এআই কি সাংবাদিকতাও করবে

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই বদলে দিচ্ছে সংবাদ খোঁজা, তথ্য যাচাই, বিশ্লেষণ ও গল্প বলার ধরনও
ছবি: এআই

সেই ১৯৮৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা বিভাগে ভর্তি হয়েছিলাম। স্নাতক (সম্মান) ও মাস্টার্স করে দুই বছর সাংবাদিকতাও করেছি। সাংবাদিকতার একজন শিক্ষক হিসেবে বলছি: বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন বিষয়ে পড়বেন, এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় সাংবাদিকতার কথা কি কখনো ভেবেছেন? যদি না ভেবে থাকেন তাহলে নিজেকে প্রশ্ন করুন, সংবাদ লিখতে কি আমার ভালো লাগে? ক্যামেরা হাতে কি গল্প বলতে চাই? কিংবা মানুষের না-বলা গল্প তুলে ধরার ইচ্ছে আছে? প্রশ্নগুলোর কোনোটার উত্তর যদি হয় ‘হ্যাঁ’, তাহলে সাংবাদিকতা হতে পারে আপনার পছন্দের বিষয়।

তবে এখন আর শুধু ভালো লিখতে জানলেই হবে না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই বদলে দিচ্ছে সংবাদ খোঁজা, তথ্য যাচাই, বিশ্লেষণ ও গল্প বলার ধরনও।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থী জয় প্রকাশও কিছুদিন আগপর্যন্ত এআইয়ের নানা টুলের সঙ্গে খুব পরিচিত ছিলেন না। গুগলের উদ্যোগে ও প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনায় ‘ইনফরমেশন ক্রেডিবিলিটি অ্যান্ড এআই লিটারেসি ট্রেনিং (তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা এবং এআই সাক্ষরতাবিষয়ক প্রশিক্ষণ)’–এ অংশ নিয়ে তিনি এখন জেমিনাই, নোটবুকএলএম, পিনপয়েন্ট ও গুগল ট্রেন্ডসের মতো টুল হাতে-কলমে ব্যবহার করেন।

একই উদ্যোগ নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি (এনএসইউ), বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়েও পৌঁছেছে। শুধু এনএসইউতেই অংশ নেন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ৭২ শিক্ষার্থী। পাঁচটি মডিউলে সাজানো প্রশিক্ষণে তথ্য সংগ্রহ, যাচাই ও বিশ্লেষণের পাশাপাশি ছিল সাংবাদিকতায় আধুনিক ডিজিটাল টুল ব্যবহারের কৌশল।

এ বছরই এনএসইউতে পরিবর্তনের আরেকটি উদাহরণ দেখা গেছে। গত ১৯ থেকে ২১ এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয়টিতে অনুষ্ঠিত হয় তিন দিনের ‘জার্নালিজম অ্যান্ড ইনফরমেশন ইন্টেগ্রিটি (সাংবাদিকতা ও তথ্যের সততা)’ প্রশিক্ষণ। বেসরকারি সংস্থা ডিজিটালি রাইট পরিচালিত এই আয়োজনে অংশীদার ছিল বাংলাদেশে নরওয়ে, ডেনমার্ক ও সুইডেনের দূতাবাস; সহযোগিতা করেছে এনএসইউয়ের মিডিয়া, কমিউনিকেশন অ্যান্ড জার্নালিজম (এমসিজে) বিভাগ।

তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০ শিক্ষার্থী এতে অংশ নেন। শেখানো হয় ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর তথ্য চেনার কৌশল, ফ্যাক্ট চেকিং ও ‘ডিজিটাল ভেরিফিকেশন (ডিজিটাল যাচাই)’। শেষ দিনের বড় অংশজুড়ে ছিল এআই। এআই দিয়ে তৈরি কনটেন্ট কীভাবে মানুষের ধারণাকে প্রভাবিত করতে পারে, কীভাবে যাচাই করতে হয় ছবি ও ভিডিও, এমনকি বিভিন্ন টুল ব্যবহার করে এআই-সৃষ্ট বা বিকৃত কনটেন্ট কীভাবে শনাক্ত করা যায়—সেসবও হাতে-কলমে শেখেন শিক্ষার্থীরা।

এর আগে ৭ এপ্রিল একই অংশীদারদের সঙ্গে এনএসইউতে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে একটি আয়োজন ছিল। অর্থাৎ নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের প্রস্তুত করার ক্ষেত্রে এখন প্রযুক্তির পাশাপাশি তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা, ডিজিটাল নিরাপত্তা ও সাংবাদিকতার নৈতিকতাও গুরুত্ব পাচ্ছে।

এনএসইউর এমসিজে বিভাগও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় পাঠ্যক্রমে এআই, ডিজিটাল মিডিয়া ও উদীয়মান যোগাযোগপ্রযুক্তিকে আরও গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানিয়েছে।

তাহলে সাংবাদিকের কাজ কী? এআই দীর্ঘ নথি থেকে তথ্য খুঁজে দিতে পারে, সাক্ষাৎকারের প্রতিলিপি সাজাতে পারে, উপাত্ত বিশ্লেষণে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু কোন প্রশ্নটি করা দরকার, কোন তথ্যটি জনস্বার্থে গুরুত্বপূর্ণ, কোন সূত্রকে বিশ্বাস করা যায় কিংবা একজন মানুষের গল্প কীভাবে সংবেদনশীলভাবে বলা উচিত, এসবের জন্য প্রয়োজন সাংবাদিকের বিচারবোধ।

তাই সাংবাদিকতা পড়তে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের পাশাপাশি পাঠ্যক্রমটিও দেখুন। রিপোর্টিং, ফিচার লেখা, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, মাল্টিমিডিয়া, মিডিয়া আইন ও নৈতিকতার সঙ্গে এআই, তথ্য যাচাই ও ডিজিটাল সাংবাদিকতা শেখার সুযোগ আছে কি না, খোঁজ নিন। মিডিয়া ল্যাব, ইন্টার্নশিপ এবং পেশাদার সাংবাদিকদের কাছ থেকে শেখার সুযোগও গুরুত্বপূর্ণ।

আজ যিনি সাংবাদিকতায় ভর্তি হবেন, চার বছর পর তাঁর সংবাদকক্ষটি হয়তো আজকের মতো থাকবে না। কিন্তু কৌতূহল, ভালো প্রশ্ন করার ক্ষমতা, তথ্য যাচাইয়ের অভ্যাস এবং সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা—এসবের প্রয়োজন কখনোই ফুরাবে না।

সাংবাদিকতা পড়ে বেকার থাকার সুযোগ তেমনটা নেই। এই লেখাটা যখন লিখছি, সেদিনই সাংহাই জিয়াটং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শুকিং লি আমাদের সঙ্গে এক ওয়েবিনারে বললেন, এআই ব্যবহার করে সাংবাদিকতা করলেই সেই গণমাধ্যমের রাজস্ব আয় বাড়বে, এমন কিন্তু না। তাই এআইয়ের যুগে প্রশ্নটি ‘সাংবাদিকতা থাকবে কি না’ নয়। বরং প্রশ্ন হলো আপনি কি এমন সাংবাদিক হয়ে উঠতে পারবেন, যিনি প্রযুক্তিকে কাজে লাগাবেন, কিন্তু সত্য যাচাইয়ের দায়িত্ব প্রযুক্তির হাতে ছেড়ে দেবেন না?