধীরে ধীরে সফলতা আসতে লাগল।

কঠিন কাজ করতে গিয়ে আমি অনেক কিছু শিখেছি। এটা আশাবাদী মানুষকে আকর্ষণ করে। যদি বড় লক্ষ্য নির্ধারণ করেন, তাহলে সেটা ছুঁতে না পারলেও আপনি দারুণ কিছু অর্জন করে ফেলবেন। তাই যখনই আপনার সামনে কঠিন কোনো কাজ করার সুযোগ আসবে—‘হ্যাঁ’ বলুন।

৩.

আমার তৃতীয় ফিল্টার হলো—যখন সব পথ একই রকম মনে হবে, তখন সেটা বেছে নিন, যেটা আপনাকে রোমাঞ্চিত করে।

স্ট্যানফোর্ডে আসার আগে আমি কম্পিউটারে কাজ করার সুযোগ খুব একটা পাইনি। বুঝতেই পারছেন, সুইট হলে ঢুকে যখন সারি সারি কম্পিউটার দেখলাম, জানলাম যে আমি যখন খুশি ব্যবহার করতে পারি, খুব অবাক হয়েছিলাম।

সেটা ১৯৯৩ সাল। বলা যায়, ইন্টারনেট জিনিসটা আমার চোখের সামনেই ডালপালা মেলছিল। আমি একে মানবজাতির অগ্রগতির অন্যতম মৌলিক চালিকা শক্তি হিসেবে দেখেছিলাম। যত বেশি সম্ভব মানুষের কাছে এটাকে পৌঁছে দেওয়ার একটা অংশ আমি হতে পারছি—এই চিন্তাই আমাকে রোমাঞ্চিত করত। ঠিক এ কারণেই আমি গুগলের চাকরিটা নিই।

প্রযুক্তি বা কম্পিউটিং একদিন যেভাবে আমার জীবনে বদলে দিয়েছিল, সেভাবে আরও বহু মানুষের জীবন বদলে দিচ্ছে—এটা কাছ থেকে দেখতে পারাই ছিল আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে রোমাঞ্চকর বিষয়।

তাই মা-বাবা আপনাকে দিয়ে কী করাতে চান, বন্ধুরা সবাই কী করছে, সমাজ আপনার কাছে কী প্রত্যাশা করে—শুধু ওসবের দিকেই মনোযোগ দেবেন না। বরং সেই বিষয়ে কাজ করুন, যা নিয়ে গভীর রাত পর্যন্ত রুমমেটের সঙ্গে তুমুল উৎসাহে গল্প করা যায়।